শিগগিরই পুনর্গঠন হতে পারে ঢাকা মহানগর বিএনপি

জনপ্রিয়তা, অভিজ্ঞতা ও আন্দোলনে ভূমিকার সমন্বয় থাকবে

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition

যেকোনো সময় পুনর্গঠন করা হতে পারে বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের কমিটি। দলটির হাইকমান্ড ইতোমধ্যে নতুন ও পুরনো নেতৃত্বের সমন্বয়ে শক্তিশালী কমিটি গঠনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়, সাংগঠনিকভাবে দক্ষ এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করতে সক্ষম নেতাদেরই এবার প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এবং নেতাকর্মীদের পাশে থেকে সাংগঠনিক কাঠামো সচল রাখায় কয়েকজন নেতার নাম এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তরে সভাপতি হিসেবে বর্তমান আহ্বায়ক ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের নাম জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। অন্য দিকে দক্ষিণে সভাপতি হিসেবে বর্তমান সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যুগ্ম আহ্বায়ক, সাবেক ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব লিটন মাহমুদের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে অভিজ্ঞ ও সিনিয়র কয়েকজনের নামও কমিটির শীর্ষ তালিকায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৭ জুলাই রফিকুল আলম মজনুকে আহ্বায়ক এবং তানভীর আহমেদ রবীনকে সদস্যসচিব করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এবং সাইফুল আলম নীরবকে আহ্বায়ক ও সাবেক ফুটবলার আমিনুল হককে সদস্যসচিব করে মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি গঠন করা হয়। তবে সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগে পরবর্তীতে মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর আমিনুল হককে আহ্বায়ক ও মোস্তফা জামানকে সদস্য সচিব করে নতুন কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি। এতে বাদ দেয়া হয় সাইফুল আলম নীরবকে।

দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবার এমন নেতৃত্ব চান যারা একদিকে আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত, অন্য দিকে সাংগঠনিক দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমে আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ যেকোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলকে শক্ত অবস্থানে রাখতে সক্ষম হবেন।

জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের পাশাপাশি দল পুনর্গঠনের কাজেও গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। প্রথমে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন, পরে মূল দলের বিভিন্ন ইউনিট পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে রাজধানী ঢাকার রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির কমিটি দ্রুত পুনর্গঠন করা হতে পারে।

দলীয় নেতারা বলছেন, এবারের কমিটিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে আন্দোলনে ভূমিকা, সাংগঠনিক সক্ষমতা, নেতাকর্মীদের দেখভাল এবং সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা। দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় থেকেও যারা হামলা-মামলা, কারাবরণ ও নির্যাতনের মুখে সংগঠনকে ধরে রেখেছেন, তাদের মূল্যায়নের দাবি জোরালো হয়েছে।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সম্ভাব্য সভাপতি হিসেবে আলোচনায় থাকা তানভীর আহমেদ রবিন ইতোমধ্যে ক্লিন ইমেজের নেতা হিসেবে হাইকমান্ডের আস্থা অর্জন করেছেন বলে জানা গেছে। আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে তার সক্রিয় উপস্থিতি এবং নেতাকর্মীদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ তাকে সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে নিয়ে এসেছে। একাধিকবার হামলা-মামলা ও কারাবরণের পরও তিনি মাঠে সক্রিয় ছিলেন বলে নেতাকর্মীরা জানান।

অন্য দিকে লিটন মাহমুদও ত্যাগী, সৎ ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নেতা হিসেবে দক্ষিণ বিএনপিতে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন। বিশেষ করে কঠিন সময়ে শীর্ষ নেতারা কারাগারে থাকাকালে তিনি ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব হিসেবে দলকে সুসংগঠিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নেতাকর্মীদের খোঁজখবর রাখা, সাংগঠনিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নে তার সক্রিয়তা তাকে সাধারণ সম্পাদক পদের দৌড়ে এগিয়ে রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

জানতে চাইলে তানভীর আহমেদ রবিন নয়া দিগন্তকে বলেন, দলের কমিটি গঠন সম্পূর্ণভাবে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এখতিয়ার। তবে যারা আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন এবং কঠিন সময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন, দল নিশ্চয়ই তাদের মূল্যায়ন করবে। আমরা সবসময় সংগঠনকে শক্তিশালী করতেই কাজ করছি।

