এপ্রিলে রেমিট্যান্সে উল্লম্ফন

ভূরাজনীতির মিশ্র প্রভাব অর্থনীতিতে : বৃদ্ধি টেকসই করা চ্যালেঞ্জ

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

এপ্রিল ২০২৬-এ বাংলাদেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৩১২ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৩৮ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩.৬ শতাংশ বেশি। শুধু মাসিক হিসাবেই নয়, চলতি অর্থবছরের (জুলাই-এপ্রিল) ১০ মাসে মোট রেমিট্যান্স এসেছে দুই হাজার ৯৩৩ কোটি ডলার, যা ১৯.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।

এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে বড় ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রফতানি আয় ও বৈদেশিক ঋণের চাপের মধ্যে রেমিট্যান্সই অর্থনীতির একটি “সেফটি ভালভ” হিসেবে কাজ করছে।

কেন বাড়ছে রেমিট্যান্স?

রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত ও তাৎক্ষণিক কারণ রয়েছে- প্রথমত, সরকারের প্রণোদনা ও বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর সুবিধা বৃদ্ধি, ব্যাংকিং চ্যানেল সহজ হওয়া, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস যুক্ত হওয়া এবং হুন্ডি নিরুৎসাহিত করার নীতির ফলে প্রবাসীরা আনুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছেন।

দ্বিতীয়ত, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি। টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় প্রবাসীরা একই ডলার পাঠিয়ে দেশে বেশি টাকা পাচ্ছেন, যা রেমিট্যান্স প্রবাহকে উৎসাহিত করছে।

তৃতীয়ত, মৌসুমি ও সামাজিক কারণ-বিশেষ করে রমজান ও ঈদুল আজহার আগে প্রবাসীরা পরিবারের জন্য বেশি অর্থ পাঠান। ফলে মার্চ-এপ্রিল এবং আগামী মাসগুলোতেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা থাকে।

ভূরাজনৈতিক প্রভাব

এবারের রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বহিরাগত কারণও কাজ করেছে- মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সামরিক উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী শ্রমিক কর্মরত থাকায় তারা ঝুঁকি মোকাবেলায় হাতে থাকা সঞ্চয় দ্রুত দেশে পাঠাতে শুরু করেন। অতীতেও দেখা গেছে, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় রেমিট্যান্স সাময়িকভাবে বেড়ে যায়।তবে এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক নাও হতে পারে। কারণ, যদি সঙ্ঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে শ্রমবাজার সঙ্কুুচিত হতে পারে, কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

অর্থনীতিতে প্রভাব : ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ফলে- বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ কিছুটা কমে; আমদানি ব্যয় পরিশোধ সহজ হয়; টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে আর গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভোগ ও বিনিয়োগ বাড়ে।

তবে একটি বাস্তবতা হলো, রেমিট্যান্স নির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণও করে তোলে। কারণ এটি বহির্ভরশীল আয়, যা বৈশ্বিক শ্রমবাজার, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অভিবাসন নীতির ওপর নির্ভরশীল।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ইতিবাচক প্রবাহ ধরে রাখতে হলে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে যার মধ্যে রয়েছে- দক্ষ জনশক্তি রফতানি বৃদ্ধি; নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান (ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া); হুন্ডি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবাসীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা।

সব মিলিয়ে, এপ্রিলের রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য স্বস্তির খবর হলেও এর পেছনের কারণগুলো-বিশেষ করে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা-দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেয়। তাই এই প্রবাহকে স্থায়ী অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।