আল-আমিন হোসাইন নাজিরপুর (পিরোজপুর)
ভোরের প্রথম আলো যখন বেলুয়া নদীর নীরব জলে ভেসে পড়ে, তখনই নদীর বুকজুড়ে শুরু হয় শতাধিক নৌকার আনাগোনা। কেউ সবজি নিয়ে আসছে, কেউ মাছ-গোশত, কেউবা গাছের চারা-বীজ আর নৌকার ওপরেই চা-পিঠার দোকান বসিয়ে ব্যস্ত দিন শুরু করছেন কেউ কেউ। মাঝির বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, ট্রলারের ইঞ্জিনের গর্জন আর ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক মিলিয়ে নদীজুড়ে সৃষ্টি হয় এক অপূর্ব বাজারের পরিবেশ এ যেন নদীর বুকে গড়ে ওঠা স্বতন্ত্র জীবনচক্র।
এমনই দৃশ্য দেখা যায় পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বিখ্যাত বৈঠাকাটা ভাসমান হাটে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ নদীভিত্তিক হাট হিসেবে পরিচিত। শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যই নয় বৈঠাকাটা ভাসমান হাট দক্ষিণাঞ্চলের নদীনির্ভর মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ভাসমান হাট স্থানীয় মানুষের জীবিকা, অর্থনীতি এবং সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার সূর্যোদয়ের সাথে সাথে বেলুয়া নদী রূপ নেয় বিশাল এক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে। বর্ষাকালে সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত, আর শীতকালে বেলা ১০টা পর্যন্ত চলে লেনদেন। এখানে পাওয়া যায় নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছু সবজি, মাছ- গোশত, চাল-ডাল, হাঁস-মুরগি, নাশতার দোকান, এমনকি শ্যাওলা ও বিভিন্ন গাছের চারা পর্যন্ত। নাজিরপুর উপজেলার বিলাঞ্চল হওয়ায় সড়কপথের চেয়ে নৌপথই এখানে বেশি সুবিধাজনক। তাই হাটে পৌঁছতে নৌকা ছাড়া বিকল্প নেই। এই হাট শুধু স্থানীয় নয় পিরোজপুর ছাড়াও গোপালগঞ্জ, বরিশাল, ঝালকাঠি, বাগেরহাট ও শরীয়তপুর জেলা থেকেও পাইকারি ব্যবসায়ীরা নৌপথে চলে আসেন।
বছরের পর বছর ধরে এই হাটের সাথে যুক্ত রয়েছেন আব্দুল হক। তিনি বলেন, এখান থেকে চারা ও সবজি কিনে খুলনা এবং বাগেরহাট এলাকায় খুচরা বিক্রি করি। শুরুতে ছোট নৌকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। এখন স্টিলের বড় ট্রলার আছে। এখানে চাষ করা চারা ও সবজির মান খুব ভালো ক্রেতার কোনো অভাব হয় না।
নাজিরপুরের পাশের বিশারকান্দি এলাকার পাইকারি ব্যবসায়ী এনায়েত বাহাদুর জানান, ৪০ বছর ধরে এই বাজারের সাথে আছি। ভোলা জেলার বিভিন্ন স্থানে এখানকার সবজি-বৃক্ষচারা বিক্রি করি। এই হাটের সাথে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা জড়িত, কিন্তু নৌযান ছাড়া যোগাযোগের কোনো আধুনিক ব্যবস্থা নেই। অনেক কৃষক তাদের নিজস্ব উৎপাদিত ফসল নিয়ে আসেন ভাসমান হাটে। সোনাপুর গ্রামের কৃষক আজাদ শেখ বলেন, বাপের সাথে আগে আসতাম, এখন নিজে আসি। যদি সরকার আমাদের দিকে একটু নজর দিত, তাহলে আমরা অবহেলিত থাকতাম না।
পদ্মা সেতু চালুর পর যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। লঞ্চ সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ঢাকায় পণ্য পাঠাতে সমস্যা হচ্ছে। লাবু মোল্লা জানান, আগে লঞ্চে সবজি নিয়ে ঢাকায় বেচতাম ভালো লাভ হতো। এখন লঞ্চ না থাকায় খরচ বেড়েছে। বৈঠাকাটা থেকে নাজিরপুর পর্যন্ত রাস্তা ভাঙা, গাড়িতে পাঠানোও কষ্টকর। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান হাসানত ডালিম বলেন, বৈঠাকাটা ভাসমান হাটকে ঘিরে কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা চলে। কৃষকরা সরাসরি পণ্য বিক্রি করেন বলে তারা ন্যায্য দাম পান, মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব কম। হাটে প্রতিদিন কোটি টাকার লেনদেন হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা বলেন, বৈঠাকাটা বাংলাদেশের বৃহত্তম ভাসমান হাট। এর উন্নয়নে বেশ কিছু পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে, দ্রুত বাস্তবায়ন হবে।



