ডিমলা (নীলফামারী) সংবাদদাতা
তিস্তা নদীর ভূগর্ভস্থ অঞ্চল থেকে প্রতিদিন অবৈধভাবে উত্তোলন করা হচ্ছে প্রায় অর্ধকোটি টাকার পাথর। এই বিশাল সিন্ডিকেটের মূল হোতা টেপাখরিবাড়ী ইউনিয়নের তেলীবাজার এলাকার জিয়ারুল হক এবং একই এলাকার প্রভাবশালী মানিক মিয়া। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ডিমলা নৌপুলিশ ফাঁড়িকে নিয়মিত ‘লাইন মানি’ দিয়ে নদীর বাঁধ ঘেঁষে চলছে এই বেআইনি বাণিজ্য।
পাথর উত্তোলনকারী ও ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতি ১০ দিন পরপর নৌপুলিশকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে জোটে অহেতুক হয়রানি ও মিথ্যে মামলা। মতির বাজারের ট্রাক্টর মালিক সাঈদ আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “নৌপুলিশ বিনা কারণে আমার ট্রাক্টর আটকে রাখে। পরে ছয় হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে তা ছাড়িয়ে আনি।”
তবে অভিযুক্ত মানিক মিয়া নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে দাবি করেন, তিনি কেবল একটি নৌকার মালিক এবং গয়াবাড়ীর একটি চক্রের সাথে জিয়ারুল জড়িত। তিনি আরো জানান, “প্রতি ১০ দিন পরপর নৌপুলিশের সাথে জিয়ারুল হকসহ অন্যদের যে সাক্ষাৎ করার কথা, তা আমি জানি।” অন্য দিকে অনুসন্ধানের বিষয়ে বক্তব্য নিতে গেলে জিয়ারুল হক ক্ষিপ্ত হয়ে পাথর উত্তোলনকারীদের নির্দেশ দেন প্রতিবেদককে বেঁধে পানিতে ফেলে দেয়ার, যাতে আর কেউ এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করতে না পারে।
অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় গত ২৪ আগস্ট দেখা যায়, ডিমলা নৌপুলিশ ফাঁড়ির এএসআই শামীম জিয়ারুল ও মানিক রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খান এবং এরপর জিয়ারুল হক এএসআই শামীমকে টাকা প্রদান করেন।
ঘটনার গভীরতা যাচাই করতে ২৬ আগস্ট দুপুর দেড়টায় এই সংবাদদাতা ছদ্মবেশে ডিমলা নৌপুলিশ ফাঁড়িতে যান। সেখানে কর্মরত এসআই স্বপন কুমার সরকার ও এএসআই শামীমের কাছে ১০টি ইঞ্জিনচালিত নৌকা এবং চারটি ট্রাক্টর চালানোর অনুমতি চাওয়া হলে তারা সপ্তাহে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম চাঁদা দাবি করেন। ছদ্মবেশী প্রতিবেদকের কাছ থেকে শেপ মেশিন ও ট্রাক্টর চালানোর জন্য অগ্রিম টাকা গ্রহণও করেন তারা। দরকষাকষির সময় পুলিশ কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানান, “জিয়ারুল ও মানিকের লাইনের বাইরে গিয়ে আপনারা কুলাতে পারবেন না। ওরা ১০ দিন পর পর আমাদের সাথে দেখা করে। এখানে থানা পুলিশ ও বিজিবি জড়িত, ক্যাম্প ইনচার্জ স্যারের সাথেও কথা বলা আছে। এর আগে রাতে গাড়ি আটকে রাখার পর সব ব্যবসায়ী একজোট হয়ে লাইনে এসেছে। আপনারা সতর্ক থাকবেন প্রথম সপ্তাহের টাকা অ্যাডভান্স দেবেন, পরেরটা সাত দিন পর। ব্যারাজের টি বাঁধের একটু উজান থেকে পাথর তুলবেন। আমাদের সাথে দেখা না করলে মেশিন চলবে না, আর লাইনের বাইরে গেলেই মামলা দেয়া হবে না হলে এক লাখ টাকা দিতে হবে।”
পরে ১ সেপ্টেম্বর রাতে সাংবাদিক পরিচয় প্রকাশ করে কথা বললে এসআই স্বপন কুমার সরকার ও এএসআই শামীম নিউজ না করার জন্য ‘সমন্বয়’ করার প্রস্তাব দেন এবং নিজেদের ভুল স্বীকার করেন। এএসআই শামীম ২৪ আগস্ট হোটেলে খাওয়ার পর পাথর সিন্ডিকেটের মূল হোতা জিয়ারুল হকের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের কথা স্বীকার করে বলেন, “শুধু আমাদের দু’জনের কারণে পাথর উত্তোলন হচ্ছে বললে ভুল ধারণা হবে, এখানে বিজিবি ও থানা পুলিশসহ অনেকেই জড়িত। হয়তো ক্যাম্প ইনচার্জ স্যারের সাথে কথা বলেই সিন্ডিকেটের সাথে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে। আপনারা নিউজ করলে আমাদের বদনাম হবে। সুযোগ দিলে আর এমন করব না।”
ঘটনা প্রসঙ্গে এসআই স্বপন কুমার সরকার জানান, ২৪ আগস্ট তিনি বাইরে থাকায় কোনো লেনদেন হয়ে থাকলে তা জানেন না। পরে তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সুপারিশ থাকে, এ ছাড়াও ক্যাম্প ইনচার্জের নির্দেশনা ছাড়া আমরা কিছু করি না। এখান থেকে যা পাই, তা সরাসরি ভোগ করি না; মেস খরচ বাবদ কিছু সাপোর্ট হয়। আপনি শুধু আমাদের দেখলেন? অন্যদের নামে তো আর নিউজ করতে পারবেন না।
বিষয়টি নিয়ে ডালিয়া নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুজ্জামানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, পাথর উত্তোলন বা গাড়ি চলাচলের কোনো তথ্য আমার জানা নেই। ফাঁড়িতে ফোর্স কম। আমাদের কাছে কোনো কমিশন আসে কি না তা বলতে পারব না, তথ্য থাকলে ফাঁড়িতে এসে কথা বলুন।
বার্ণিরঘাট বিওপি ক্যাম্প কমান্ডারও বিজিবির সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, বিজিবি কখনো কোনো অন্যায় বা অবৈধ কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেনি। তিনি জানান, মাত্র কয়েক দিন আগে তিনি দায়িত্বে এসেছেন। এ বিষয়ে এত কিছু তার জানা নেই এবং কেউ তাকে কিছু জানায়নি।
ডিমলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: আশরাফুল ইসলাম বলেন, সদ্য যোগদান করেছি, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। তবে খোঁজ নিয়ে দেখব। এমন কোনো ঘটনা ঘটলে তা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো: ইমরানুজ্জামান বলেন, তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন সম্পূর্ণ বেআইনি। ছদ্মবেশী অনুসন্ধানে যে কোনো বাহিনীর সদস্যদের জড়িয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত গুরুতর। নদী ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত সিন্ডিকেট, ব্যবসায়ী কিংবা প্রশাসনের যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
এ বিষয়ে রাজশাহী অঞ্চলের নৌপুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, “তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের অভিযোগ গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হবে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নৌপুলিশের অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে।



