ঈদ (কোরবানির ঈদকে) শহীদি বলা যায় কি না। এই প্রশ্নটি একশ’ বছর আগে নিশ্চয় উঠেছিল। নজরুলের শহীদি-ঈদ প্রকাশের পর কলকাতার বিদ্বৎসমাজের মনে, সংখ্যাগুরু হিন্দু বুদ্ধিজীবীর মনে-প্রাণে এবং সংখ্যালঘু মুসলিম বুদ্ধিজীবী মহলে ভয়-কিংবা তরঙ্গ সৃষ্টি করেছিল কী ওই শব্দ বন্ধ? আমার ধারণা অবশ্যই তরঙ্গ উঠেছিল।
সাধারণভাবে এটাই আমরা ধরে নিই যে কোরবানির যে ধর্মীয় মর্ম-চেতনা এবং তার সামাজিক ব্যস ও রূপ একরকম আর এর সাংস্কৃতিক পরিচর্যা ভিন্নরকম। কারণ সংস্কৃতি চর্চার বহিরাবরণে যা আমরা দেখতে পাই, তার অন্তর্গত ধারায় থাকে ভিন্ন কিছু বিষয়, যা সহজে চোখে দেখা যায় না। বহিরাবরণে দেখতে পাই গরু, ছাগল, মহিষ ভেড়া, দুম্বা, উট ইত্যাদি জবেহ করা বা কোরবানির আত্মত্যাগী প্রতীকী দৃশ্য। আর অন্তরপ্রবাহে থাকে আত্মউপলব্ধি, যে দৈনন্দিন জীবনের ঘেরে বন্দী আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন, তার ভেতরে অপরাধ ও তার প্রবণতা ধারালো ছুরির মতো চকচকে অবস্থায় থাকে। এ-জন্য আত্মশুদ্ধির প্রশ্নটি উঠে আসে। কোরবানির উপলব্ধি তাই আত্মউৎসর্গের একটি প্রতীকী ব্যবস্থা। নিজেকে চিন্তাগতভাবে পরিশুদ্ধ করার পথ। এ ছাড়াও আছে বহুবিধ বিষয় জড়িয়ে আছে কোরবানির সঙ্গে। নিজেদের খাদ্যের প্রোটিনের জোগান এবং প্রোটিনের চাহিদা মেটানোরও সামাজিক, সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা। আর আছে পশু চামড়ার বাণিজ্যিক আয়োজন। ব্যবহারিক জীবনাচারে পশুর চামড়া বাণিজ্যের অর্থনীতির চাকা চালু রাখতে হলে ওই গৃহপালিত পশু যে কতটা উপকারী তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
গো-মেধযজ্ঞের কথা আমরা জানি। গো-হত্যা তাই একসময় বন্ধ করেছিলেন হিন্দু ধর্মের নেতারা। কৃষিজীবী সমাজে হলো বা হাল চালনার প্রাণশক্তি গরুর অভাব থেকে বাঁচবার জন্য এই বিধান চালু হয়েছিল বলে আমি মনে করি। আজো তা অব্যাহত। ভারতে মুসলিমরা কোরবানি দিলে তাই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনেকে রোষে ফেটে পড়ে। গো-হত্যা পাপ এই বিধান থেকেই ওই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রবাহের সূচনা।
আবার পাপের কথা চিন্তা করে গো হত্যা বন্ধ রাখলে এক-দুই বছরেই গোটা ভারতে গরু পালনের জায়গা ভরে উপচে পড়ত- এ তে কোনো ভুল নেই। একে কেউ অযৌক্তিক মনে করবে না। আজ থেকে পেছনের দিকে তাকালে আমরা দেখব ভারত থেকে চোরাই পথে গরু আনাকে কেন্দ্র করে জীবন দিতে হয়েছে বাংলাদেশী গরুকারবারিকে। ভারত সরকারও ঘোষণা করে যে তারা আর গরু রফতানি করবে না বাংলাদেশে। সেই থেকে আত্মউন্নয়নের প্রকল্প নেয় এ দেশের মানুষ। গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতে, হাল-চাষের জন্য গরুর লালন-পালন আবহমানকালের, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ফার্মিং উদ্যোগ-আয়োজন। কেবল কোরবানির ঈদকেন্দ্রিক গরু মোটাতাজা করার প্রকল্প নয়, বিভিন্ন জাতের গরুর ফার্ম তৈরি করে দেশের মানুষের প্রোটিন ঘাটতি মেটাতেও তারা এগিয়ে এসেছে।
২.
