দেশে কারখানার বয়লার চলছে না, উৎপাদন লাইনে মেশিনের শব্দ নেই, অর্ডারের কাজ থেমে আছে কিন্তু মাস শেষে ইউটিলিটি বিল ঠিকই আসছে। গ্যাসের চাপ না থাকায় উৎপাদন বন্ধ কিংবা সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে গেলেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরনের খরচ থেমে থাকে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুতের ডিমান্ড চার্জ, মিটার ও সংযোগ-সংক্রান্ত খরচ, গ্যাসের প্রযোজ্য চার্জ, কারখানার ভাড়া, ব্যাংক ঋণের সুদ, শ্রমিক ও প্রশাসনিক ব্যয় সব মিলিয়ে উৎপাদন না থাকলেও একটি বড় অঙ্কের স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হয় উদ্যোক্তাকে। তাদের দাবি গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে সাম্প্রতিক গ্যাসসঙ্কট এই অদৃশ্য আর্থিক চাপকে আবারো সামনে নিয়ে এসেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় পোশাক ও অন্যান্য শিল্পকারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন শিল্পমালিকের সংগঠন ও স্থানীয় শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় বয়লার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও উৎপাদন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ থাকে। একটি পর্যায়ে দুই শতাধিক ছোট ও সাব-কন্ট্রাক্টিং পোশাক কারখানা সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে গ্যাসসঙ্কটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
শিল্পমালিকদের অভিযোগ, সঙ্কটে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে কারখানায় গ্যাস না থাকলেও সংযোগ, অনুমোদিত সক্ষমতা ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয়ের দায় পুরোপুরি বন্ধ হয় না। এমন পরিস্থিতিতে এক দিকে উৎপাদন কমে আয় কমছে, অন্য দিকে ব্যয়ের বড় অংশ আগের মতোই বহন করতে হচ্ছে। এখানে গ্যাসের বিলের কাঠামো নিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। গ্যাসের ক্ষেত্রে ‘কারখানা গ্যাস ব্যবহার করেনি, তাই নির্দিষ্ট ন্যূনতম বিল অবশ্যই দিতে হবে এমন সরল কাঠামো সব শিল্পগ্রাহকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তিতাস গ্যাসের প্রকাশিত ট্যারিফ ও চার্জ কাঠামোতে গ্যাস ব্যবহারের পাশাপাশি গ্রাহকের ধরন ও সংযোগ অনুযায়ী বিভিন্ন চার্জ রয়েছে। তাই কোনো কারখানা সঙ্কটে কত টাকা গ্যাস বিল দেবে, তা তার সংযোগের ধরন, অনুমোদিত লোড, প্রকৃত ব্যবহার এবং প্রযোজ্য ট্যারিফের ওপর নির্ভর করে।
খাত সংশ্লিষ্ঠরা বলছেন, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ‘ডিমান্ড চার্জ’ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য একটি স্পষ্ট স্থায়ী ব্যয়ের উদাহরণ। বিদ্যুৎ বিল শুধু ব্যবহৃত ইউনিটের ওপর নির্ভর করে না; অনুমোদিত বা নির্ধারিত চাহিদার বিপরীতে ডিমান্ড চার্জও দিতে হয়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ২০২৬ সালের বিদ্যুতের খুচরা মূল্যহার এবং বিতরণ কোম্পানিগুলোর ট্যারিফ কাঠামোতে এই চার্জের বিধান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা উদাহরণ হিসেবে বলছেন, কোনো শিল্পকারখানার অনুমোদিত বৈদ্যুতিক লোড ৫০০ কিলোওয়াট। কারখানাটি গ্যাস না পাওয়ায় এক মাস উৎপাদন বন্ধ রাখল। সে ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ইউনিট কমে গেলেও প্রযোজ্য ডিমান্ড চার্জ পুরোপুরি শূন্য হয়ে যাবে এমন নয়। ৯০ টাকা প্রতি কিলোওয়াট মাসিক ডিমান্ড চার্জের একটি উদাহরণ ধরে ৫০০ কিলোওয়াট সংযোগে শুধু এই চার্জই দাঁড়ায় ৪৫ হাজার টাকা। ১ মেগাওয়াট অনুমোদিত লোড হলে তা ৯০ হাজার টাকা। এর সাথে ব্যবহৃত বিদ্যুতের বিল, ভ্যাট