ভারতীয় সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণের অবসান

২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের ৩০ তলায় ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের স্থায়ী অফিস ছিল

Printed Edition
ভারতীয় সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণের অবসান
ভারতীয় সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণের অবসান

বিশেষ সংবাদদাতা

  • ১৪ বছর পর নিজস্ব কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে বাংলাদেশ ব্যাংক
  • সাইবার সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ের ভেতরের গল্প

তাদের অ্যাক্সেস ছিল-

  • সার্ভার অপারেশন
  • ডাটাবেজ অ্যাডমিন পোর্ট
  • এনক্রিপটেড ফাইল সিস্টেম
  • সিস্টেম পাসওয়ার্ড-লেভেল কনফিগারেশন

বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। অথচ গত ১৪ বছর ধরে সেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমই ছিল এক বিদেশী প্রতিষ্ঠান-ভারতের টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেসের (টিসিএস) হাতে। এ সময়টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভার, ডাটাবেইস, মুদ্রানীতি-সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য এমনকি পাসওয়ার্ড-লেভেল অ্যাক্সেস পর্যন্ত বিদেশী টেকনিশিয়ানদের হাতে ছিল- যা কোনো সার্বভৌম দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য অকল্পনীয় অবস্থা।

দীর্ঘ প্রতিরোধ, অভ্যন্তরীণ বাধা, নীতিনির্ধারণী প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তিবিদদের নীরব লড়াই শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক অবশেষে নিজস্ব কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার- বিসিবিআইসিএস- এ স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। ১৮ ডিসেম্বর পুরনো ভারতীয় সফটওয়্যার বন্ধ হবে।

এই পরিবর্তন কেবল প্রযুক্তিগত নয়- এটি অনেক দিন ধরে দমন করা এক প্রাতিষ্ঠানিক মুক্তির ঘোষণা।

ভারতীয় সফটওয়্যারের হাত ধরে বিদেশী নজরদারির অভিযোগ

২০১১ সালে টিসিএস সফটওয়্যার চালু হওয়ার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ভবনের ৩০-তলায় ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের স্থায়ী অফিস ছিল। তারা অ্যাক্সেস পেত-

  • সার্ভার অপারেশন ক্স ডাটাবেইস অ্যাডমিন পোর্ট
  • এনক্রিপটেড ফাইল সিস্টেম
  • সিস্টেম পাসওয়ার্ড-লেভেল কনফিগারেশন

এই অ্যাক্সেস ‘অস্বাভাবিক’ এবং ‘নিরাপত্তাহীন’ ছিল- এমন অভিযোগ বহু বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতর থেকেও উঠেছে।

একাধিক কর্মকর্তা বলেন- ‘এটি ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যভাণ্ডারে একটি বিদেশী দেশের টেকনিক্যাল প্রবেশদ্বার। কী পরিমাণ তথ্য বের হয়েছে, কেউ তা জানে না।’

২০১৬ সালের রিজার্ভ চুরির তদন্তেও টিসিএস সিস্টেমের একাধিক নিরাপত্তা দুর্বলতার দিক উঠে আসে। তবে সফটওয়্যার পরিবর্তনের প্রশ্নে তখনকার আইসিটি বিভাগ ও নীতিনির্ধারকরা রহস্যজনক নীরবতা বজায় রাখেন।

অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট : কেন ১৪ বছর পরিবর্তন হলো না?

এই সফটওয়্যার নির্ভরতা শেষ হতে এত সময় কেন লাগল- প্রশ্নটি সবচেয়ে বড়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতর থেকেই অভিযোগ উঠেছে-

  • কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিদেশী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অস্বাভাবিক লবিং করতেন
  • প্রকল্প পরিবর্তন আটকে রাখতে সিদ্ধান্তগত বিলম্ব ও ফাইল ট্র্যাপ তৈরি করা হতো
  • লাইসেন্স নবায়ন ও বিদেশী পরামর্শকের নিয়োগে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা পেত নির্দিষ্ট মহল
  • প্রকল্পের ব্যর্থতা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত স্যাবোটাজেরও অভিযোগ রয়েছে

এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নিজস্ব কোর সিস্টেম তৈরি হবে না-এমন একটি ধারণা কিছু লোক ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।’

যে বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২০ বছরে ১০০+ সফটওয়্যার নিজস্বভাবে তৈরি করেছে, সেই প্রতিষ্ঠানকে কোর সিস্টেমে আত্মনির্ভর হতে ১৪ বছর লাগার প্রশ্ন তাই আরো সন্দেহজনক হয়ে ওঠে।

