মশার দৌরাত্ম্য ও ডেঙ্গু আতঙ্ক

দ্বিগুণ বাজেটেও স্বস্তি নেই নগরবাসীর

Printed Edition
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় বেড়েছে মশার প্রজনন। ছবিটি কাজলা এলাকার : নয়া দিগন্ত
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় বেড়েছে মশার প্রজনন। ছবিটি কাজলা এলাকার : নয়া দিগন্ত

খালিদ সাইফুল্লাহ

বর্ষা মৌসুম শেষে রাজধানী ঢাকায় মশার উপদ্রব ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। দিন কিংবা রাত মশার অত্যাচারে অতিষ্ঠ নগরবাসী। বাসাবাড়ি, শিাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত থেকে শুরু করে খোলা জায়গা সর্বত্রই মশার একচ্ছত্র রাজত্ব। এরই মধ্যে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। মশাবাহিত এই প্রাণঘাতী রোগের বিস্তারে ঢাকাবাসীর মধ্যে বিরাজ করছে উদ্বেগ। অথচ মশা নিধনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দণি সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বার্ষিক বরাদ্দের পরিমাণ শতকোটি টাকার ওপর। বিশাল অঙ্কের এই বাজেট খরচ সত্ত্বেও মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে না আসায় চরম ােভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন রাজধানীর বাসিন্দারা।

প্রতি বছর শতকোটি টাকার বাজেট, মিলছে না সফলতা : চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মশা নির্মূলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) বরাদ্দ রেখেছে ১৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে মশার ওষুধ কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০ কোটি টাকা, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ কোটি টাকা। যন্ত্রপাতি, ফগার, হুইল স্প্রে মেশিন, পরিবহন খাতে এই ব্যয় ধরা হয়েছে। আগের অর্থবছরে মশক নির্মূলে ডিএনসিসি ব্যয় করেছে ১৩১ কোটি টাকা। অন্য দিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মশা মারতে ঢাকা দণি সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) বরাদ্দ রেখেছে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যয় করেছে ৩৩ কোটি টাকা।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন প্রতি বছরই মশা নিধনে বিশাল অংকের বাজেট ঘোষণা করে। ওষুধ ক্রয়, মশক নিধন সরঞ্জাম কেনা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতেই এই টাকা ব্যয় হয়। তবে বাস্তবে তার সুফল কতটুকু মিলছে তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নগরবাসীর অভিযোগ, ওষুধ ছিটানোর যে রুটিন কার্যক্রম বা ‘ফগিং’ তা অধিকাংশ এলাকায় নিয়মিত দেখা যায় না। অনেক েেত্র ওষুধ ছিটানো হলেও সে ওষুধের মান ও কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে। এ ছাড়া ওষুধ কেনার নামে টাকা লুটপাট হয় কিনা তা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন নগরবাসী।

ডেঙ্গু আতঙ্ক ও চিকিৎসা কেন্দ্রে চাপ : বর্ষার বৃষ্টিতে জায়গায় জায়গায় পানি জমে থাকা এবং সঠিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে এডিস মশার প্রজনন বহুগুণ বেড়েছে। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর একটা বড় অংশই ঢাকার বাসিন্দা। ঢাকার প্রধান প্রধান সরকারি হাসপাতালÑ যেমন : ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল ও মিটফোর্ড হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর ভিড় ক্রমশ বাড়ছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এখনই কার্যকর পদপে না নিলে পরিস্থিতি বিগত বছরগুলোর চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। শিশুদের স্কুলে পাঠানো কিংবা রাতে ঘুমানো সবেেত্রই অভিভাবকরা মারাত্মক উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

দুই প্রশাসকের আশ্বাস ও যৌথ সচেতনতার আহ্বান : মশার অব্যাহত উপদ্রব ও ডেঙ্গু বৃদ্ধির বিষয়ে দুই সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসকরা পরিস্থিতির গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। তারা দাবি করছেন, সিটি করপোরেশনের প থেকে নিয়মিত মশা নিধনে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। তবে প্রশাসকরা একই সাথে জোর দিয়ে বলছেন, সিটি করপোরেশনের একার পে মশা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। গৃহস্থালি, নির্মাণাধীন ভবন, বহুতল ভবনের পার্কিং বা ছাদবাগানে জমে থাকা পানির একটি বড় অংশ নগরবাসীর অল্েযই থেকে যায়।