শহীদের ঈদ এসেছে আজ
শিরোপরি খুন-লোহিত তাজ,
আল্লার রাহে চাহে সে ভিখ :
জিয়ারার চেয়ে পিয়ারা যে
আল্লার রাহে তাহারে দে,
চাহি না ফাঁকির মণি-মানিক।
(শহীদি ঈদ/ভাঙার গান/ রচনাবলি-১ম খণ্ড)
মোট ১৬টি স্তবকে এই কবিতা দাঁড়িয়ে আছে। এই স্তবকের প্রতিটি পঙক্তির মানে আমরা বুঝি। কিন্তু সব শব্দের অর্থ কী জানি? হয়তো জানি, কিংবা জানি না। তবে অনুমান করতে পারি।
প্রথম স্তবকের মধ্যেই নিহিত আছে গোটা কবিতার মর্ম ও বাণী।
যে ব্যক্তি নিজেকে আত্মোৎসর্গ করতে চাইছে, তার ঈদ এসেছে আজ। তার মাথার ওপরে রক্তলাল তাজ। সেই তাজ বা মুকুট আল্লার পথে ভিক্ষা মাগছে, যা জীবনের চেয়ে প্রিয়,আল্লার পথে তাকে চাইছে। চাইছে না ফাঁকির মণি-মানিক।
মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষের প্রতি নজরুলের যে সমালোচনা ও ক্ষোভ তা এই কবিতায়ই কেবল প্রকাশ পায়নি, তার অন্যান্য কবিতাও যখন প্রসঙ্গ এসেছে তিনি নির্মাণ করেছেন সেই চেতনার মূল আধার, যেখানে কেবল কল্যাণকেই আবাহন ও বর্ণনা করা হয়েছে।
ওরে ফাঁকিবাজ ফেরেব-বাজ
আপনারে আর দিসনে লাজ,...
গরু ঘুষ দিয়ে চাস সওয়াব?
যদিই রে তুই গরুর সাথ
পার হয়ে যাস পুলসেরাত,
কি দিবি মোহাম্মদে জওয়াব?
এর কি জবাব আছে যারা ভন্ডামি ভরা কোরবানিতে মেতে আছে? দ্বিতীয় স্তবকেই আছে সেই চমকে উঠার মতো কাব্য-বাণী...
চাহিনা ক’গাভী দুম্বা উট
কতটুকু দান, ও দান ঝুট!
চাই কোরবানি, চাই না দান
রাখিতে ইজ্জত ইসলামের
শির চাই তোর, তোর ছেলের,
দেবে কি? কে আছ মুসলমান
কোরবানির যে ত্যাগ তা যে চলমান মুসলিম সমাজে নেই নজরুল ইসলাম সেই সত্যই তুলে ধরেছেন। হজরত ইবরাহিম আলাইহিসসালাম তার পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি দিতে উদ্যত হয়েছিলেন মহান আল্রাহর নির্দেশে... সেই বিশ্বাস আর মর্যাদায় এখনকার কোরবানির কোনো তুলনাই হয় না। তারই রূপায়ন দেখি আমরা এই কবিতায়।
শাদা চোখে দেখলে মনে হবে নজরুল কেবল মুসলিম জনগোষ্ঠরি ভুলত্রুটি নিয়ে শহীদি ঈদ লিখেছেন, তার ওই চেতনার সঙ্গে ছিল ঔপনিবেশিক রাজশক্তির বিরুদ্ধে দেশ-মুক্তিরও নিশান। ঔপনিবেশিক শাসকের বিরুদ্ধেও যে তিনি সোচ্চার ছিলেন সেটাও আমরা এই কবিতার ভেতরে লক্ষ্য করেছি।
৭ নম্বর স্তবকে আছে
‘ ইসলামে যারা করে জবেহ,/ তুমি তাহাদেরি হও তাবে।/তুমি জুতা-বওয়া তারি অধীন।’
৯ নম্বর স্তবকে আছে...