টিসিএসের আর্থিক মুনাফা : হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে

২০১১ থেকে ২০২৪- এই ১৪ বছরে সার্ভিস চার্জ; লাইসেন্স নবায়ন; পরামর্শক খরচ ও সাপোর্ট ফি- এসব মিলিয়ে টিসিএসকে এক হাজার কোটিরও বেশি টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অভিযোগ উঠেছে, ‘এই খরচের বড় অংশই ছিল অদৃশ্য লুটপাটের জানালা।’

বিদেশী সফটওয়্যার ব্যবহারের পক্ষে সক্রিয় সিন্ডিকেটের একমাত্র লাভ ছিল- বহিঃদেশে অর্থের স্রোত অব্যাহত রাখা।

নিজস্ব কোর সফটওয়্যার : শেষ পর্যন্ত কিভাবে সফল হলো?

আইসিটি-১ বিভাগের তরুণ প্রযুক্তিবিদরা বহু বছর ধরে যে প্রকল্পটি ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, সেটি গতি পায় নতুন নেতৃত্বের অধীনে।

২০২৫ সালে-

  • পরীক্ষামূলক অপারেশন শুরু
  • সমান্তরাল রান স্থিতিশীল
  • সব মডিউল পাস
  • নিরাপত্তা মূল্যায়ন সম্পন্ন

৮ ডিসেম্বরের সভায় নতুন সফটওয়্যারকে গ্রিন সিগন্যাল দেওয়া হয়।

এক কর্মকর্তা সরাসরি বলেন, ‘যারা পরিবর্তন আটকাতে চেয়েছিল, তারা এবার ব্যর্থ হয়েছে।’

নতুন সফটওয়্যার চালুর পর কী পরিবর্তন হবে?

১. ডাটা সার্বভৌমত্ব ফিরে আসবে: বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হাতে সংবেদনশীল ডাটা থাকার যুগ শেষ। এটি কেবল প্রযুক্তিগত লাভ নয়- এটি জাতীয় নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার।

২. বছরে শত কোটি টাকার অপচয় বন্ধ হবে: বিদেশী সাপোর্ট, লাইসেন্স, মেইনটেন্যান্স- সব খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ কমে যাবে।

৩. সাবোট্যাজ বা ব্যাকডোরের ঝুঁকি শূন্যের কোঠায় নামবে: নিজস্ব কোড মানে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত সাইবার স্থাপত্য।

৪. বাংলাদেশ ব্যাংক দ্রুত নীতি পরিবর্তন ও সিস্টেম কাস্টমাইজ করতে পারবে: আগে যেকোনো পরিবর্তনে ভারত থেকে অনুমতি নিতে হতো।

৫. রিয়েল টাইম সার্ভিলেন্স, এএমএল সফটওয়্যার ও ফরেন রিজার্ভ অ্যাকাউন্টিং আরো নিরাপদ হবে : এটি ২০১৬ সালের মতো সাইবার ঘটনার ঝুঁকি কমাবে।

কারা বাধা দিয়েছিল- প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত

বিদেশী সফটওয়্যারের পক্ষে কারা সক্রিয়ভাবে লবিং করেছে- এ প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। সূত্র বলছে- সাবেক দু-একজন ডেপুটি গভর্নর; আইসিটি বিভাগের কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা; বিদেশী সফটওয়্যার প্রতিনিধি এবং কিছু প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক।

এই নেটওয়ার্ক বহু বছর ধরে বিদেশী নির্ভরতাকে টিকিয়ে রেখেছিল। প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান- ‘যদি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়, টিসিএস-নির্ভরতার পেছনের শক্তিগুলো বেরিয়ে আসবে।’

সাইবার সার্বভৌমত্ব : রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোর সিস্টেম নিজস্ব হওয়ার অর্থ সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ডাটা সার্বভৌমত্ব; ভূরাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস; আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য বিদেশীর কাছে যাওয়ার পথ বন্ধ এবং নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা ও ডিজিটাল টাকার রোডম্যাপ শক্তিশালী হবে।

একজন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এটি দেশের আর্থিক স্বাধীনতার দ্বিতীয় ঘোষণা।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘স্বাধীনতা দিবস’

১৮ ডিসেম্বর পুরনো টিসিএস সফটওয়্যার বন্ধ হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য এটি হবে এক প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা দিবস। ১৪ বছর আগের ভুল সিদ্ধান্ত, অব্যবস্থাপনা, বিদেশী সফটওয়্যার লবিং ও নিরাপত্তাজনিত অবহেলার দায় এখনো অমীমাংসিত; কিন্তু বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবশেষে নিজস্ব সক্ষমতায় দাঁড়াচ্ছে- এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ‘আমরা আর কাউকে আমাদের ডাটা ভল্টের চাবি দেবো না।’