গাজায় ত্রাণ সংস্থার ওপর ইসরাইলের নিষেধাজ্ঞায় মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • ব্রিটিশ মিডিয়ার দৃষ্টি ঘরোয়া বিতর্কে আড়ালে গাজার মানবিক বিপর্যয়

  • সাহায্য সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞায় ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠনের নিন্দা

গাজায় কার্যরত আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর ওপর ইসরাইলের নতুন নিষেধাজ্ঞা ভয়াবহ মানবিক সঙ্কট তৈরি করবে এবং ফিলিস্তিনিদের জীবনকে তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে ফেলবে বলে সতর্ক করেছেন কূটনীতিক, জাতিসঙ্ঘ কর্মকর্তা ও মানবিক সহায়তা বিশেষজ্ঞরা।

দ্য গার্ডিয়ানের মতামত কলামে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় যখন খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের সঙ্কট চরমে, তখন এই সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরো ভয়ঙ্কর করে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইসরাইলের ডায়াসপোরা বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজায় সক্রিয় ৩৭টি আন্তর্জাতিক এনজিওকে ৬০ দিনের মধ্যে কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে, যদি না তারা নতুন কঠোর নিবন্ধন শর্ত পূরণ করে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মীদের বিস্তারিত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের দাবি, হামাস যেন ত্রাণ কার্যক্রম অপব্যবহার করতে না পারে, সে জন্যই এই পদক্ষেপ। তবে ত্রাণ সংস্থাগুলোর বক্তব্য, এসব শর্ত নিরাপত্তা ও আইনি ঝুঁকি তৈরি করে এবং বাস্তবে তা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সিসের নির্বাহী পরিচালক অ্যাথেনা রেবার্ন বলেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞা মানবিক সেবার ভয়াবহ ধস নামাবে। এর পরিণতি সম্পর্কে ইসরাইলকে আগেই জানানো হয়েছে।’

জাতিসঙ্ঘের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত ত্রাণ কার্যক্রমকে কার্যত পঙ্গু করে দেবে। কারণ নিষিদ্ধ অনেক এনজিও সরাসরি সহায়তা না দিলেও জাতিসঙ্ঘের হয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, অপুষ্টি শনাক্তকরণ, আশ্রয় ও স্যানিটেশন সেবা পরিচালনা করে। এর আগে উনরওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাও গাজায় সহায়তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। এ দিকে সাম্প্রতিক ঝড়ে গাজায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ আশ্রয়হীন হয়েছে। বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কট, খাদ্যের উচ্চমূল্য ও শীতকালীন দুর্ভোগ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক ইসরাইলের সিদ্ধান্তকে ‘আপত্তিকর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও জানিয়েছে, বর্তমান কাঠামোয় এই আইন কার্যকর করা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে গাজায় মানবিক বিপর্যয় আরো গভীর হবে, যার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সাধারণ ফিলিস্তিনি জনগণকে।

ব্রিটিশ মিডিয়ার দৃষ্টি ঘরোয়া বিতর্কে, আড়ালে গাজার মানবিক বিপর্যয়

নতুন বছর শুরুর সাথে সাথে ব্রিটেনের গণমাধ্যমের দৃষ্টি ঘুরে গেছে ঘরোয়া রাজনৈতিক নাটকের দিকে। ব্রিটিশ-মিসরীয় মানবাধিকার কর্মী আলা আবদুল ফাত্তাহকে ঘিরে এক বিতর্ক এখন শিরোনামে। অভিযোগ উঠেছে, তার পুরনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট সম্পর্কে না জেনেই তাকে ব্রিটেনে বসবাসের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে জরুরি পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি ঘিরে চলছে প্রশাসনিক ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক দায় চাপানো এবং সংবাদমাধ্যমের তৎপরতা। কিন্তু বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তাকালে এই বিতর্ককে অনেকেই দেখছেন দৃষ্টি ঘোরানোর কৌশল হিসেবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি এমন এক সংবাদ যা জনমতকে ব্যস্ত রাখছে, অথচ একই সময়ে আরো বড় মানবিক সঙ্কট প্রায় উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।

মিডল ইস্ট মনিটরের মতামত কলামে বলা হয়েছে, এই সঙ্কটটি তৈরি হয়েছে গাজা ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে। সেখানে ইসরাইল ৩৭টি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার কার্যক্রম নিষিদ্ধ বা স্থগিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে। তারা অবাধ মানবিক সহায়তার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে ব্রিটেনের মূলধারার গণমাধ্যমে এই খবর তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পাচ্ছে। গাজার বাস্তবতা ভয়াবহ। বোমাবর্ষণ ও অবরোধ টিকে যাওয়া শিশুরা এখন শ্বাসকষ্ট, অপুষ্টি ও সংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। বহু পরিবার শীতের মধ্যে অনিরাপদ তাঁবুতে দিন কাটাচ্ছে। খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, একটি পুরনো টুইট ঘিরে প্রশাসনিক বিতর্ক কি সত্যিই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ? নাকি এটি এমন এক বিষয়, যা সচেতন বা অচেতনভাবে গাজার মানবিক বিপর্যয় থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছে?