খেয়ে খেয়ে গোশত রুটি তো খুব/হয়েছ খোদার খাসি বেকুব,/ নিজেদের দাও কোরবানি/ বেঁচে যাবে তুমি, বাঁচিবে দ্বীন,/ দাস ইসলাম হবে স্বাধীন, গাহিছে কামাল এই গানই’
১৪ নম্বর স্তবকে তিনি লিখেছেন...
যত দিন তোরা নিজেরা মেষ,/ভীরু দুর্বল অধীন দেশ,/আল্লার রাহে ততটা দিন/ দিও নাকো পশু কোরবানি/ বিফল হবে রে সবখানি!/ (তুই) পশু চেয়ে যে রে অধম হীন।’
১৫ নম্বর স্তবকে লিখেছেন নজরুল...
‘ মনের পশুরে কর জবাই,/ পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই।/ কশাই-এর আবার কোরবানি!.../ আমাদের নয়, তাদের ঈদ, বীর-সুত যারা হল শহীদ,/অমর যাদের বীর-বাণী।
শেষ স্তবক ১৬ নম্বরে তিনি তার আসল বাণী পুরেছেন এভাবে...
পশু কোরবানি দিস তখন
আজাদ-মুক্ত হবি যখন
জুলুম-মুক্ত হবে রে দীন।
কোরবানির এই যে খুন
শিখা হয়ে যেন জ্বালে আগুন,
জালিমের যেন রাখে না চিন্।।
আমিন রাব্বিল্ আলামিন!
আমিন রাব্বিল্ আলামিন।।
কোরবানির ঈদ-এর রূপ তিনি কোথায় নিয়ে গেলেন? ত্যাগের মহিমায়, উজ্জীবনের রূপে আর আত্মত্যাগের সৌরভে ঢেলে দিলেন দেশের স্বাধীনতার বাণী। পরাধীন দেশে কোনো কোরবানি নয়, কোনো গোশত-রুটি খাওয়া নয়, আত্মোৎসর্গই করতে হবে মুসলিমকে।
এই কবিতার মর্মবাণী আমরা বুঝেছি। কি করতে হবে তাও জেনেছি আমরা। কিন্তু এই বোঝা ও জানার মাঝে ঢুকে আছে মর্মচেতনার নির্দেশ যত দিন ‘বীর-সুত যারা হলো শহীদ/অমর যাদের বীর-বাণী... ‘পশু কোরবাণী দিস তখন/আজাদ মুক্ত হবি যখন জুলুম-মুক্ত হবে রে দ্বীন...। অর্থাৎ দখলদার ঔপনিবেশিক শাসকরা যেদিন এ দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হবে আজাদ-মুক্ত হবার পর তোমার/তোর কোরবানি বৈধ হবে। জালিমের চিহ্ন যেদিন মুছে ফেলতে পারবো সেই দিনই জুলুম-মুক্ত হবে দ্বীন।
কবিতার এই ন্যারেটিভস আমাদের অন্তর স্পর্শ করে। তবে এই বয়ানের ডিপ স্ট্রাকচারে নজরুল বলেছেন তার আসল বয়ান। আর তাহলো, আমরা আসলে ইসলামের মর্মবাণী ধারণ করে মুসলমান হতে পারিনি আজো। যেদিন পরাধীনতার শাসক-সূর্য়ের দমন সম্ভব হবে, সেই দিনই হবে আমাদের আনন্দের এই ঈদ। এ কারণেই তিনি আত্মবলিদানের কথা বলেছেন। ওই আত্মবলিদান প্রতীকী ভাষ্য, আসলে লড়াই করতে বলেছেন ইংরেজের বিরুদ্ধে। ইংরেজ দখলদান শোষকদের বিতারণই এই কবিতার মূল উদ্দেশ্য। পরাধীনতার কারণ এখানেই লুকিয়ে আছে। আমাদের মর্মবেদনা যতদিন পর্যন্ত দ্রোহের সারিতে না আসবে ততদিন পর্যন্ত দেশ মুক্ত করা যাবে না। ইসলামের দমন ও অবদমন বন্ধ হবে না। এ কারণেই নজরুলের কাছে এটা শহীদি ঈদ।
এবার দেখা যাক এর সাংস্কৃতিক বীক্ষা ও তার রূপ-সজ্জার প্রকল্প প্রকরণ। কবিতার প্রকরণ কলা হচ্ছে সেই বাণী বৈভবের সংরাগ, যা তার ডিপ স্ট্রাকচারের ব্যঞ্জনার পরতে পরতে থাকে। আর সেই কলা সম্পর্কে ভালো ব্যাখ্যা দিতে পারেন নন্দনতাত্ত্বিকরা। কী কথা বলেন তারা এবার চেখে দেখা যাক।
৩.
