বিদেশী বিনিয়োগে ‘গোপন শর্ত’ কতটা সুরক্ষিত জাতীয় স্বার্থ?

বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের তীব্র প্রতিযোগিতার আড়ালে থাকা বিভিন্ন ‘গোপন শর্ত’ ও ‘অস্পষ্ট চুক্তি’ নিয়ে জনমনে এবং বিশেষজ্ঞ মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। নীতিনির্ধারকরা বিদেশী বিনিয়োগ টানতে গিয়ে এমন কিছু ছাড় বা শর্ত মেনে নিচ্ছেন, যা সাময়িকভাবে সুবিধাজনক মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে কর অবকাশ, মুনাফা প্রত্যাবাসনের অবাধ স্বাধীনতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের একচেটিয়া ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে না আসায় বিনিয়োগের টেকসই প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

বিদেশী বিনিয়োগকে (এফডিআই) দীর্ঘকাল ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের তীব্র প্রতিযোগিতার আড়ালে থাকা বিভিন্ন ‘গোপন শর্ত’ ও ‘অস্পষ্ট চুক্তি’ নিয়ে জনমনে এবং বিশেষজ্ঞ মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। নীতিনির্ধারকরা বিদেশী বিনিয়োগ টানতে গিয়ে এমন কিছু ছাড় বা শর্ত মেনে নিচ্ছেন, যা সাময়িকভাবে সুবিধাজনক মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে কর অবকাশ, মুনাফা প্রত্যাবাসনের অবাধ স্বাধীনতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের একচেটিয়া ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে না আসায় বিনিয়োগের টেকসই প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বিনিয়োগের উল্লম্ফন বনাম গুণগত মান

সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের প্রবাহ আবারো ইতিবাচক ধারায় ফিরছে। ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ১.৭ থেকে ১.৮ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। বিনিয়োগ প্রবাহের এই হার প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির ব্যবচ্ছেদ করলে ভিন্ন এক চিত্র বেরিয়ে আসে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই বিনিয়োগের একটি বিশাল অংশই নতুন মূলধন বা ‘ফ্রেশ ক্যাপিটাল’ নয়। বরং এটি পুরনো কোম্পানির পুনঃবিনিয়োগ কিংবা আন্তঃকোম্পানি ঋণ। ২০২৫ সালের তথ্যমতে, এ ধরনের ঋণের প্রবাহ ১৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ফলে খাতা-কলমে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেও নতুন কর্মসংস্থান বা নতুন শিল্প ইউনিট স্থাপনে এর প্রভাব প্রত্যাশিত মাত্রায় দেখা যাচ্ছে না।

অপ্রকাশিত শর্ত ও অসম প্রতিযোগিতা

অভিযোগ রয়েছে, বিদেশী বিনিয়োগের অনেক চুক্তিতে এমন কিছু শর্ত থাকে যা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বাইরে জানাজানি হয় না। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কর অবকাশ, লভ্যাংশ সরাসরি বিদেশে পাঠানোর বিশেষ সুবিধা এবং স্থানীয় কোম্পানির তুলনায় অসম বাজার সুবিধা অন্যতম।

সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়টি দেখা যাচ্ছে অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতে। ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’-এর মাধ্যমে উৎপাদন না করেও বিনিয়োগকারীদের বিপুল অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা সরকারের রাজস্বের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করছে। এ ছাড়া বিদেশী কোম্পানিগুলো কম সুদে আন্তর্জাতিক তহবিল ব্যবহারের সুযোগ পেলেও দেশীয় উদ্যোক্তাদের উচ্চ সুদে ব্যাংক ঋণ নিতে হচ্ছে। এতে স্থানীয় শিল্প অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে এবং বাজার ধীরে ধীরে বিদেশী কোম্পানির দখলে চলে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতামত ও উদ্বেগ

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বিদেশী বিনিয়োগ অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা যেন দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে না হয়। বিনিয়োগের শর্তগুলো স্বচ্ছ না হলে জনগণের আস্থা কমে যায় এবং নীতিনির্ধারণে জবাবদিহিতা থাকে না। বিদেশী বিনিয়োগ তখনই কার্যকর হয় যখন তা স্থানীয় অর্থনীতির সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করে এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশে বাধা না হয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।’

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্বচ্ছতার অভাব। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘অনেক চুক্তিই জনসমক্ষে আসে না, যার ফলে সংসদ বা সাধারণ জনগণ জানতেই পারে না কী শর্তে দেশের সম্পদ ব্যবহার হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ‘নীতি ঝুঁকি’ তৈরি হয়। বিশেষ করে বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা সঙ্কটের সময়ে যদি মুনাফার বড় অংশ বিদেশে চলে যায়, তবে তা মুদ্রাবাজারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। মুনাফার একটি অংশ বাধ্যতামূলকভাবে পুনঃবিনিয়োগের শর্ত থাকা উচিত।’

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও টেকসই সমাধান

বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ডের (বিডা) কর্মকর্তাদের মতে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কিছু প্রণোদনা দেয়া অপরিহার্য। তারা দাবি করছেন, বর্তমানে চুক্তিগুলো আরো স্বচ্ছ করার কাজ চলছে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনুমোদন প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। তবে তারা স্বীকার করেন যে, অতীতে কিছু ক্ষেত্রে এমন কিছু শর্ত দেয়া হয়েছে যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু যদি বড় বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘ সময় কর অবকাশ ভোগ করতে থাকেন, তবে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, বিনিয়োগের জন্য এখন একটি ‘ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল’ প্রয়োজন।

টেকসই উন্নয়নের জন্য যা জরুরি : বিনিয়োগ চুক্তিগুলো স্বচ্ছ ও প্রকাশ্য করা; বিনিয়োগের হারের চেয়ে প্রযুক্তির হস্তান্তর নিশ্চিত করা; পারফরম্যান্সভিত্তিক প্রণোদনা চালু করা এবং যেখানে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে সুবিধা প্রত্যাহার করা হবে। দেশীয় শিল্প ও উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা দেয়া যাতে তারা বিদেশী কোম্পানির সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে।

উপসংহার

বিদেশী বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ হলেও তা যেন ‘জাতীয় স্বার্থের’ পরিপন্থী না হয়। শুধু বিনিয়োগের অঙ্ক নয়, বরং এর গুণগত মান এবং শর্তের স্বচ্ছতার ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় টেকসই উন্নয়ন অধরাই থেকে যাবে এবং দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতার মুখে পড়বে।