মালয়েশিয়া থেকে ৯০০ কিলোমিটার দূরের ক্লানতান কোতাবারুর একটি ‘নেংটা জেলে’ এখনো দেড় শতাধিক বাংলাদেশী সাজা খাটছেন। তাদের সবারই শারীরিক ও মানসিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। জেল কর্তৃপক্ষের অমানুষিক নির্যাতন আর বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহায়তা না পেয়ে শেষমেষ দেশের জমিজমা বিক্রি করেই কেউ কেউ খালি হাতে দেশে ফিরে আসছেন। অনেকে আবার সাজা খাটার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও শুধু বিমান টিকিট না থাকার কারণে ওই জেলেই বিনা চিকিৎসায় মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
গত সপ্তাহে মালয়েশিয়ার কোতাবারুর আটটি ‘নেংটা জেলখানা’ থেকে ১৫০ বাংলাদেশীকে একটি ফ্লাইটে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। দেশে ফেরাদের অভিযোগ, অন্যান্য দেশের হাইকমিশন অথবা দূতাবাসের কর্মকর্তারা তাদের দেশের নাগরিকদের সমস্যা সমাধান করতে প্রতিনিয়ত খোঁজ নিচ্ছে। মালয়েশিয়া সরকারের নির্ধারিত জরিমানার টাকা দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করছে তারা। কিন্তু ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশের বেলায়। মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশ হাইকমিশনের কোনো কর্মকর্তা আটকদের জেলখাটার সময় পর্যন্ত ছাড়ানো তো দূরের কথা, কারো খোঁজখবর নিতে পর্যন্ত তারা যাচ্ছেন না বলে ক্ষোভ ও অভিযোগ করেন এসব অসহায় মানুষ।
তবে আটকদের এমন অভিযোগ অস্বীকার করে মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশনের মো: সিদ্দিকুর রহমান (মিনিস্টার লেবার) গতকাল নয়া দিগন্তের কাছে দাবি করে বলেন, ‘হাইকমিশনার স্যারের অফিস আদেশ রয়েছে, যেসব কারাগার, ডিটেনশন সেন্টারে বাংলাদেশীরা বন্দী আছেন তারা বৈধ হোক আর অবৈধ হোক, প্রতিটি কারাগারেই সরেজমিন যেতে হবে এবং আটকদের বিষয়ে কী ধরনের সহায়তা দিয়ে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা-ও অফিসিয়ালি জানাতে হবে। সেভাবেই কর্মকর্তারা ইদানীং কারাগারের তালিকা তৈরি করে প্রতি সপ্তাহে একেক অফিসারের সমন্বয়ে একেকটি টীম ভিজিট করছেন’।
আফজাল হোসেন (৪৬)। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা। গ্রামের বাড়ি উল্লাপাড়া, বোয়ালিয়া, সিরাজগঞ্জ। মালয়েশিয়া থেকে ফিট এয়ারের একটি ফ্লাইটে শ্রীলঙ্কার কলম্বো বিমানবন্দর হয়ে গত ৭ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১২টায় ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। তার সিট নম্ব্র ছিল ২৩/এ, জোন ৩। একই ফ্লাইটে ক্লানতান কোতাবারুর আটটি কারাগার থেকে আরো ১৪৯ জন দেশে ফেরত আসেন। কারাগার থেকে বের করার পর ঢাকার বিমানবন্দরে পৌঁছার আগ পর্যন্ত তাদের কাউকে পানি পর্যন্ত পান করতে দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের। এর আগে তাদের একেকজনকে সাজার পাঁচ মাস নেংটা জেলে কাটাতে হয়েছে।
ওই নেংটা কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে গত শনিবার আফজাল হোসেন এসেছিলেন নয়া দিগন্তের ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে। এ সময় তিনি কথা বলার আগেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। এরপর বলেন, আল্লাহ আমাকে ওই কুখ্যাত কারাগার থেকে ফিরে আসার সুযোগ দিয়েছেন। এর জন্য আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাই। এখন আমার ইচ্ছা, যদি ওই কারাগার থেকে একজনকেও আপনাদের সহায়তায় মুক্ত করে দেশে আনতে পারি। তাহলে মনটাকে কিছুটা হলেও সান্ত্বনা দিতে পারব। কারণ এখন ওই কারাগারে ১৫০ জন বাংলাদেশী আটক আছেন, তাদের কারো কারো শরীরে খোঁচপাচড়া হয়ে ‘পচন’ ধরে গেছে। এর মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা তো খুবই খারাপ। তাদের মধ্যে উল্লাপাড়ার জাহাঙ্গীর, চুয়াডাঙ্গার কামাল, বগুড়ার মোশাররফ, কক্সবাজার ঈদগাঁও মাঠ এলাকার রহিম, বরিশাল গৌরনদীর সবুজ, ঠাকুরগাঁওয়ের ইব্রাহিম ও আলমডাঙ্গার বাবলু, শাহিন, তাজউদ্দিন, হাবিব, বাবলু, আনোয়ারের নাম মনে আছে।
