- চলতি বছর সড়কে দুর্ঘটনার ৩১.২৯ ভাগই অটোরিকশায়
- রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব : ড. মো: হাদিউজ্জামান
রাজধানীজুড়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। অলিগলি থেকে শুরু করে মূল সড়ক- সবখানেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নিবন্ধনহীন এই বাহন। সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো নিয়মনীতিকে তোয়াক্কা করছেন না এর চালকেরা। উল্টো পথে চলা, ফুটপাথ ব্যবহার করা, এমনকি ফ্লাইওভারেরও তারা খেয়াল খুশি মতো রিকশা নিয়ে উঠে পড়ছেন। এতে প্রতিনিয়ত সড়কে ঘটছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা ও জনদুর্ভোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে প্রায় ২৫ লাখের বেশি অটোরিকশা চলাচল করছে। যা শহরের ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। এতে ট্রফিক ব্যবস্থায় চরম বিশৃঙ্খরা তৈরি হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত সারা দেশে পাঁচ হাজার ৭৯৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ হাজার ৫৮৩ জন নিহত এবং ১২ হাজার ৪৮০ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে থ্রি-হুইলার ও বাইসাইকেল-রিকশা সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনার সংখ্যা এক হাজার ৮১৩টি, যা মোট দুর্ঘটনার ৩১ দশমিক ২৯ শতাংশ। এসব দুর্ঘটনায় থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-অটোরিকশা-অটোভ্যান) ও রিকশা-বাইসাইকেল আরোহী নিহতের সংখ্যা এক হাজার ২৯১ জন, যা মোট নিহতের ২৩ দশমিক ১২ শতাংশ।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য বলছে, চলতি বছরের বিগত ১০ মাসে সারা দেশে পাঁচ হাজার ৫৮২টি সড়ক দুর্ঘনায় নিহত হয়েছেন পাঁচ হাজার ৬৯৭ জন। আর আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৫৫২ জন। এর মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের কারণে ৩৮৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
অন্য দিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য মতে, একই সময়ের মধ্যে দেশজুড়ে চার হাজার ৭৭০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন চার হাজার ৫৭৩ জন ও আহত হয়েছেন পাঁচ হাজার ৬৪২ জন। এর মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার কারণে ঘটেছে ৭০৭টি দুর্ঘটনা, যা মোট দুর্ঘটনার ১৪ দশমিক ৮২ শতাংশ। এতে নিহত হয়েছেন ৫৫৮ জন, যা মোট নিহতের ১২ দশমিক ২০ শতাংশ।
ঢাকায় মূলত দুই ধরনের ব্যাটারিচালিত রিকশা দেখা যায়। একটি হলো, প্যাডেলচালিত রিকশার সাথে মোটর ও ব্যাটারিজুড়ে বানানো, অন্যটি নতুন ডিজাইনের, মিশুক বা ইজিবাইকের মতো অটোরিকশা। এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো রূপান্তরিত রিকশা। এগুলোর ব্রেকিং সিস্টেম দুর্বল, কাঠামো হালকা। ফলে সামান্য মোড় ঘুরতে গেলেও ভারসাম্য হারিয়ে উল্টে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। এ ছাড়া এসব বাহনের যন্ত্রাংশ যত্রতত্র পাওয়া যায় বলে তৈরি করতে সুবিধা। তা ছাড়া অন্যান্য যানবাহনের চেয়ে দাম কম হওয়াতে এতে ঝুকছে অনেকে।
বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা কমপক্ষে ৬০ লাখ। যার মধ্যে ঢাকাতেই রয়েছে ১৫ লাখের বেশি। ফিটনেসবিহীন এই যানবাহনের বেপরোয়া চলাচলে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা।
নগরবাসীর মতে, সড়কে অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচলের কারণে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। কোনো প্রকার সতর্কতা ছাড়াই এরা শাখা সড়ক থেকে উঠে যায় মূল সড়কে। নিয়ম না মেনে উল্টো পথে চলা তাদের কাছে নিত্যদিনের ঘটনা। যেখানে সেখানে যাত্রী উঠাচ্ছে-নামাচ্ছে। দ্রুত গতির যানবাহনের সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু অনভিজ্ঞ চালক আছেন- তারা বেশি ভাড়ার লোভে মূল সড়কে উঠে যান। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাম কম, আয়ও ভালো। চালকদের অনেকেই কিশোর ও তরুণ হওয়ায় বেপরোয়াভাবে চালায়। তারাই দুর্ঘটনা বেশি ঘটায়। ট্রাফিক পুলিশ মূল সড়কে অভিযান চালালে একজন চালক অন্যদের সতর্ক করে দেয়। ফলে এসব যান ঠেকানো যায় না। তা ছাড়া এসব যানবাহনের নেই কোনো ধরনের বৈধতা। অটোরিকশার পেছনে একটি বড় সিন্ডিকেট আছে। তারা নি¤œ আয়ের মানুষকে টার্গেট করে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় গাড়ি বিক্রি করছে। স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণে এসব যান বন্ধ করা যাচ্ছে না। অভিযান চালালেও কিছুদিন পর আবার রাস্তায় ফিরে আসে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো: মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন দেয়ার উদ্যোগের পরিকল্পনায় গলদ থাকায় এগুলো নিবন্ধন দেয়া হলে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা দ্বিগুণ হবে।
পুলিশ বলছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে। অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে ডাম্পিং ও ব্যাটারি জব্দসহ আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। প্রধান সড়কে যাতে অটোরিকশা উঠতে না পারে, সে লক্ষ্যে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। এসব যান আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় চলে আসে। উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ না করলে সমস্যার সমাধান কঠিন।
যোগাযোগবিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো: হাদিউজ্জামান বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো পদ্ধতিই কাজে আসছে না। এগুলোর জন্য নীতিমালা তৈরির কথা থাকলেও এখনো পর্যন্ত তা হয়নি। নীতিমালার পাশাপাশি সরকারের উচিত ছিল নতুন করে যেন নামতে না পরে সেদিকে লক্ষ রাখা। কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় প্রতিদিনই সড়কে নামছে এসব বাহন। ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা যাতে না বাড়ে সেই উদ্যোগ আগে নিতে হবে। বিশেষ করে অটোরিকশার যন্ত্রাংশ আমদানি বন্ধ করা জরুরি। বাজারে এসব যন্ত্রাংশ এত পরিমাণে আছে যে, আরো কয়েক লাখ অটোরিকশা তৈরি করা যাবে। যেখানে সেখানে পাওয়া যাচ্ছে এগুলো।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, বিগত সময়ে এসব বাহন নিয়ে রাজনীতি হয়েছে, এখনো একই কাজ হচ্ছে। ফলে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে ঢাকাতে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ অটোরিকশা সড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এ ছাড়া অন্যান্য যানবাহন মিলে রাজধানীতে চলাচলের অবস্থা নেই। এসব কমিয়ে গণপরিবহন বাড়াতে পারলে সড়কে বিশৃঙ্খলা কমে আসবে। এভাবে চলতে থাকলে ঢাকার ভবিষ্যৎ খারাপের দিকে যাবে। নিবন্ধন, অনুমতি, লাইসেন্সবিহীন একটি অবৈধ বাহন রাজধানীর মতো শহরে এভাবে চলতে পারে, তা কখনো মেনে নেয়া যায় না। রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা না থাকলে কখনো এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। অনেক গোষ্ঠী এটিকে ঘিরে ব্যবসা করছে। ফলে, অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ।



