বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আবারো কি এক নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে? অলিগার্ক শ্রেণীর অনুপ্রবেশের চেষ্টা সে শঙ্কাই জাগিয়ে তুলছে। অর্থনীতির ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, যখন অল্প কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রের নীতি, সম্পদ ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তখন তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই অলিগার্ক শ্রেণীর উত্থান হয় শেখ হাসিনার আমলে, যা ইতোমধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এই শক্তি যদি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তবে তার প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে? অর্থনীতিতে আবারো কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
অলিগার্ক কারা?
‘অলিগার্ক’ শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘ড়ষরমড়ং’ (অল্প) এবং ‘ধৎশযবরহ’ (শাসন করা) থেকে। অর্থাৎ, এমন একশ্রেণী যারা সংখ্যায় কম হলেও অর্থ, ক্ষমতা ও প্রভাবের মাধ্যমে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। অলিগার্করা সাধারণত বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের মালিক। তারা রাজনৈতিক দলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাবশালী এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সরাসরি বা পরোক্ষ ভূমিকা রাখে। এই শ্রেণী নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ব্যবহার করে, ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং সাধারণ জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কিভাবে অলিগার্করা সরকারকে প্রভাবিত করে?
অলিগার্কদের প্রভাব বিস্তারের পদ্ধতি বেশ সূক্ষ্ম; কিন্তু কার্যকর। তারা সরাসরি ক্ষমতায় না থেকেও ক্ষমতার কেন্দ্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। অলিগার্করা রাজনৈতিক দলকে অর্থায়ন করে, নির্বাচনী প্রচারণায় সহায়তা দেয়। ফলে সরকার গঠনের পর তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। তারা এমন নীতি প্রণয়ন করাতে সক্ষম হয়, যা তাদের ব্যবসার জন্য সুবিধাজনক। যেমন : সহজ শর্তে ঋণ, কর ছাড় ও নিয়ন্ত্রণ শিথিলতা। নিজেদের লোকজনকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বসিয়ে তারা বড় অঙ্কের ঋণ নেয়। খেলাপি ঋণকে বৈধ করার পথ তৈরি করে ও ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে ব্যাংককে ঠেলে দেয়। বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও প্রশাসনে প্রভাব খাটিয়ে তারা জবাবদিহিতা এড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট : অলিগার্ক শ্রেণীর উত্থান
গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি নতুন শ্রেণীর উত্থান লক্ষ করা গেছে, যারা ব্যবসা, রাজনীতি ও ব্যাংকিং খাতকে একসূত্রে গেঁথে ফেলেছে। ক্ষমতাসীন দলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা গ্রুপসহ বেশ কিছু ব্যবসায়ী দ্রুত অস্বাভাবিকভাবে সম্পদশালী হয়ে ওঠে। তারা সরকারি প্রকল্প, ব্যাংক ঋণ এবং নীতিগত সুবিধা পায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে : নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স বিতরণে স্বচ্ছতার অভাব, পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ব্যক্তিদের নিয়োগ ও একাধিক ব্যাংকে একই গোষ্ঠীর প্রভাব। যেমন, এস আলমের কাছে আটটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ১০টি ব্যবসায়ী গ্রুপ ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে এস আলম একাই ১৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের নামে বের করে নিয়েছে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা, যার বেশির ভাগই পাচার করা হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ একাধিক সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অলিগার্কদের প্রভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়েছে। পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে ঋণ আদায় স্থগিত রাখা হয়েছে। এতে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বেড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বড় অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ লুটপাটের কারণে কিছু ব্যাংক দেউলিয়ার পথে চলে গেছে। সাধারণ আমানতকারীদের আমানত ফেরত দিতে পারছে না। এমন পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে আবির্ভূত হয়েছে। আরো কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি খুবই নাজুক অবস্থানে চলে গেছে। বেশির ভাগ ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না।
অর্থনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব : অলিগার্ক শ্রেণীর উত্থান শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, পুরো অর্থনীতিকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ব্যাংকের মূলধন কমাসহ তারল্যসঙ্কট তৈরি হয়েছিল। বাধ্য হয়ে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে কিছু ব্যাংকের অর্থের জোগান দিয়েছে। অনেক ব্যাংকের প্রতিই আমানতকারীদের আস্থা কমে গেছে। পাশাপাশি স্বচ্ছতা না থাকায় বিদেশী বিনিয়োগ কমে যাওয়াসহ স্থানীয় উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছেন। অল্প কিছু মানুষের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ায় মধ্যবিত্ত শ্রেণী সঙ্কুচিত হয়েছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ বেড়েছে। যখন বড় ঋণখেলাপিরা শাস্তি পায় না, তখন অন্যরাও একই পথ অনুসরণ করতে উৎসাহিত হয়।
আবার যদি অলিগার্কদের উত্থান ঘটে?
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, এই শ্রেণী যদি আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে, তবে কী হতে পারে? বিশ্লেষকদের মতে, আবার অলিগার্কদের উত্থান ঘটলে ব্যাংকিং সঙ্কট তীব্রতর হবে। নতুন করে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হবে। ব্যাংকগুলো টিকে থাকার জন্য সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে। অর্থপাচার ও আর্থিক অস্থিরতার কারণে টাকার মান কমে যাবে ও পণ্যের দাম বাড়বে । বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর আবারো চাপ বেড়ে যাবে। অলিগার্কদের মাধ্যমে অর্থপাচার বাড়লে রিজার্ভ কমে যাবে ও আমদানি ব্যয় মেটানো কঠিন হবে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। দুর্বল ব্যাংকিং খাতের কারণে শিল্প খাতে ঋণ কমে যাবে ও কর্মসংস্থান কমবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে যেতে পারে। অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়লে সামাজিক অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়, যা রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে।
কিভাবে এই ঝুঁকি মোকাবেলা সম্ভব?
অলিগার্কদের প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে রক্ষা করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া জরুরি : ১. ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা : পরিচালনা পর্ষদে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ; ২. শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বৃদ্ধি ও কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা; ৩. খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা : বড় ঋণখেলাপিদের আইনের আওতায় আনা ও বিশেষ সুবিধা বন্ধ করা; ৪. অর্থপাচার রোধ : আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা; ৫. নীতিগত সংস্কার : প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি, কর ও ঋণ নীতিতে স্বচ্ছতা।
অবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অতীতে অলিগার্ক শ্রেণীর উত্থান যে ক্ষতি করেছে, তা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতিতে আবার যদি একই শক্তি ব্যাংকিং খাতে প্রভাব বিস্তার করে, তবে তা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। অতএব, এখনই সময়-সতর্ক হওয়ার, সংস্কারের এবং একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার। অন্যথায় অদৃশ্য শক্তির হাতে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে, যার মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হবে সাধারণ জনগণকেই।



