পাহাড়ি বৈশাখ : আবদুস সাত্তার সুমন

Printed Edition
পাহাড়ি বৈশাখ  :     আবদুস সাত্তার সুমন
পাহাড়ি বৈশাখ : আবদুস সাত্তার সুমন

ভোরের আলো ভেদ করে সুমনের পা যখন প্রথম পাহাড়ি পথে পড়ল, তখন দূরের সবুজ ঢেউগুলোকে মনে হচ্ছিল যেন কেউ নতুন বছরের জন্য সাজিয়ে রেখেছে। বাতাসে অদ্ভুত এক গন্ধ। বাঁশ, মাটি আর ফুলের মিশ্রণ- যা শহরে কখনো পাওয়া যায় না। সে তখন খাগড়াছড়ির এক ছোট্ট গ্রামে। বৈশাখ মাস। কিন্তু গ্রামের ভেতর যেন এখনো উৎসব চলমান।

উঠানের এক কোণে কয়েকজন মেয়ে বসে কাপড় বুনছে। সুতা যেন শুধু সুতা না রঙিন গল্প। পাশে ছেলেরা বাঁশ কেটে ঘরের সামনে গেট বানাচ্ছে। ছোট শিশুরা ফুল কুড়িয়ে হাসছে। সুমন কাছে যেতেই এক বৃদ্ধা বললেন,

বৈশাখ মানে শুধু নতুন বছর না, এটা আমাদের হৃদয়ের নতুন শুরু।

সেই কথাটা তার মনে গেঁথে গেল। পথ তাকে নিয়ে গেল রাঙ্গামাটিতে। এখানে শুরু হয়েছে বিজু। ‘ফুল বিজু’র সকালে সবাই নদীর ধারে। হাতে ফুল। কেউ কথা বলছে না, শুধু নীরবে ফুল ভাসিয়ে দিচ্ছে জলে। যেন প্রত্যেকে নিজের দুঃখগুলো পানিতে ছেড়ে দিচ্ছে।

‘মূল বিজু’তে গ্রামজুড়ে রান্নার গন্ধ। ‘পাজন’ নামের সেই বিখ্যাত খাবার অসংখ্য সবজি দিয়ে তৈরি। সুমন খেতে খেতে বুঝল, এই খাবারের স্বাদ শুধু জিহ্বায় নয়, মনে লাগে। শেষের দিকে ‘গোজ্যেপোজ্যে’ হাসি আর পানির খেলা। হঠাৎ কেউ সুমনের গায়ে পানি ছিটিয়ে দিলো। সে চমকে উঠলেও কিছুক্ষণ পর নিজেই হাসতে শুরু করল। যেন সে-ও এই উৎসবের অংশ হয়ে গেছে। এরপর সুমন গেল বান্দরবানে। এখানে সাংগ্রাই। রাস্তায় নামতেই পানির ঝাপটা। কেউ হাসছে, কেউ দৌড়াচ্ছে। কিন্তু এই খেলায়ও একটা গভীরতা আছে। একজন তরুণ বলল, এই পানি শুধু খেলা না- এটা আমাদের মনের ধুলা ধুয়ে দেয়। চলছে প্রার্থনা, বাইরে আনন্দ দুইয়ের মিশ্রণে এক অপূর্ব পরিবেশ। শেষে সুমন পৌঁছাল কক্সবাজার এবং মহেশখালীতে। সমুদ্রের ঢেউ আর মানুষের হাসি একসাথে মিশে গেছে। রাখাইনদের রঙিন পোশাক, তাদের নাচ সবকিছুতেই এক অন্য রকম সৌন্দর্য। মেলায় ঘুরে সুমন দেখল হাতের তৈরি জিনিস, মাটির গন্ধ, মানুষের উচ্ছ্বাস। এখানে উৎসব মানে শুধু আনন্দ না, নিজেদের পরিচয়কে বাঁচিয়ে রাখা। পাহাড় ছেড়ে আসার সময় সুমনের মনে হচ্ছিল এই কয়েকটা দিন যেন তাকে বদলে দিয়েছে। সে ভাবল- বৈশাখ মানে, প্রকৃতি আর সংস্কৃতির একসাথে নতুন করে বেঁচে ওঠার গল্প। আর পাহাড়িদের বৈশাখ! সেটা শুধু দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়- হৃদয়ের গভীরে।