এ দিকে বর্তমান আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু ফেনী-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তার সংসদীয় এলাকা ও মহানগর দুই জায়গার সাংগঠনিক কার্যক্রম সমন্বয় করে পরিচালনার বিষয়টিও এখন দলীয় আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, জাতীয় সংসদ ও নির্বাচনী এলাকার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ঢাকা মহানগরের সার্বক্ষণিক সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা বাস্তবিক অর্থেই বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে দক্ষিণ বিএনপিতে পূর্ণকালীন ও মাঠকেন্দ্রিক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা আরো জোরালো হয়েছে। তবে মজনু দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থেকে দলকে নেতৃত্ব দেয়ায় তার সাংগঠনিক অবদানও ইতিবাচকভাবেই মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

অন্য দিকে ঢাকা মহানগর উত্তরে বর্তমান আহ্বায়ক আমিনুল হক সরকারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংগঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হিসেবে দায়িত্বে থাকলেও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সাথে সমন্বয়, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তার অভিজ্ঞতা মহানগর রাজনীতিকে আরো কার্যকর করতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন নেতারা। একাধিক নেতা জানান, প্রতিমন্ত্রী হলেও আমিনুল হক মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় রয়েছেন। তার নেতৃত্বে উত্তর বিএনপি নতুন গতি পাবে বলে আশা করছেন তারা।

জানতে চাইলে আমিনুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, দল যে দায়িত্ব দেবে, সেটিই নিষ্ঠার সাথে পালন করব। আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনীতি থেকে উঠে এসেছি। নেতাকর্মীদের সাথে আমার সম্পর্ক সবসময় ছিল এবং থাকবে। সরকার ও সংগঠনের কাজ সমন্বয় করেই এগিয়ে নেয়া সম্ভব।

অন্য দিকে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় থাকা এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন এমপি দীর্ঘদিন ধরে মহানগর উত্তরের রাজনীতিতে সক্রিয়। আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ, সাংগঠনিক যোগাযোগ এবং তৃণমূলের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে তিনি নেতাকর্মীদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

এস এম জাহাঙ্গীর বলেন, দল সবসময় যোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও পরীক্ষিত নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করে। যারা দীর্ঘদিন রাজপথে ছিল এবং সংগঠনের জন্য কাজ করেছে, তাদের নিয়েই শক্তিশালী টিম গঠন হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। সরকার ও সংগঠনের কাজ সমন্বয় করেই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব।

এ ছাড়া মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির পুনর্গঠনকে ঘিরে আরো কয়েকজন নেতার নাম বিভিন্ন মহলে আলোচনায় রয়েছে। দক্ষিণে সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার, যুবদল সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না, নবীউল্লাহ নবী, আ ন ম সাইফুল ইসলাম ও সাইদুর রহমান মিন্টুর নাম তাদের অনুসারীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। অন্য দিকে উত্তরে মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন, আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার, এ বি এম আব্দুর রাজ্জাক, কফিল উদ্দিন আহমেদ, মামুন হাসান ও এ জি এম শামসুল হকের নামও নেতাকর্মীদের বিভিন্ন মহলে আলোচনায় রয়েছে।

কাজী আবুল বাশার এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রায় ১৮ বছর একাধারে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ছিলাম। ঢাকা মহানগর দক্ষিণে প্রায় সব কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলাম। ফলে নেতাকর্মীরা তাকে ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি হিসেবে দেখতে চান।

আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মহানগরীর রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন। হামলা-মামলা সহ্য করে রাজপথের আন্দোলনে ছিলেন। দলের হাইকমান্ড যদি মহানগর বিএনপির দায়িত্বে যোগ্য মনে করেন, তাহলে তিনি সভাপতি হতে প্রস্তুত।

মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক হতে আগ্রহী কফিল উদ্দিন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, আওয়ামী ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সোচ্চার ছিলাম। রাজনীতি করতে গিয়ে হামলা মামলার শিকার হয়েছি। আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়েছে। দল যদি দায়িত্ব দেয়, তাহলে নিজের সবটুকু দিয়ে কাজ করে যাব।

বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা বলছেন, এবার এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কমিটি গঠন করা হবে যেখানে অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, আন্দোলনে ভূমিকা এবং জনগ্রহণযোগ্যতার সমন্বয় থাকবে। খুব দ্রুতই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসতে পারে ।

কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, ঢাকা মহানগর কমিটি ভেঙে দেয়ার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল। এখানে কমিটি গঠন একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। দলে যাদের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, যারা আন্দোলন সংগ্রামে পরীক্ষিত, তারাই নেতৃত্বে আসবেন, এটাই স্বাভাবিক।