শেফাক মাহমুদ, বুটেক্স
“বন্ধু, আজকের ক্লাসটা কোন রুমে?” বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অসংখ্য গল্পের শুরু হয় এমনই একটি সাধারণ প্রশ্ন থেকে। দেশের দুই প্রান্তের দুইটি অচেনা পরিবারের দুইটি মানুষের পরিচয়, তারপর একসাথে ক্লাস, ল্যাব, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষার চাপ, ক্যান্টিনের আড্ডা, যা ধীরে ধীরে রূপ নেয় গভীর বন্ধুত্বে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) প্রতিটি ব্যাচেরই রয়েছে এমন শত শত গল্প, যেখানে একটি ছোট প্রশ্নের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে বন্ধুত্ব। আর এই সম্পর্কগুলোর মধ্য দিয়েই তৈরি হয় এমন এক ধরনের নেটওয়ার্ক, যা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় জীবন নয়, ভবিষ্যতের পথচলাকেও করে তোলে আরো সহজ, শক্তিশালী ও সম্ভাবনাময়।
বুটেক্সের জীবন শুধু ক্লাস, ল্যাব আর পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বুটেক্সের পকেট গেট সংলগ্ন প্যারিসরোড খ্যাত রাস্তার সেই চিরচেনা আড্ডা, টং ও বিটাক মোড়ের চা, গ্রুপ স্টাডি কিংবা ক্লাবের কার্যক্রম, এসব ছোট ছোট মুহূর্তই একসময় হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি এবং গড়ে ওঠে একে-অপরের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক।
অনেকেই ‘নেটওয়ার্কিং’ শব্দটিকে জটিল বা অপ্রয়োজনীয় মনে করে, কিন্তু বাস্তবে এটি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। নেটওয়ার্কিং বলতে শুধু পরিচিত মানুষের সংখ্যা বাড়ানোকে বোঝায় না, এটি এমন সম্পর্ককে ইঙ্গিত দেয়, যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতা, শেখা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং একসাথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সহপাঠী, সিনিয়র, শিক্ষক, অ্যালামনাই কিংবা বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠনের সদস্য প্রত্যেকেই এই নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই একটি ইতিবাচক ও কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারলে অনেক পথ সহজ হয়ে যায়। ক্লাসের নোট, পরীক্ষার প্রস্তুতি, গ্রুপ স্টাডি, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, সেমিনারে অংশগ্রহণ, এমনকি ইন্টার্নশিপ ও চাকরির খবর পাওয়ার ক্ষেত্রেও একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বন্ধুত্ব ও নেটওয়ার্ক নিয়ে বুটেক্সের ৪৬তম ব্যাচের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের গ্র্যাজুয়েট তানজিম আফসানা দ্বীনা বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় আমার সবার সাথে বন্ধুত্ব শুরুই হয় ক্লাস নোট আদান প্রদানের মাধ্যমে। এরপর ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গভীর হয় একে-অপরকে পরীক্ষার আগে পড়াশোনায় সাহায্য করে। অনেক জটিল কোর্স বন্ধুরা সহজে বুঝিয়ে দিত। ল্যাবগুলোতেও একসাথে এক্সপেরিমেন্ট করা, ল্যাব রিপোর্ট লেখা ইত্যাদি নানান জায়গায় বন্ধুদের সাহায্য করেছি এবং একই সাথে সাহায্য পেয়েছি। পড়াশোনার বাহিরে একসাথে বসে আড্ডা দেয়া, ক্যান্টিনে যাওয়া, কাজ শেষে হাতিরঝিল ঘুরতে যাওয়া ইত্যাদি আজ আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সেরা স্মৃতি। একই সাথে আমি ডিবেট ক্লাবের সাথেও সংযুক্ত ছিলাম, সেখানেও কাটিয়েছি সেরা মুহূর্তগুলো।
স্নাতক শেষ হওয়ার পরও সেই বন্ধুত্বের বন্ধন অটুট রয়েছে। আমরা নিয়মিত একে-অপরের খোঁজ নিই, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করি এবং প্রয়োজনে পরামর্শ দিই। বর্তমানে কর্মজীবনে এসে আরো বেশি উপলব্ধি করেছি যে, একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক শুধু চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেই নয়, প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শেখা, দক্ষতা বাড়ানো এবং নিজেকে আরো উন্নত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বন্ধুত্ব ও নেটওয়ার্কিং নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭তম ব্যাচের ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গ্র্যাজুয়েট ও প্রাণ আরএফএল গ্রুপের ট্রেইনি মার্চেন্ডাইজার মো: সাহরিয়ার আলম পাভেল বলেন, “একজন মানুষকে জানতে হলে আগে তার বন্ধুদের সম্পর্কে জানতে হয়। কারণ একজন মানুষের চিন্তাভাবনা, অভ্যাস ও ব্যক্তিত্বের ওপর তার বন্ধুদের প্রভাব অনেক বেশি থাকে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ভালো বন্ধু নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভালো বন্ধুরা প্রয়োজনের সময় পাশে থাকে সবসময়, পড়াশোনার ম্যাটারিয়ালস দিয়ে সাহায্য করে, উৎসাহ দেয় এবং সঠিক পথে চলতে অনুপ্রাণিত করে। অন্য দিকে, খারাপ বন্ধু ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিতে পারে। অনেকে বলে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি সত্যিকারের বন্ধু পাওয়া যায় না। তবে আমি এই কথার সাথে পুরোপুরি একমত নই। আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই এমন অনেক বন্ধু পেয়েছি, যারা ক্লাসনোট ও বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক বিষয়ে আমাকে সাহায্য করেছে। তাই সঠিক মানুষকে বন্ধু হিসেবে বেছে নিতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুত্ব আজীবনের সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। টেক্সটাইল খাতে ভালো চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করতে সিনিয়রদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা খুবই প্রয়োজন। নিয়োগ, ফ্যাক্টরি, কাজের পরিবেশ বা ক্যারিয়ার নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা সিনিয়রদের থেকেই জানা যায়।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুত্ব ও করপোরেট জীবনে নেটওয়ার্কিংয়ের গুরুত্ব নিয়ে একই ব্যাচের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গ্র্যাজুয়েট এবং আরএইচ করপোরেশনের ল্যাব ট্রেইনি ওয়াসিমা তাসনিম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে বন্ধুত্ব হয়। সবার চিন্তাধারা, মতামত আর ব্যক্তিত্ব আলাদা। কিন্তু পরীক্ষার সময় নোট শেয়ার করা, একসাথে পড়াশোনা, আড্ডা দেয়া কিংবা পরীক্ষা শেষে প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা,এসব ছোট ছোট মুহূর্তই বন্ধুত্বকে আরো গভীর করে তোলে।



