রমজান এলে সন্ধ্যার আগে বদলে যায় ক্যাম্পাসের দৃশ্য। হলের করিডোরে ভিড় বাড়ে। ডাইনিংয়ের সামনে সারি। মাঠে বিছানো হয় পলিথিন বা চট। ছোট ছোট দলে বসে শিক্ষার্থীরা। ইফতার এখানে শুধু খাবার নয়, যেন এক মনোরম মিলনমেলা।
ফজলুল হক মুসলিম হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলসহ প্রায় সব ছাত্রদের আবাসিক হলেই নিয়মিত ইফতারের আয়োজন থাকে। ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি, খেজুর,জিলাপি কখনো আপেল, কমলা, হালিমসহ নানা ফল। শিক্ষার্থীদের এসব ইফতার আয়োজনে বাজেট সীমিত থাকলেও, আন্তরিকতা কম থাকে না।
অনেক শিক্ষার্থী ইফতারি হাতে নিয়ে সরাসরি রুমে চলে যায়। রুমেই চলে ছোট আয়োজন। কেউ ফল কেটে নেয়। কেউ দই মেশায় ছোলার সাথে। কেউ ঘরে বানায় শরবত। চার-পাঁচজন মিলে গোল হয়ে বসে ইফতার করে। এতে ব্যক্তিগত ভ্রাতৃত্ববোধ ও সিনিয়র-জুনিয়র এর সুন্দর সম্পর্ক মজবুত হয়।
হলের মাঠেও জমে ওঠে দৃশ্য। বড় দলে বসে ইফতার করে বিভাগভিত্তিক বা জেলা সংগঠনের শিক্ষার্থীরা। রাজশাহী জেলা ছাত্রকল্যাণ, চট্টগ্রাম জেলা সমিতি, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, বাংলা বিভাগসহ এমন নানা নামে ব্যানার ঝোলে। নিজ নিজ বিভাগীয়, জেলার উপজেলার বিভাগের উদ্যোগে ইফতার আয়োজন করে শিক্ষার্থীরা। সিনিয়ররা চাঁদা তোলেন, জুনিয়ররা তালিকা করেন। বিকেলেই মাঠে বিছানো হয় চট। সেখানে ফলাহার, বেগুনি, ছোলা মুড়িসহ নানা আয়োজনে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসব জায়গায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসিম উদ্দিন হলের শিক্ষার্থী জাহিদ বললেন, “জেলার বড় ভাইরা ডাকলে অন্যরকম লাগে। এখানে পরিবারিক আবহ থাকে। হলের বিভাগ ও জেলা-উপজেলার সিনিয়র-জুনিয়র সবার সাথে একসাথে বসার সুযোগ রমজানেই বেশি হয়। বেশ ভালোই লাগে”
মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী নজরুল ইসলাম বলেন, “হলের ইফতার মানেই আলাদা অনুভূতি। ডাইনিং থেকে ইফতার নিয়ে আমরা রুমে চলে যাই। তারপর নিজেরা ফল কাটি, শরবত বানাই। পাঁচ-ছয়জন মিলে বসে খাই। তখন মনে হয়, পরিবার থেকে দূরে থাকলেও আমরা একা না।”
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থী সবুজ বলেন, “আমাদের জেলা সমিতির পক্ষ থেকে মাঠে ইফতার করা হয়। চাঁদা তুলে আয়োজন করি, বড় ভাইরা তদারকি করেন। নতুনরা পরিচিত হয়। এই আয়োজন অনেক সুন্দর সম্পর্ক গড়ে দেয়।”
কবি সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থী রিতু জানান, “রমজানে হলে এক ধরনের শান্ত পরিবেশ থাকে। ইফতারের আগে সবাই চুপচাপ বসে দোয়া পড়ে। আজান হলেই একসাথে খেজুর খাই। মুহূর্তটা খুব আবেগের।”
মাস্টার দ্য সূর্যসেন হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, “বিভিন্ন সংগঠন ইফতার দেয়। বিশেষ করে ইনসাফের পক্ষ থেকে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো হলে ইফতারি দেয়া হয়। এতে অনেক শিক্ষার্থী উপকৃত হয়।”