এবং অন্যান্য প্রযোজ্য চার্জ যোগ হতে পারে। প্রকৃত বিল অবশ্য গ্রাহকের সংযোগের ধরন ও প্রযোজ্য ট্যারিফ অনুযায়ী পরিবর্তিত হবে। তারা বলছেন, শিল্পমালিকদের কাছে সমস্যাটি এখানেই। গ্যাসের সঙ্কটে বয়লার বন্ধ থাকলে গ্যাসের ব্যবহার কমে যায়। কিন্তু বয়লার, জেনারেটর, কম্প্রেসর, ডাইং মেশিন, স্টেন্টার কিংবা অন্যান্য উৎপাদনযন্ত্রের জন্য যে সংযোগ ও অবকাঠামো ধরে রাখতে হয়েছে, তার সাথে যুক্ত সব ব্যয় একই হারে কমে না। ফলে উৎপাদন কমার সাথে সাথে ইউটিলিটি ব্যয় একই অনুপাতে কমছে না।
সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের (বিএই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল নয়া দিগন্তকে বলেন, গাজীপুরের বর্তমান পরিস্থিতি এই ব্যবধানের একটি বাস্তব উদাহরণ। বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কারখানাগুলোকে উৎপাদন কমাতে হয়েছে। কোথাও শ্রমিকদের ছুটি দিতে হয়েছে, কোথাও শিফট কমানো হয়েছে। কিছু কারখানা অর্ডারের সময়সীমা ধরে রাখতে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। এতে গ্যাসের সঙ্কটের সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির খরচ।
এ দিকে নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধিও শিল্পের চাপ বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে নতুন শিল্পসংযোগের ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা করা হয়। ক্যাপটিভ পাওয়ারের নতুন গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। এতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে; আর সঙ্কটের সময় কম গ্যাস পাওয়ার সাথে এই বাড়তি মূল্য উৎপাদন খরচকে আরো চাপে ফেলছে।
তিনি বলেন, গাজীপুরের শিল্পকারখানাগুলো শুধু গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল নয়। গ্যাসের চাপ কমলে বিদ্যুৎ ও বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে। কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহেও কোনো কোনো সময় সমস্যা দেখা দিলে ডিজেলচালিত জেনারেটর চালাতে হয়। এতে প্রতি ইউনিট উৎপাদনের খরচ আরো বেড়ে যায়। অর্থাৎ একই সময়ে কারখানাকে কম গ্যাস, কম উৎপাদন এবং বেশি বিকল্প জ্বালানি তিন ধরনের আর্থিক চাপ মোকাবেলা করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘গ্যাস নেই, কিন্তু বিল আছে’ এমন বক্তব্য কেবল আবেগের বিষয় নয়; এর পেছনে রয়েছে শিল্পের খরচের কাঠামো। একটি কারখানার ইউটিলিটি ব্যয়কে শুধু ব্যবহৃত গ্যাস বা বিদ্যুতের ইউনিট দিয়ে হিসাব করলে সমস্যাটির পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। ব্যবহারভিত্তিক খরচের পাশাপাশি সক্ষমতা ধরে রাখার ব্যয়ও রয়েছে।
তিনি বলেন, শিল্পে জ্বালানি সঙ্কটকে শুধু সরবরাহ ঘাটতি হিসেবে দেখলে হবে না। জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা শিল্পের উৎপাদন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। শিল্পাঞ্চলভিত্তিক গ্যাস সরবরাহের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে। কোনো শিল্পগ্রাহকের অনুমোদিত লোড কত, প্রকৃত সরবরাহ কত, মিটারে ব্যবহার কত এবং বিলের কোন অংশ ব্যবহারভিত্তিক ও কোন অংশ স্থায়ী এসব তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলে উদ্যোক্তাদের বিভ্রান্তি কমবে। একই সাথে দীর্ঘ সময় সরবরাহ ব্যাহত হলে প্রযোজ্য চার্জ পুনর্বিবেচনার কোনো নীতিগত ব্যবস্থা থাকা উচিত কি না, সেটিও আলোচনায় আনা দরকার বলে তিনি মনে করেন।
এ দিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশ্লেষণেও শিল্পে গ্যাসসঙ্কটকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।