ভারতীয় নন্দনতাত্ত্বিকগণের মধ্যে সুন্দরের বিষয়ে নানা মতভেদ আছে। দৃষ্টিভঙ্গিগত কারণে তারা একে অন্যের ব্যাখ্যা মেনে নেন না। তারা নিজেদের নতুন ন্যারেটিভস দাঁড় করান। তরুণ মুখোপাধ্যায় তার সম্পাদিত গ্রন্থ ‘নন্দনতত্ত্ব-জিঞ্জাসা’র ভূমিকায় তিনি লিখেছেন... ‘ভারতীয় কাব্যতত্ত্বে সুন্দরের সঙ্গে সত্য ও মঙ্গল এবং রসের যোগ ঘটেছে।’
তার এই কথাকে কি মেনে নেয়া যায়? সুন্দরের কোনো বাস্তব চেহারা নেই। তার কাঠামোগত কোনো রূপ থাকলে তার সৌন্দর্য বিষয়ে একটি ধারণা নেয়া যেতে পারে। কিন্তু সুন্দরের তো আকরণগত কোনো রূপ নেই। ফলে রূপকেন্দ্রিক কোনো বস্তুর সুন্দর ভালো কি মন্দ বিবেচনা করা যেত। আবার সুন্দরের সঙ্গে সত্য ও মঙ্গলের যে যোগের কথা বলেছেন, তারও কোনো অ্যাবসুলিট রূপ বা আকার নেই। সত্য ও মঙ্গল বলে যে আইডিয়ার কথা বলছেন তিনি অধিকাংশ ভারতীয় নন্দনতাত্ত্বিকের বয়ানের সূত্রে, তাকে কি করে মেনে নেবো আমরা। এই জামানাটি হচ্ছে আকরণগত কাজ চোখে যা দেখছেন, তা সুন্দর লাগছে কি , লাগছে না, সেই বিবেচনা তো ব্যক্তির চেতনাগত শিক্ষার ফল। ভালো লাগা মন্দ লাগা তো ব্যক্তিগত অভিরুচিজাত। সত্য বলে যে ধারণা তিনি মনে লালন করেন, সেখানে মঙ্গল-অমঙ্গলের কোনো স্পর্শ নেই। মানুষ, প্রাণবীজ,... একে সত্য বলব, কিন্তু জীবনের কোনো রূপ নেই। সে একটি বহমান ধারণা। তার কোনো নিজস্ব আকার নেই। কিন্তু জীবন বলে যা বিশ্বাস করি, তা আমাদের নিজস্ব চিন্তাজাত। প্রত্যেক মানুষের আলাদা আলাদা জীবন-সত্য আছে। তা অ্যাবসুলিট নয়। ভিন্নতাই সুন্দরের সঙ্গে খাপখায়। মঙ্গল চিন্তা এসেছে সামাজিক চিন্তার পথ ধরে। সমাজ সংগঠনের সময় নির্মাতারা ভেবেছেন, এই জিনিসটা তাদের সমষ্টির কাজে, কল্যাণে লাগবে, সেই ধারণাজাত। গ্রামীণ জীবনে একটি ঘরের বেড়া দেয়া ও ডোয়া দেয়ার পেছনে যে যুক্তি রয়েছে, তা সুন্দরের সঙ্গে নাও যেতে পারে। কিন্তু তার রূপ দেখে কারো মনে আনন্দ জাগতে পারে। আর সেই আনন্দ কল্যাণের মর্ম থেকে নয় এসেছে ব্যক্তির উপলব্ধির ভেতর থেকে, প্রয়োজনের নিরিখ থেকে।
