প্রযুক্তিতে বদলে যাচ্ছে পর্যটন খাত

Printed Edition

আবুল কালাম

প্রযুক্তির স্পর্শে বদলে যাচ্ছে পর্যটন খাত। পুরনো চিরাচরিত গতানুগতিক বাঁধাধরা ট্যুর প্যাকেজের ধারণা থেকে বের হয়ে আসছে মানুষ। সময়ের সাথে অভিজ্ঞতাভিত্তিক, পরিবেশবান্ধব ও স্বাধীন ভ্রমণের দিকে ঝুঁকছে তারা। এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ভ্রমণপিপাসুদের সচেতন মানসিকতা। চলতি বছরে বর্তমান ধারায় পর্যটন শিল্পের এই আমূল রূপান্তরকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘স্মার্ট ট্যুরিজম ইকোসিস্টেম’।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক পরিবর্তনের প্রধান দিকগুলো হলো- প্রযুক্তিগত রূপান্তর, স্মার্ট ও কন্ট্যাক্টলেস অ্যাভিয়েশন, রোবোটিকস ও চ্যাটবট, ভিসা সহজীকরণ, টেকসই ও সচেতন ভ্রমণ, অ্যান্টি-ট্যুরিজম, ইকোট্যুরিজম ও কার্বন সচেতনতা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন, অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক ভ্রমণ, লিটল ট্রিট ট্রিপস, সেট-জেটিং। তাদের মতে, পরিবর্তনের এই ইতিবাচক ধারা শুধু পর্যটকদের অভিজ্ঞতাই সমৃদ্ধ করছে না; বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলছে। এমনটি অব্যাহত থাকলে পরিবেশ রক্ষা করে আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে পর্যটন খাত আগামী দিনে আরো টেকসই ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

বিষয়গুলোর ব্যখা দিতে গিয়ে তারা বলছেন, ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে এখন হিউম্যান এজেন্সির পাশাপাশি এআই-ভিত্তিক ট্যুর প্ল্যানার ও চ্যাটবট ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। হোটেল বুকিং, যাতায়াত এবং পেমেন্টে কন্ট্যাক্টলেস বা বদলে যাওয়া পর্যটন খাতের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত চালিকাশক্তি খাতে

রোবটিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। অ্যাভিয়েশন প্রযুক্তির উন্নতির ফলে দীর্ঘপথের বিমানে ডিরেক্ট বা সরাসরি রুট বৃদ্ধি পাওয়ায় ট্রানজিটের ঝামেলা কমছে।

অন্য দিকে ছবি তুলতে গিয়ে নির্দিষ্ট স্পটের বাইরে স্থানীয় সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা ও ঐতিহ্যের সাথে মিশে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত পর্যটক জট বা ওভারট্যুরিজম এড়িয়ে প্রকৃতির ক্ষতি না করে এমন টেকসই ও অর্গানিক ভ্রমণের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। এতে নিজের পছন্দমতো কাস্টমাইজড বা আলাদাভাবে সাজানো হোটেল ও রিসোর্ট স্টে বেছে নিচ্ছেন পর্যটকরা। তুলনামূলক কম পরিচিত, নিরিবিলি ও নিরাপদ স্থানগুলোতে ভ্রমণ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন তারা।

এ বিষয়ে ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের (টোয়াব) সচিব মো: নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া নয়া দিগন্তকে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্মার্ট প্রযুক্তির জয়জয়কার ভ্রমণের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। তার ভাষ্য, এখন ট্যুর এজেন্সির ওপর নির্ভর না করে পর্যটকরা জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডেই নিজেদের পছন্দমতো সম্পূর্ণ কাস্টমাইজড ভ্রমণসূচি তৈরি করে নিচ্ছেন।

অন্য দিকে সরকারের আধুনিক বিমান নীতি ও নতুন ভিসা পলিসি, ই-ভিসা সেবা চালুর উদ্যোগ পর্যটকদের জন্য যাতায়াত অনেক সহজ করেছে। বিমানবন্দরে স্বয়ংক্রিয় কাস্টমস ও লাগেজ ট্র্যাকিং সিস্টেমের ব্যবহারও বাড়ছে। আধুনিক হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে ডিজিটাল চেক-ইন এবং সাধারণ সেবার জন্য চ্যাটবট ও রোবটের ব্যবহার এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইকোট্যুরিজমের বিষয়ে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় প্রকৃতিকে অক্ষুণœ রেখে ভ্রমণের প্রবণতা বেড়েছে। প্লাস্টিক বর্জন ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে পর্যটকরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। সাজেক বা কক্সবাজারের মতো অতিরিক্ত ভিড়ের জায়গা এড়িয়ে মানুষ এখন নিরিবিলি, কম পরিচিত এবং ছিমছাম গ্রাম্য বা পাহাড়ি পরিবেশ বেছে নিচ্ছেন। তার ভাষ্য, ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন এক জায়গায় বসে কাজ করার বাধ্যবাধকতা কমেছে। ফলে তরুণরা ভ্রমণের পাশাপাশি দূরবর্তী কাজ করার সংস্কৃতি বা ‘সাবাটিক্যাল নোম্যাডিজম’ বেছে নিচ্ছেন। কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করতে মানুষ এখন লম্বা ছুটির অপেক্ষা না করে সপ্তাহান্তে সংক্ষিপ্ত; কিন্তু ঘন ঘন ভ্রমণে ঝুঁকছেন।

চলতি বছরে প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের জিডিপিতে (এউচ) পর্যটন খাতের বর্তমান অবদান প্রায় ৩ শতাংশ। তবে সরকার এই আধুনিক রূপান্তরকে কাজে লাগিয়ে আগামীতে জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ৬ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

এ বিষয়ে টোয়াবের এই কর্মকর্তা বলেন, পর্যটনের এই আধুনিক পরিবর্তনের ফলে অর্থনৈতিক সুবিধা ও সম্ভাবনা বহু গুণ বেড়েছে। প্রযুক্তি, টেকসই অবকাঠামো এবং নতুন ট্র্যাভেল ট্রেন্ডের সংমিশ্রণ পর্যটন খাতকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করছে। এতে করে বর্তমানে বাংলাদেশের পর্যটন রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।