আফজাল নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি ২০২৩ সালের ২২ জানুয়ারি ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে প্রথমে থাইল্যান্ড গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফ্লাইটে কুয়ালালামপুর যাই। শখের বসে ভিসা হওয়ায় মালয়েশিয়ায় যাই এবং সেখানে গিয়ে কাজের সন্ধানে থেকে যাই। এরপর কাউছার নামে এক বাঙালির ক্ষেতে কৃষিকাজ করি ১৭’শ রিংগিট মাসিক বেতনে। কিন্তু তিন মাস কাজ করানোর পরও বেতনের সাত হাজার ২০০ রিংগিটের সে একটি টাকাও দেয়নি। বেতন চাইলে উল্টো পুলিশে ধরিয়ে দেয়ার হুমকি দিতো। আরেকটি কাজ এক মাস করার পর বেতন না দেয়ায় সেটিও ছেড়ে দিতে হয়েছে। এরপর চীনা কোম্পানির কনস্ট্রাকশন সেক্টরে কাজ পাই। সেখানে ১০ মাস কাজ করার পর সঠিক বেতন পেয়েছি। তাদের প্রজেক্ট শেষ হওয়ায় নতুন কাজের সন্ধানে পাহাম প্রদেশের কুতা-বাড়– এলাকার জেলোয়ার ইউনিভার্সিটির প্রজেক্টে যাই। এখানেই ৬০০ বাংলাদেশী কাজ করছিল। এখানে কাজ শুরু করি। একদিন পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে আমাদের কোম্পানির আটটি বাসাবাড়ি থেকে ৪০ জনকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর নেয়া হয় আদালতে। সাজা হয় পাঁচ মাসের। মালয়েশিয়ার জেলে প্রতি মাস হয় ২০ দিনে। ১০০ দিন ছিলাম কারাগারে। এই সময়ের মধ্যে কোতাবারুর মাচাং, ইনসাফ ও পারিমাচাং কারাগারে বদলি করা হয়। আফজাল তার পাঁচ মাস কারাজীবনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমি মাচাং কারাগারে মোট ৮৪ দিন ছিলাম। হাইকমিশনের কোনো লোক না আসায় দালালের মাধ্যমেই টিকিট কেটে প্রতারিত হই। কারণ কারো সাথেই যোগাযোগ নাই। পরে দেশ থেকে জমি বিক্রি করে নিজের চেষ্টায় ঢাকায় ফিরে আসি। কারাগারে আমাদের সবাইকে নেংটা হয়েই থাকতে হতো। কারো গায়েই কাপড় নেই। কারাগারে যাওয়ার এক সপ্তাহ পরই চর্মরোগ শুরু হয়। নেই কোনো ওষুধ। এক মাসের মধ্যে শরীরে ‘ঘা’ শুরু হয়। গোপন অঙ্গেও ঘা হয়ে যায়। অনেকে জ্বালাযন্ত্রণা থেকে বাঁচতে পলিথিন দিয়ে গোপনাঙ্গ ঢেকে রাখে। ছোট একটা রুমে ২২ জন ছিলাম আমরা। সবাই উলঙ্গ। গরম বেশি। চুলকাতে চুলকাতে পলেস্টারের যে কাপড় দেয় সেটি কেউ আর গায়ে রাখতেই পারে না। প্রতিদিন সকালের নাস্তায় ঢাকার পাঁচ টাকার মতো একটা রুটি দেয়া হয়। দুপুরে এক’শ গ্রামের চাউলের ভাত দেয়। সাথে সবজি আর সিদ্ধ মাছ দেয়। তরকারিতে লবণ নাই। এভাবে পাঁচ মাস কেটেছে। ওই নেংটা জেলে এখনো ১৫০ জন বাংলাদেশী আছে। তাদের মধ্যে ৪৩ জনের সাজা খাটা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তারা টিকিটের টাকা দালালদের দিয়ে প্রতারিত হওয়ায় দেশে ফিরতে পারছে না। আর ২৫ জনের সাজা এখনো শেষ হয়নি। কারণ তারা জেলে মিথ্যা কথা বলায় তাদের সাজা তিন মাস বাড়িয়ে ৯ মাস করেছে জেল কর্তৃপক্ষ। আমি দেশে এসেছি। এখন তাদের মধ্য থেকে যদি কোনো একজনকেও ছাড়ানোর ব্যবস্থা করতে পারি সেটাই হবে আমার সার্থকতা। এক প্রশ্নের উত্তরে আফজাল হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি যে পাঁচ মাস উলঙ্গ কারাগারে ছিলাম সেখানে পাকিস্তান, ভারতসহ অন্যান্য দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের দেখেছি তাদের লোকজনকে জরিমানা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে আমাদের দেশের হাইকমিশনের কোনো কর্মকর্তাকেই একদিনের জন্যও আসতে দেখিনি।
গতকাল সন্ধ্যার আগে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মিনিস্টারের (লেবার) সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের হাইকমিশনার মো: মনজুরুল ইসলাম খান চৌধুরী স্যারের অফিসিয়াল নির্দেশনা রয়েছে, প্রতি সপ্তাহে মালয়েশিয়ার কারাগার/ডিটেনশন সেন্টার যেখানে বাংলাদেশী আছে সবগুলোই ভাগ ভাগ করে পরিদর্শন করতে হবে। আমি আজও জহুরবারুর কারাগারে আটক ৬০ জনের বিষয়ে খোঁজ নিয়েছি। পাহাং জেলখানা পরিদর্শন করেছি। তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। কুয়ালালামপুর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের বেরানাং ক্যাম্পে খোঁজ নিয়েছি। সেখানে থাকা নড়িয়া, বাঁশখালী ও শিবপুরের বাসিন্দা এমন তিনজনের সাথে সরাসরি কথা বলেছি এবং ওই জেলার ইউএনওয়ের সাথে তাদের ভিডিও কলে কথা বলিয়ে দিয়েছি। অনেকে তাদের নামও সঠিকভাবে বলতে পারে না। আমরা এ নিয়ে কাজ করছি। গত বছর সাত হাজার ট্রাভেল পাশ ইস্যু হয়েছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার কারাগারগুলোতে মোট কতজন এই মুহূর্তে আটক আছে তার সঠিক সংখ্যা বলতে পারব না। তবে যারা টিকিটের জন্য দেশে ফিরতে পারছে না, এমন অসহায় লোকের জন্য হাইকমিশন থেকে টিকিট দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করছি বলে দাবি করেন তিনি।