লিও টলস্টয়ের একটি ধারণা এখানে উল্লেখ করি, তাহলে নজরুলের চেতনার একটি স্পর্শ আমরা সহজেই ধরতে পারবো। তিনি ভেবেছিলেন... মানুষ জীবন ও শিল্প অভিন্ন। টলস্টয়ের এই কথা তুলে এনেছেন অজয়কুমার ঘোষ, তার লিও টলস্টয় প্রবন্ধে। তিনি টলস্টয়ের অন আর্ট এবং হোয়াট ইজ আর্ট দু’টি বই থেকেই সংগ্রহ করেছেন এই কথাগুলো, যা জীবনবাদি সাহিত্যের জন্য খুবই দরকারি। এ কারণেই নজরুলের চিন্তা টলস্টয়ের চিন্তাভাবনাকেই ধারণ ও অনুধাবন করে বলে আমার মনে হয়ছে।
মানুষ না থাকলে জীবন শব্দটির কোনো মানে থাকে না। মানুষের সঙ্গে জীবন ওতপ্রোত, অঙ্গাঙ্গী। এই যে অঙ্গের সঙ্গে অঙ্গ মেলালাম তা কি সঠিক হলো? মানুষ বাস্তবসত্য কিন্তু জীবনের কোনো বাস্তব আকার বা আকরণ নেই, তার আছে কেবল শ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই অদৃশ্যপ্রায় চৈতনিক সত্য-রূপ। শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ আছে কিন্তু জীবনের কোনো সে-রকম কোনো কাজ নেই। সে জড়িয়ে আছে ধারণার সঙ্গে, প্রাণময়তার সঙ্গে।
আমি টলস্টয়ের ধারণার সঙ্গে নজরুলে ধারণার মিল দেখতে পাই। নজরুল পুরোপুরিই জীবনবাদি কবি বা সাহিত্যিক। সে কারণেই তিনি জীবনের সত্যে আর সামাজিক সত্যের সঙ্গে তাঁর প্রত্যাশাজাত আকাক্সক্ষার বর্ণনা আমরা পাচ্ছি শহীদি ঈদ নামের কবিতায়। বস্তুগত বাস্তব আর চিন্তাগত সত্য কে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করতে কিভাবে কি করতে হবে, সেই কথাই তিনি এ-কবিতায় লিখেছেন। সেই সঙ্গে সমাজের ভন্ডামিকেও গেঁথে দিয়েছেন তিরস্কার ও শ্লেষের বাণে। সেই বাণ আমাদের চিন্তাকে বিঁধতে পারলেও মননকে শাসন করতে পারেনি।
এবার রসের পালা। রস কী?
