যেসব সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশ

জসিম উদ্দিন রানা
Printed Edition
  • কোনো শাস্তি হচ্ছে না।
  • আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে না।
  • বিশ্বকাপের লাভের ভাগও দেয়া হবে।
  • আইসিসি বাংলাদেশের পাওনা টাকা দেবে।
  • একটি আইসিসির ইভেন্ট আয়োজনের সুযোগ।

আসলে ক্রিকেটে ভারতের মতো মোড়লকে অস্বস্তিদায়ক পরিস্থিতিতে ফেলতে পেরে বাংলাদেশ-পাকিস্তান উভয়েই নিজেদের নৈতিক জয় খুঁজে নিচ্ছে। শুধু আফসোসটা রয়ে গেল বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের। ১৯৯৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে ওয়ানডে, টি-২০ মিলে টানা ১৬ বিশ্বকাপ খেলা বাংলাদেশ এবারই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ মিস করেছে। এক মোস্তাফিজের জন্য লড়াই করে দেশপ্রেমের অনন্য নজির দেখাল বাংলাদেশ।

অবশেষে আইসিসি, পিসিবি এবং বিসিবি তিন পক্ষের বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তানের সরকার। শুরুতে ভারত ম্যাচ বয়কটের ঘোষণাও দিয়েছিল পাকিস্তান সরকারই। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট কুমারা দিসানায়েকের সাথে সরাসরি কথা বলেন। পরে সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক আলোচনার ফলাফল ও বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান সরকার জাতীয় দলকে ১৫ ফেব্রুয়ারি মাঠে নামার নির্দেশ দিয়েছে। ক্রিকেটের চেতনা রক্ষা এবং বিশ্বব্যাপী এই খেলাটির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই এ সিদ্ধান্ত।’

গত ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ টি-২০ বিশ্বকাপ শুরুর দিনই রাতে তড়িঘড়ি করে লাহোরের উদ্দেশে রওনা দেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। পর দিন ৮ ফেব্রুয়ারি লাহোরে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) কার্যালয়ে পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভির সাথে বৈঠকে বসেন আইসিসি ডেপুটি চেয়ারম্যান ইমরান খাজা। ম্যারাথন বৈঠক শেষে সমাধান বের হয়। গত ১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকারের এক্স হ্যান্ডলে ভারতের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। ৪ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সমর্থনে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ পাকিস্তান বয়কট করবে। যদি ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মাঠে না গড়াত, সে ক্ষেত্রে সাত হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হতো। এমনকি আইসিসির সাথে সম্প্রচার ও স্পন্সরশিপ চুক্তিও বাতিল করে দিত জিও স্টার। অবশেষে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলো পাকিস্তান।

২০২৮ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে নতুন করে একটি আইসিসি ইভেন্ট আয়োজনের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। লাহোরে আইসিসি, পিসিবি এবং বিসিবি তিন পক্ষের মধ্যে আলোচনা শেষে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিষয়টি জানিয়েছে আইসিসি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আইসিসি টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি প্রসঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করলেও, ক্রিকেটের বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিসিবিকে একটি মূল্যবান পূর্ণ সদস্য হিসেবে আবার স্বীকৃতি দিয়েছে- যাদের গৌরবময় ক্রিকেট ঐতিহ্য এবং বৈশ্বিক ক্রিকেটের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আইসিসি আরো নিশ্চিত করেছে যে, বিশ্বের অন্যতম প্রাণবন্ত ক্রিকেট বাজার, যেখানে ২০ কোটিরও বেশি উচ্ছ্বসিত ক্রিকেট সমর্থক রয়েছেন, সেখানে ক্রিকেটের বিকাশে তারা তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে, যাতে বাংলাদেশ জাতীয় দলের আইসিসি টি-২০ বিশ্বকাপে অংশ না নেয়ার বিষয়টি দেশের ক্রিকেটে দীর্ঘমেয়াদি কোনো নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে।’

আইসিসি আরো জানায়, ‘আইসিসির সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসন, শাসন কাঠামো কিংবা বিদ্যমান সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে কোনোভাবেই পরিবর্তন, সীমিত বা ক্ষুণœ করে না- সবকিছু আগের মতোই কার্যকর থাকবে।’

বিসিবির ওপর কোনো জরিমানা বা শাস্তি নয় বিষয়ে আইসিসি জানায়, ‘এই বিষয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ওপর কোনো আর্থিক, ক্রীড়াগত বা প্রশাসনিক শাস্তি আরোপ করা হবে না- এমন সিদ্ধান্তে সবাই একমত হয়েছেন। বর্তমান আইসিসি বিধি অনুযায়ী, চাইলে বিসিবি ডিসপিউট রেজোলিউশন কমিটির (ডিআরসি) শরণাপন্ন হতে পারবে- এ অধিকার বহাল থাকবে। আইসিসির এই অবস্থান নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতার নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং শাস্তির পরিবর্তে সহায়ক ভূমিকা রাখার অভিন্ন লক্ষ্যকে প্রতিফলিত করে।’