ছাত্রী হলগুলোতেও একই চিত্র। রোকেয়া হল ও কবি সুফিয়া কামাল হল শামসুন্নাহার হল অন্য ছাত্রী হলগুলোতে বিভাগীয় ও জেলা সংগঠনের আলাদা আয়োজন দেখা যায়। কেউ বাড়ি থেকে আনা খাবার যোগ করে। কেউ নিজ হাতে বানানো পুডিং বা চপ নিয়ে আসে। ভাগাভাগির আনন্দে ছোট আয়োজন বড় হয়ে ওঠে।
শামসুন্নাহার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মাইমুনা আক্তার বলেন, “বিভাগীয় ইফতারগুলো আমার সবচেয়ে ভালো লাগে। সিনিয়র-জুনিয়র সবাই একসাথে বসি। কেউ বাড়ি থেকে পিঠা আনে, কেউ নিজ হাতে বানানো কিছু নিয়ে আসে। ভাগাভাগির আনন্দটাই বড়।”
ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সামাজিক ও আদর্শভিত্তিক সংগঠনও ইফতার বিতরণ করছে। বিশেষ করে ইনসাফের পক্ষ থেকে প্রতিদিনই কোনো না কোনো হলে ইফতারি দেয়া হচ্ছে বলে জানায় সংগঠনটির কর্মীরা। তারা নির্দিষ্ট হলে গিয়ে প্যাকেট বিতরণ করে। প্রতিদিনই বেশ বড় বড় লাইন দেখা যায়। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ থাকে চোখে পড়ার মতো।
ইনসাফের উদ্যোগে নেয়া এক সদস্য বলেন, “রমজানে সবাইকে নিয়ে বসাই আমাদের লক্ষ্য। রাজনীতি নয়, ভ্রাতৃত্বই মূল কথা।”
অনেক শিক্ষার্থী জানান, বাইরে থেকে পাওয়া এসব প্যাকেট ইফতার তাদের জন্য বাড়তি স্বস্তি আনে।
বিভিন্ন মসজিদ, হল মাঠ আয়োজনে ইফতারের আগে অনেক হলে সংক্ষিপ্ত দোয়া হয়। কেউ কুরআন তেলাওয়াত করে। কেউ নীরবে দোয়া পড়ে। আজান পড়তেই একসাথে খেজুর মুখে দেন সবাই। সেই মুহূর্তে নীরবতা নেমে আসে। তারপর শুরু হয় হাসি, গল্প, খাবার বিনিময়।
ইফতারের পর মাগরিবের নামাজে ভরে যায় হল মসজিদ। জায়গা না হলে করিডোরে কাতার। নামাজ শেষে আবার কেউ পড়তে বসে। কেউ হাঁটতে যায় টিএসসি চত্বরে। রমজানের রাত তাই কিছুটা দীর্ঘ, কিছুটা আলাদা।
তবে চ্যালেঞ্জও আছে। বাজারদর বাড়ায় ইফতারের খরচ বেড়েছে। চাঁদা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয় সংগঠনগুলোকে। তবু আয়োজন থামে না। কারণ এই আয়োজন সম্পর্কের। এক্ষেত্রে সিনিয়র যারা চাকরিজীবী থাকে তারা বেশ কো-অপারেটিভ। সবার চেষ্টায় সুন্দর সুন্দর কিছু মুহূর্তের সাক্ষী হয় শিক্ষার্থীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বললেন, “হলে নতুন ছিলাম। ইফতার আয়োজনেই সবার সাথে পরিচয় হয়েছে।”
আরেকজনের ভাষ্য , “রুমে বসে পাঁচজন মিলে ইফতার করা- এই স্মৃতিই একদিন সবচেয়ে বেশি মনে পড়বে।”
ক্যাম্পাসে তাই রমজানের সন্ধ্যা মানেই আলাদা রঙ। হল, মাঠ, করিডোর সবখানে ছোট ছোট আয়োজন। কোথাও বড় ব্যানার, কোথাও নিভৃত রুম, কিন্তু লক্ষ্য একটাই। একসাথে বসা একসাথে খাওয়া।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে এই ইফতার সংস্কৃতি বহু বছরের। প্রজন্ম বদলেছে, আয়োজনের ধরন বদলেছে। তবু রয়ে গেছে মিলনমেলার ঐতিহ্য, ছোট প্লেটে সাজানো খাবার আর বড় পরিসরে ভাগাভাগি। রমজানের সন্ধ্যায় এ এক অনন্য ক্যাম্পাস।


