বিগত আওয়ামী লীগের সময়কালে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে রাষ্ট্রয়াত্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ব্যাপকহারে বেড়ে গিয়েছিল। এতদিন এসব খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান গোপন রাখা হয়েছিল; কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র উঠে আসতে শুরু করেছে।
যেমন, আওয়ামী শাসনকালে ২০২৩-২০২৪ অর্থবছর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত আট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেখানো হয়েছিল ১৯৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। সেই খেলাপি ঋণই এক বছর পর ২০২৪-২০২৫ অর্থবছর শেষে বেড়ে হয়েছে ৪২৯ কোটি ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৩০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। অর্থ বিভাগ সম্প্রতি এই হিসাব চূড়ান্ত করেছে এবং পরিসংখ্যানটি অর্থ বিভাগের প্রকাশিতব্য ‘অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৫’-এ প্রকাশ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অর্থ বিভাগের হিসাব মতে, গত জুন শেষে প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট পুঞ্জীভূত ব্যাংক ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৯৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর আগের বছর একই সময়ে (জুন ২০২৪) প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৫ হাজার ১২৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। সে হিসাবে গত এক বছরে আটটি প্রতিষ্ঠানের মোট বকেয়া ঋণ বেড়েছে সাত হাজার ৮৩১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, আটটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন’ (বিজেএমসি)-এর খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি। এর পরিমাণ ৩৭৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। গত বছর (জুন ২০২৪) সংস্থাটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৩১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। মূলত বিজেএমসির খেলাপি ঋণ দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ার কারণে সার্বিকভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৬৬৭ কোটি আট লাখ টাকা।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, খেলাপি ঋণে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে ‘বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন’ (বিটিএমসি) এবং ‘বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন’ (বিএডিসি)। গত জুন শেষে বিটিএমসির মোট ব্যাংক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা; এর মধ্যে ২৪ কোটি ৩০ লাখ টাকাই খেলাপি।
অন্য দিকে বিএডিসির মোট ব্যাংক ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১৮ হাজার ৫৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা; এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ২১ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে- ‘বাংলাদেশ চা বোর্ড’ (বিটিবি)-এর মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ চার কোটি ৬২ লাখ টাকা, যার পুরোটাই খেলাপি।
শতভাগ খেলাপির তালিকায় আরো রয়েছে ‘বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা’ (বিআরটিসি)। প্রতিষ্ঠানটির মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ ৫৭ লাখ টাকা; এর পুরোটাই খেলাপি।
এ ছাড়া বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)-এর খেলাপি ঋণ ৭৪ লাখ টাকা হলেও প্রতিষ্ঠানটির মোট বকেয়া ঋণ আট হাজার ২৩৫ কোটি টাকা।
একইভাবে ‘ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ’ (টিসিবি)-এর মোট বকেয়া ঋণ হচ্ছে সাত হাজার ৩৩৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা; এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ২০ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ খাদ্য ও চিনিশিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি)-এর খেলাপি ঋণ মাত্র দুই লাখ টাকা; কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির মোট বকেয়া ঋণ আট হাজার ৬২৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
বাজেট উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর বড় অঙ্কের বকেয়া ঋণ এবং কম-বেশি খেলাপির দায় বহন করে চলেছে। কিন্তু কোনো কোনো অর্থবছরে এসব প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণের তথ্য গোপনও করেছে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, যেসব ব্যাংকের ঋণ খেলাপি হয়েছে, সেগুলো সবই রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংকের কাছে।