এই প্রশ্নের উপাত্ত খুঁজতে গিয়ে পেলাম রসের প্রাথমিক কথা। সাহিত্যের পথে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন... ‘উচ্চ অঙ্গের গণিতের মধ্যে যে একটি গভীর সৌষম্য, একটি ঐক্যরূপ আছে, নিঃসন্দেহে গাণিতিক তার মধ্যে আপনাকে নিমগ্ন করে। তার সামঞ্জস্যের তথ্যটি শুধু জ্ঞানের নয়, তা নিবিড় অনুভূতির, তাতে বিশুদ্ধ আনন্দ।’
এই যে জ্ঞান ও আনন্দের অনুভূতির জগৎ তাই উৎপাদন করে রসের। সত্য ও বাস্তব এক জিনিস নয়। বাস্তব এমন হতে পারে, যেখানে দুঃখ ও বেদনার জন্ম দিতে পারে। বাল্মিকির কথা যদি টেনে আনি, তাহলে হংস মিথুনের হত্যাজনিত বেদনাকেই তিনি নির্মাণ করেছিলেন তার স্বগত উচ্চারণের বাণীতে।
‘সাধক, ঋষি, মহাত্মা, ধর্মগুরু প্রভৃতি মহামানবেরা আবার তাদের মঙ্গল সাধনার সোপানে সোপানে আরোহণ করে এমন এক অবস্থাপ্রাপ্ত হন, যেখানে তাদের মঙ্গলসাধনা সত্য ও সুন্দরের সগোত্র। বুদ্ধদেব, শ্রীচৈতন্য, যিশুখ্রিষ্ট, হজরত মোহম্মদ সবাই এ কথার দৃষ্টান্ত বিশেষ। আবার কোনো বীরপুরুষ যখন আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বার্থ ত্যাগ করেন, প্রাণ দান করেন, তখন তার মঙ্গলাদর্শ বা কল্যাণাদর্শ আমাদের প্রাণের চেয়েও মহত্তর। যথার্থ মঙ্গলাদর্শের সঙ্গে পরম সত্য ও পরম সুন্দরের গভীর সামঞ্জস্য বর্তমান। সেই অর্থে সত্য মঙ্গল ও সুন্দর ব্যাহ্যত পৃথক তিনটি ধারা হয়েও গভীরে এক।’ ( সিতাংশু রায় : সৌন্দর্য দর্শন : প্রাথমিক পরিচয়),পৃ. ৩২)
আমার ধারণা রস সংগঠনে এই তিনের একটি অলৌকিক সমন্বয় সৃষ্টি হয় বা সাধিত হয়। আমরা সেই রূপই কবিতায় দেখতে পাই। মঙ্গল চিন্তার আধারই শহীদি ঈদ-এ পাওয়া যায়। পঙক্তি উদ্ধার করলেই তার রূপ আমরা দেখতে পাবো।
চাহিনা ক’গাভী দুম্বা উট / কতটুকু দান, ও দান ঝুট! / চাই কোরবানি, চাই না দান / রাখিতে ইজ্জত ইসলামের / শির চাই তোর, তোর ছেলের, / দেবে কি? কে আছ মুসলমান?
ইসলাসের সাংস্কৃতিক বীক্ষা একটি পঙক্তিতে উঠে এসেছে। কোরবানি করার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার যে বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত, সেই বিশ্বাসের অনুরাগেই তো পশু জবেহ দেবার রীতি চালু হয়েছে। এই পশু কোরবানির ভেতর দিয়ে কি রকম উপকার অর্জিত হবে তার খানিকটা বর্ণনা করেছি ওপরে। এখানে পুনরায় উল্লেখ প্রয়োজন নেই। সামাজিক দায় মিটে গেলেও অর্থনৈতিক চাপ কমানো সম্ভব হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে যে কল্যাণ ইসলামের মূল লক্ষ্য, তা কিন্তু এই সত্যের সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে আছে আরো গভীরভাবে। এখানেই সুন্দরের সঙ্গে কল্যাণের পথ খোলা হয়েছে। এসথেটিকসের নমুনা থেকে আমরা এটা বুঝি। সৌন্দর্যবিজ্ঞানের (ঝঈওঊঘঈঊ ঙঋ ইঊঅটঞণ) বা সৌন্দর্যদর্শনের (চঐওখঙঝঙচঐণ ঙঋ ইঊঅটঞণ) জগৎ বস্তুত রূপজগতের (ঙইঔঊঈঞওঠঊ) ও আত্মজগতের (ঝটইঔঊঈঞওঠঊ) সমন্বয়েই গঠিত। কোনটি ছোট, কোনটি বড়ো, এ তর্ক হয়তো অবান্তর। উভয়েই উভয়ের পরিপূরক। (সিতাংশু রায়/ ৬/১৩৯৪)