২০২৮ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে আইসিসি ইভেন্ট আয়োজন নিয়ে আইসিসিরি ব্যাখ্যা, ‘সমঝোতার অংশ হিসেবে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, আইসিসি ওয়ানডে ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০৩১-এর আগেই বাংলাদেশ একটি আইসিসি ইভেন্ট আয়োজন করবে। তবে এটি আইসিসির প্রচলিত আয়োজক নির্বাচন প্রক্রিয়া, সময়সূচি ও পরিচালনাগত শর্ত সাপেক্ষে কার্যকর হবে। এটি আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশের সক্ষমতার ওপর আইসিসির আস্থার প্রতিফলন এবং সদস্য দেশগুলোতে ক্রিকেটের উন্নয়নে অর্থবহ আয়োজনের সুযোগ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতিকে আরো জোরালো করবে। আইসিসি, পিসিবি ও বিসিবি-অন্যান্য সদস্যদের সাথে, ক্রিকেটের সর্বোত্তম স্বার্থে ভবিষ্যতেও সংলাপ, সহযোগিতা ও গঠনমূলক সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সবাই একমত হয়েছেন যে, এই সমঝোতার মূল উদ্দেশ্য খেলাটির অখণ্ডতা রক্ষা এবং ক্রিকেট পরিবারে ঐক্য বজায় রাখা।’

আইসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জোগ গুপ্তা বলেছেন, ‘আইসিসি টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি দুঃখজনক, তবে এটি বাংলাদেশকে একটি মূল ক্রিকেটিং দেশ হিসেবে আইসিসির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতিকে পরিবর্তন করে না। বিসিবিসহ সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে দেশে ক্রিকেটের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য, যাতে খেলোয়াড় ও সমর্থকদের জন্য ভবিষ্যৎ সুযোগ আরো শক্তিশালী হয়।’

৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ মার্চ ভারত এবং শ্রীলঙ্কায় চলবে আইসিসি টি-২০ বিশ্বকাপ। ২০৩১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারতের সাথে সহ-আয়োজক হিসেবে আছে বাংলাদেশ। সেই সাথে ২০২৭ অনূর্ধ্ব-১৯ নারীদের বিশ্বকাপেরও আয়োজক বাংলাদেশ। এর বাইরে কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজনের দায়িত্ব বাংলাদেশকে আইসিসি দেয় তাই এখন দেখার ব্যাপার।

ক্রিকেটের জয় হয়েছে : আফ্রিদি

২০২৬ টি-২০ বিশ্বকাপ নিয়ে অচলাবস্থা দূর হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে ক্রিকেটের জয় হয়েছে বলে মনে করেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক শহিদ আফ্রিদি। এক্সে দেয়া এক বার্তায় আফ্রিদি লিখেছেন, ‘ক্রিকেটীয় চেতনা জয়ী হয়েছে। ম্যাচটি খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে পাকিস্তান সরকার টি-২০ বিশ্বকাপের পবিত্রতা রক্ষা করেছে এবং বিশ্বব্যাপী খেলাটির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছে। ক্রিকেট জিতেছে, এর মানে হলো বিভাজন দূর করতে এটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাবে।’

মাইকেল ভন

টানা আট দিনের চেষ্টার পর অবশেষে পাকিস্তানকে সিদ্ধান্ত থেকে সরিয়ে এনেছে আইসিসি। এমন সুখবরের পর এবার ভারত-পাকিস্তান টেস্ট দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ভন। সিরিজটি কোথায় হতে পারে সেটাও জানিয়েছেন তিনি, ‘এটা ক্রিকেটের জন্য দারুণ সিদ্ধান্ত। এবার যে কোনোভাবেই হোক শিগগিরই এই দুই দলের মধ্যে একটি টেস্ট সিরিজের আয়োজন করা দরকার। তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজের জন্য যুক্তরাজ্য হতে পারে দারুণ জায়গায়।’

আকাশ চোপড়া

ভারতীয় ক্রিকেট বিশ্লেষক আকাশ চোপড়াও বেশ খুশি পাকিস্তানের ইউটার্নে। তার মতে, বাংলাদেশের আসলে শাস্তি পাওয়ার কথাই ছিল না। নিজের ইউটিউব চ্যানেলের এক ভিডিওতে আকাশ বলেছেন, ‘আইসিসিও প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, বাংলাদেশকে কোনো শাস্তি দেয়া হবে না। বাংলাদেশের আসলে কখনোই শাস্তি পাওয়ার কথা ছিল না। আইসিসি বলেছে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের সমর্থকদের তারা গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ছাড়া জানিয়েছে, ২০৩১ বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশকে আইসিসি ইভেন্ট আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হবে। তবে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ এবং ত্রিদেশীয় সিরিজ নিয়ে আইসিসিও কিছু বলেনি।’

খুশি বিসিসিআই সহসভাপতিও

অবশেষে সমস্যার সমাধান হওয়ায় ভীষণ খুশি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) সহসভাপতি রাজীব শুক্লা। এই সমাধানে আইসিসি-বিসিবি-পিসিবির ত্রিপক্ষীয় বৈঠককে পূর্ণ কৃতিত্ব দিয়েছেন রাজীব। তার কথায়, ‘লাহোরে বিসিবি ও পিসিবি কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করে আইসিসি একটি চমৎকার সমাধান বের করেছে। আমি তাতে ভীষণ খুশি। এটা একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধান।’ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী এই ম্যাচটি হতে যাওয়ায় প্রায় ১৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার লোকসানের হাত থেকে বেঁচে গেল আইসিসি। যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ১৯ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। এ দিকে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিশ্চিত হওয়ার খবরে মুম্বাই-কলম্বো-মুম্বাই রুটে বিমান ভাড়া এবং ভ্রমণের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে গেছে।

বিসিবির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ

সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টায় ইতিবাচক ভূমিকা পালনের জন্য পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি), আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘এই সময়কালে বাংলাদেশকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় আমরা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত। আমাদের ভ্রাতৃত্ব দীর্ঘজীবী হোক। পাকিস্তানে আমার সংক্ষিপ্ত সফর এবং আমাদের আলোচনার আসন্ন ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে, আমি সমগ্র ক্রিকেট ইকোসিস্টেমের সুবিধার্থে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানকে খেলাটি খেলার জন্য অনুরোধ করেছি।’