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা গণমাধ্যমে এটি নতুন নয়। ঘরোয়া ও সহজ রাজনৈতিক গল্প প্রাধান্য পায়, আর দূরের মানবিক সঙ্কট আড়ালে পড়ে যায়; কিন্তু গাজায় যা ঘটছে, তা কোনো দূরের কাহিনী নয়। এটি ক্ষমতার জবাবদিহি না থাকার এবং মানবিক বিপর্যয়কে স্বাভাবিক করে তোলার এক বাস্তব উদাহরণ।

সংবাদমাধ্যম যদি সত্যিই জনগণকে তথ্য দিতে ও বাস্তবতা তুলে ধরতে চায়, তবে তাদের দৃষ্টি ফেরাতে হবে গাজার দিকে। ধ্বংসপ্রাপ্ত হাসপাতাল, বন্ধ হয়ে যাওয়া ত্রাণ কার্যক্রম, পানিতে ডুবে থাকা আশ্রয়কেন্দ্র এবং যুদ্ধ-ক্ষুধা-ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারগুলোর গল্পই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর।

সাহায্য সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞায় ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠনের নিন্দা

ইসরাইলি সরকার গাজা উপত্যকা ও দখলকৃত পশ্চিমতীরে কাজ করা ৩৭টি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার ১৯টি ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠন একযোগে নিন্দা জানিয়েছে বলে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি।

সরকার মঙ্গলবার থেকে এসব সংস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে শুরু করেছে যে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে এবং মার্চের মধ্যে কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। আদালাহ ও বিটসেলেমসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, ‘গাজার জনগণের ওপর ইসরাইলের হামলার পাশাপাশি মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে, যা ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলছে।’ তারা আরো জানায়, ‘খাদ্য, ওষুধ, আশ্রয় ও স্বাস্থ্যসামগ্রীর মতো জরুরি সহায়তা বিলম্বিত বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।’ সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, গাজা ও পশ্চিমতীরে সাহায্য সংস্থার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা নীতিগত মানবিক উদ্যোগকে দুর্বল করে, কর্মীদের ও স্থানীয় জনগণের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে এবং কার্যকর সহায়তা বিতরণে বাধা সৃষ্টি করে।

তারা ইসরাইল সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে, ‘নিবন্ধন বাতিলের প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করতে, মানবিক ও মানবাধিকার কার্যক্রমে বাধা দূর করতে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে নিরাপদ ও কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে।’ এর আগেও ইসরাইল ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসঙ্ঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিøউএ’র বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৪ সালে ইসরাইলি সংসদ (কনেসেট) একটি আইন পাস করে সংস্থাটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। তারা অভিযোগ করে, ইউএনআরডব্লিউএ’র কিছু কর্মী ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন। যদিও সংস্থাটি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, ইউএনআরডব্লিউএ কঠোর নিরপেক্ষতা নীতিমালায় পরিচালিত হয়। পরে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ সংস্থাটির বিরুদ্ধে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেয় এবং একটি আইন পাস করে ইউএনআরডব্লিউএ’র স্থাপনাগুলোতে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজায় ইসরাইলি হামলা, শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন

ইসরাইলি সেনারা অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে গাজা উপত্যকায় বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ চালিয়েছে। একই সময়ে ভয়াবহ শীতের কারণে গাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবন আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম নিউ আরব।

উত্তর গাজা, বুরেইজ শরণার্থী ক্যাম্প এবং দক্ষিণে খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চল ইসরাইলি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। গাজা সিটির পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে জেইতুন ও শুজাইয়া এলাকায়ও গোলাবর্ষণ হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। ইসরাইলি সেনারা প্রায় প্রতিদিনই গাজায় হামলা চালাচ্ছে। এতে বহু ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছেন। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর থেকে অন্তত ৯৬৯ বার লঙ্ঘন হয়েছে এবং ৪১৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ দিকে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় গাজার মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। অধিকাংশ মানুষ অপ্রতুল আশ্রয়ে বসবাস করছে, যেখানে নেই গরম রাখার ব্যবস্থা বা বিদ্যুৎ। গতকাল শুক্রবার ফিলিস্তিনি আবহাওয়া অধিদফতর সতর্ক করে জানিয়েছে, পুরো ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ঠাণ্ডা ও অস্থির আবহাওয়া বিরাজ করবে। কিছু এলাকায় বন্যার ঝুঁকিও রয়েছে। রাতভর তীব্র ঠাণ্ডা ও ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় মানুষ ঠাণ্ডায় কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। বৃষ্টিতে তাদের তাঁবু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শীতে জমে কয়েকজন ফিলিস্তিনি মারা গেছেন, যাদের মধ্যে শিশুদেরও মৃত্যু হয়েছে।