বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এক দিকে মূল্যস্ফীতির দীর্ঘায়িত চাপ এবং ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা, অন্য দিকে বিপুল সংখ্যক যুবগোষ্ঠীর জন্য শোভন ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির জাতীয় অগ্রাধিকার। বর্তমান প্রোপটে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের অর্থনৈতিক নীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উভয় কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত লক্ষ্য এক- কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার। তবে নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি, হাতিয়ার এবং কৌশলগত প্রয়োগে তাদের মধ্যে পদ্ধতিগত পার্থক্য বিদ্যমান।
বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে মূলত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দৃষ্টিকোণ থেকে কর্মসংস্থানকে দেখে। তাদের মূল দর্শন হলো- অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা না থাকলে এবং মূল্যস্ফীতি অনিয়ন্ত্রিত থাকলে নতুন বিনিয়োগ বা টেকসই কর্মসংস্থান কোনোটিই সম্ভব নয়।
অন্য দিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার কর্মসংস্থানকে দেখে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য নিরসনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি মূলত ‘সাপ্লাই-সাইড’ বা জোগানভিত্তিক অর্থনীতি এবং অবকাঠামোগত সংস্কারের ওপর নির্ভরশীল।
সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দৃষ্টিভঙ্গি
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বর্তমানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতিগত সুদহার ১০ শতাংশে বজায় রেখে সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। স্বাভাবিক নিয়মে উচ্চ সুদহার বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে, যা কর্মসংস্থানের গতি কমিয়ে দেয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এর বিপরীতে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছে:
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কঠোর মুদ্রানীতি সত্ত্বেও উৎপাদনশীল খাত, কৃষি, সিএমএসএমই এবং রফতানিমুখী শিল্পে ঋণপ্রবাহ যেন বিঘিœত না হয়, সে দিকে নজর দেয়া হচ্ছে। সঙ্কটাপন্ন শিল্পের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি বন্ধ ও আর্থিক সঙ্কটে থাকা উৎপাদনশীল শিল্প পুনরুজ্জীবনে এই বিশাল তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই প্রণোদনা কার্যকর হলে প্রায় ২৫ লাখ প্রত্যক্ষ ও পরো কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার বা তৈরি হবে।
ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠাও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। খেলাপি ঋণ কমানো এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন নিশ্চিত না হলে বেসরকারী খাতে স্বাভাবিক ঋণপ্রবাহ ফিরবে না- এই বিশ্বাসে বাংলাদেশ ব্যাংক কাঠামোগত সংস্কারে মনোযোগ দিচ্ছে।
অন্য দিকে বিএনপি সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্কের মূল ভিত্তি হলো ২০৩০ সালের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করা। সরকার মূলত বাজারের পরিধি প্রসার ও মানসম্মত কর্মসংস্থানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও শ্রমবাজার অবকাঠামোর ওপর জোর দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে- জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যুবকদের কাজের বাজারে যুক্ত করতে সুনির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম হিসাবে এম্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ সেন্টার প্রতিষ্ঠা। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা হবে।
এর পাশাপাশি সনাতন শিক্ষার চেয়ে শিল্প চাহিদামুখী কারিগরি শিক্ষার বিস্তারে কারিগরি ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের কর্মসূচি রয়েছে। যাতে ‘স্কিল মিসম্যাচ’ বা যোগ্যতার ঘাটতি দূর করা যায়। এ ছাড়া বিদেশে দক্ষ ও আধা দক্ষ কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে একসাথে দু’টি লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা করা হয়েছে-এক দিকে দেশের ভেতরের বেকারত্বের চাপ কমানো, অন্য দিকে জাতীয় অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা।
কৃষিভিত্তিক শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি এবং আধুনিক উৎপাদনমুখী খাতে বেসরকারি ও বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে বিশেষ প্রণোদনার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
বাস্তব চ্যালেঞ্জ ও অর্থনীতির অন্তরায়
উভয় কর্তৃপক্ষের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবায়ন পর্যায়ে বাংলাদেশ অর্থনীতি বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানোর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণগ্রহণের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। উচ্চ মূলধন ব্যয়ের কারণে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাব এবং চড়া দামের কারণে কারখানার উৎপাদনমতা হ্রাস পাচ্ছে, যা নতুন চাকরি সৃষ্টির পথে প্রধান বাধা।
এ ছাড়া খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেয়ার সমতা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ মাঠপর্যায়ে কত দ্রুত পৌঁছাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। নীতিগত অনিশ্চয়তা ও ব্যবসায়িক পরিবেশও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সূচক অনুসারে, বাংলাদেশে ব্যবসা সহজীকরণের দুর্বল অবস্থা এবং নীতিগত ঘনঘন পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি এবং সরকারের সামষ্টিক উন্নয়ন নীতি একে-অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং পরিপূরক। উভয় উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নে নি¤œলিখিত পদক্ষেপে সমন্বয় প্রয়োজন। সরকার যদি সরকারি খরচ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ায়, তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতি ব্যর্থ হবে। তাই মুদ্রাস্ফীতি কমাতে রাজস্ব নীতিকেও সংযত হতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা যেন রাজনৈতিক প্রভাবে না গিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উৎপাদনশীল শিল্পে পৌঁছায়, তা মনিটর করা দরকার। সরকারের এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য পূরণ কেবল দেশীয় ঋণে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন শুল্ক অবকাঠামো সহজ করা এবং আইনি জটিলতা কমানো। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিই বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ও জটিল পরীক্ষা। এক দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক স্থিতিশীলতা আনতে চাচ্ছে, অন্য দিকে সরকার বিনিয়োগ বাড়ানো ও দক্ষ জনশক্তি গড়ার মাধ্যমে দ্রুত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে আগ্রহী। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো- এ দু’টি ক্ষেত্র বিচ্ছিন্নভাবে সফল হতে পারে না।
মূল্যস্ফীতি দমন, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, নীতিগত ধারাবাহিকতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বেসরকারি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ- এই পাঁচটি শর্ত একসাথে নিশ্চিত করা না গেলে শুধু নীতিগত সুদহার সমন্বয় বা সুনির্দিষ্ট কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা কোনো স্থায়ী সমাধান আনবে না। দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি নির্ভর করবে মুদ্রানীতি ও সরকারের কৌশলগত অর্থনৈতিক নীতির নিখুঁত সমন্বয়, উৎপাদনশীল খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং একটি বাজারবান্ধব ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর।