আইন অমান্য ও অবহেলায় শাস্তির হুঁশিয়ারি : নাগরিকদের দায়িত্বহীনতার বিষয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন দুই সিটির প্রশাসক। তারা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, বাসাবাড়ি বা নির্মাণাধীন ভবনে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে কিংবা জমা পানি ফেলে না দিলে কোনো ছাড় দেয়া হবে না।

ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা : প্রতিনিয়ত উত্তর ও দণি সিটির বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এ সময় যেসব বাসা, বাণিজ্যিক ভবন বা নির্মাণাধীন প্রজেক্টে পানির জমাটবদ্ধতা এবং মশার লার্ভা মিলবে, তাদের মালিকদের বিরুদ্ধে তাৎণিক আর্থিক জরিমানা আদায় করা হচ্ছে এবং ত্রেবিশেষে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।

সাধারণ নগরবাসীর মতে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আগে সিটি করপোরেশনকে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। ড্রেন পরিষ্কার, খাল উদ্ধার এবং ভেজাল মুক্ত মানসম্মত মশার ওষুধ নিয়মতান্ত্রিকভাবে ছিটানো নিশ্চিত করাই মূল সমাধান।

গোলাপবাগ এলাকার বাসিন্দা আরিফুর রহমান বলেন, এলাকার রাস্তাঘাট খুঁড়ে রাখা হয়েছে। এতে পানি জমে থাকছে। সেখানে মশার প্রজনন বাড়ছে। কিন্তু সিটি করপোরেশন সেসব পানি ঠিকমত পরিস্কার করে না। এ ছাড়া এলাকায় ময়লা আবর্জনায় ভর্তি। ফলে রাতদিন মশার যন্ত্রণায় এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ।

অন্য দিকে মশক গবেষক ও কীটতত্ত্ববিদরা মনে করছেন, কেবল বর্ষা এলেই ‘প্যানিক’ হয়ে সাময়িক অভিযান না চালিয়ে বছরজুড়ে বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা (আইসিএম) চালু রাখতে হবে।

মশা ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ে কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার সতর্ক করে বলেছেন, বর্ষা ও পরবর্তী সময়ে সঠিক ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা না থাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করছে। ঢাকার পাশাপাশি মফস্বল ও ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতেও প্রজনন বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবেলা আরো কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসি প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রি. জে. ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নির্মূল করা যাবে না। নতুন করে ডেঙ্গু রোগী শনাক্তের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু রোগীর ঠিকানা সংগ্রহ করে সন্ধ্যার আগে রোগীর ঠিকানায় কুইক রেসপন্স টিম গিয়ে মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

ডিএনসিসি প্রশাসক মো: শফিকুল ইসলাম খান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ‘কিন ঢাকা, গ্রীণ ঢাকা’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে আমরা কাজ শুরু করেছি। ঢাকা শহরকে ডেঙ্গু মুক্ত এবং মশা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য স্কুল কলেজের মধ্য দিয়ে প্রতি সপ্তাহে এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, যাদের বাসা বাড়িতে ডেঙ্গুর লার্ভা পাওয়া যাবে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাদেরকে আমরা জরিমানা করব। এ পদপে বাস্তবায়নের জন্য ১০ জন ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কোনো স্থাপনা কিংবা ডেঙ্গুর লার্ভা পাওয়া যাবে কিংবা বাসা বাড়ির সামনে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ময়লা ছেড়ে রাখবে তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডিএসসিসি প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, নিয়মিত পদপেগুলোর পাশাপাশি কোথাও মশা থাকার অভিযোগ পেলে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে পুরো ওয়ার্ডে অভিযান চালানো হয়। সকালে লার্ভিসাইডিং (মশার লার্ভা নিধন) এবং বিকেলে এডাল্টিসাইডিং (উড়ন্ত মশা) করা হয় এক সপ্তাহ ধরে। বর্তমানে এই কার্যক্রমে জনপ্রতিনিধিদের যুক্ত করা হয়েছে।

নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে সমন্বিত অভিযান চালানো হচ্ছে জানিয়ে ঢাকা দণি সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আবদুস সালাম বলেন, নাগরিকদের অবহেলায় যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেললে বা পানি জমিয়ে এডিস মশার লার্ভা সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করলে আইন অনুযায়ী কঠোর জরিমানা করা হবে। সবার সচেতনতা ও সমন্বিত সহযোগিতায় আমরা ঢাকা দণি সিটি করপোরেশনকে একটি ‘কিন ও গ্রিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।