রুহুল আমিন সৌরভ কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে মোস্তবাপুর গ্রাম। ভোরের আলো ফুটতেই গ্রামের একদল নারী ঘরের কাজ সেরে ছুটে যান কেঁচোর খামারে। কারো হাতে গোবর, কারো হাতে খড়, আবার কেউ ব্যস্ত কেঁচোর জন্য খাবার প্রস্তুত করতে। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ একটি খামার মনে হলেও এই খামারই বদলে দিয়েছে গ্রামের অসংখ্য নারীর জীবন।
বর্তমানে গ্রামটিতে প্রায় ৮০ থেকে ৯০টি পরিবারের নারীরা কেঁচো দিয়ে ভার্মি কম্পোস্ট বা জৈব সার উৎপাদন করছেন। সংসার চালানো, সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ- সব কিছুর বড় একটি অংশ আসে এই কেঁচোর খামার থেকে।
২০০৩ সালে ওই গ্রামের গৃহিণী মনোয়ারা বেগম প্রথম ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদনের কাজ শুরু করেন। ধৈর্য আর পরিশ্রমে গড়ে তোলেন নিজের খামারটি। বর্তমানে মনোয়ারা বেগমের মাসিক আয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। তার সাফল্যের গল্প ছড়িয়ে পড়লে গ্রামের অন্য নারীরাও এ কাজে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে একটি নারীভিত্তিক উদ্যোগ, যা আজ মোস্তবাপুর গ্রামকে দিয়েছে নতুন পরিচয়।
খামারে গরুর গোবর, কৃষিজ বর্জ্য, খড় ও পচা পাতা ব্যবহার করে কেঁচোর মাধ্যমে তৈরি করা হয় উন্নতমানের ভার্মি কম্পোস্ট সার। রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে এই সারের চাহিদা ক্রমেই বেড়েই চলেছে। স্থানীয় কৃষকদের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার ক্রেতারাও এই সার সংগ্রহ করতে এই গ্রামে আসেন।
গ্রামের আরেকজন নারী উদ্যোক্তা রহিমা বেগম বলেন, এই কেঁচোই আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। এই আয় থেকে সংসার চলছে, দুই ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করছে। এখন আর কারো কাছে আমাদের হাত পাততে হয় না। নিজের পরিশ্রমেই সম্মানের সাথে বেঁচে আছি।
রহিমা বেগমের মতো আরো অনেক নারীর জীবন বদলে গেছে এ উদ্যোগে। একসময় যারা শুধুই গৃহিণী ছিলেন, আজ তারাই পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী। নিজেদের আয়ে তারা শুধু সংসারই চালাচ্ছেন না, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক মর্যাদাও অর্জন করেছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুব আলম রনি বলেন, ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি বিভাগ নারী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের আশা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, বাজারজাতকরণে নিয়মিত সহায়তা পেলে নারীদের এ সাফল্য জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি পেতে পারে। খুঁজে পেতে পারে স্বাবলম্বিতা, আত্মমর্যাদা এবং নতুন জীবনের ঠিকানা।