বোঝাই যাচ্ছে সৌন্দর্যবিজ্ঞান আর দর্শনের মধ্যে রয়েছে সমন্বয়ধর্ম, যা কবিকে নতুন দ্যুতি ছড়াতে সাহায্য করে। বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার মিশেলে যে উপলব্ধি তাকে তো আর এড়ানো যায় না। ‘যত দিন তোরা নিজেরা মেষ/ ভীরু দুর্বল অধীন দেশ’... বলার পর যে শ্লেষ জন্মায় তাকে কি অবাস্তব বলা যাবে। বলা যাবে না। আবার এটাও মনে রাখতে হবে যে দেশটা পরাধীন। সেই পরাধীনতা ছিন্ন হবে যেদিন, মুক্ত হবে বিদেশীদের শাসন থেকে, তখনই তোর কোরবানি আল্লাহর রাহে কবুল হবে। এখানে রাহে মানে কাছে কোরবানি গৃহীত হবে। বস্তুবাস্তবের সঙ্গে কল্পবাস্তবের এই মিশেলই ইসলামী মূল্যবোধ ও দর্শনের মৌলিকত্ব। নজরুল তা বিশ্বাস করতেন। আমরা এই নিজেদের যদি দেশমাতৃকা স্বাধীনের জন্য নিজেদের কোরবানি বা আত্মত্যাগ করতে না পারি, তাহলে জগদ্দল ব্রিটিশের দখলদারি থেকে আমরা মুক্ত হতে পারব না। শহীদি ঈদের মূল বক্তব্য এখানেই নিহিত।
চিত্র ও চিত্রকল্পের মধ্যে পার্থক্য আছে মিহি সুতার মতো। চিত্র হচ্ছে ছবি আর তার সঙ্গে কল্পনা যোগ করলেই তার রূপ পাল্টে যায়। যেমন এ-কটি পঙক্তি...
জান নাকো তুমি, রে বেঈমান! / আল্লা সর্ব শক্তিমান /
দেখিছেন তোর সব কিছু ? / জাব্বা-জোব্বা দিয়ে ধোঁকা / দিবি আল্লারে, ওরে বোকা / কেয়ামতে হবে মাথা নিচু!
খুবই সহজ উচ্চারণ। কিন্তু তা ইসলামি ধর্ম ঐতিহ্য আর বিশ্বাসের নিখিল নিয়ে গঠিত। আল্লার যে ক্ষমতা তাতে আমরা বিশ্বাস করি। কিন্তু তাকে কখনেই চাক্ষুষ করিনি আমরা। এই বিশ্বাসের তরিকা থেকেই জান্নাত ও কেয়ামত, শেষ বিচারের দিন ইত্যাদি অলৌকিক উৎস চিরস্থায়ী আমাদের বোধ ও বিশ্বাসের পাটাতনে সজ্জিত। এই জাব্বা-জোব্বার বাস্তবতার সঙ্গে অলৌকিক (লোকবাস্তব নয়, কিন্তু বিশ্বাস বাস্তব) বিশ্বাস বাস্তব ও মিথিক চেতনার রূপায়ন আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার মার্গে বসে আছে। ইসলামী মিথ ও ইসলামী ঐতিহ্যের সঙ্গে এই ইন্টারেকটিভস চেতনার মিল ধরেই শহীদি ঈদের রূপবৈচিত্র্য নির্মাণ করা যায়। এখানে বস্তুবাস্তবের সঙ্গে অবস্তুবাস্তবের যে মিশেল তারই দ্বৈরথে তৃতীয়মাত্রা বা ব্যঞ্জনার্থ সৃষ্টি হয়েছে। নজরুলীয় বাস্তবতার সঙ্গে এই যে ইসলামী বাস্তবতা নয়া চিন্তার ফল্গু ধারা সৃষ্টি হয়েছে, তাকেই আমি নজরুলের কৃতিত্ব বলে দাবি করি।



