হামিদুল ইসলাম সরকার
উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনসহ বিভিন্ন মহলের মাঝে প্রশ্ন রয়েছে। ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে প্রকল্প করলে তাতে সমীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সঠিকভাবে সমীক্ষা না করে প্রকল্পের খরচ প্রাক্কলন করা হয়। আবার সমীক্ষা থেকে যে ব্যয় প্রাক্কলন সুপারিশ করা হয় তার চেয়ে বেশি খরচ ধরে প্রকল্প প্রস্তাবনা দেয়া হচ্ছে। অনুমোদনের জন্য পাঠানো বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলে (বরুড়া, বুড়িচং, মুরাদনগর, দেবীদ্বার) নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প গ্রামীণ পাবলিক টয়লেট বানাতে প্রতিটিতে খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৮ লাখ টাকা। সদ্য বিদায়ী বছরগুলোতে এসবে খরচ হয়েছে ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকা। আবার টুইন পিট স্যানিটারি ল্যাট্রিনে যেখানে ৬৫ হাজার টাকা ব্যয় হবে, সেখানে কমিউনিটি ল্যাট্রিনে খরচ হবে প্রতিটিতে ৯ লাখ টাকা। প্রকল্পের অন্যান্য ব্যয়ের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন ও আপত্তি খোদ পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের।
স্থানীয় সরকার বিভাগের দেয়া প্রকল্প প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, কুমিল্লা জেলার বরুড়া, বুড়িচং, মুরাদনগর ও দেবিদ্বার উপজেলায় নলকুপগুলোতে উল্লেখ করার মতো আর্সেনিক পাওয়া গেছে। প্রকল্পের সামগ্রিক উদ্দেশ্য হচ্ছে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে ওই চার উপজেলায় জনগণের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করা। আর এ জন্যই ১৮০ কোটি ৫০ লাখ ২০ হাজার টাকার সরকারি অর্থায়নে আড়াই বছরে বাস্তবায়নের জন্য এই প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্প হতে মোট এক হাজার ৫৪০টি নলকূপ ও ১১শ’টি আর্সেনিক আয়রণ রিমুভাল প্ল্যান্টের সংস্থান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বরুড়া পৌরসভার জন্য পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের জন্য চারটি উৎপাদক নলকূপ ও ২৫ কিলোমিটার বিভিন্ন ব্যাসের পাইপ লাইনের সংস্থান রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও ১০টি পাবলিক টয়লেট ও ১২০টি কমিউনিটি টয়লেটের সংস্থান রেখে আলোচ্য প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের তথ্য বলছে, বরুড়া উপজেলায় একটি পৌরসভা, ১৫টি ইউনিয়ন ও ৩৩৫টি গ্রাম রয়েছে। এই উপজেলার আয়তন ২৪২ বর্গ কিলোমিটার। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বরুড়া উপজেলার গ্রামীণ জনসংখ্যা তিন লাখ ৯৮ হাজার ৩৯৩ জন এবং খানা প্রতি জনসংখ্যা ৪.২৮। কুমিল্লা জেলার সার্বিক নিরাপদ পানি সরবরাহ ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনার স্যানিটেশন কভারেজ যথাক্রমে ৮৩.৮৯ শতাংশ ও ৭৬.৯৭ শতাংশ। সম্প্রতি এ উপজেলার ৩৭ হাজার ৫২৫টি নলকূপের পানি পরীক্ষা করে ৫৫ শতাংশ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া যায়।
বুড়িচং উপজেলায় আটটি ইউনিয়ন ও ১৭২টি গ্রাম রয়েছে। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বুড়িচং উপজেলার জনসংখ্যা তিন লাখ ৪৯ হাজার ৬২৮ জন এবং খানাপ্রতি জনসংখ্যা ৪.৪৯। বর্তমানে বুড়িচং উপজেলায় ৫৫২০টি পানি সরবরাহের বিভিন্ন উৎস রয়েছে। ১৯ হাজার ৮২৮টি নলকূপের পানি পরীক্ষা করে ০.৩ শতাংশ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া যায়। মুরাদনগর উপজেলায় বর্তমানে ২২টি ইউনিয়ন ও ৩০৫টি গ্রাম রয়েছে। উপজেলার জনসংখ্যা পাঁচ লাখ ৮২ হাজার ৯৩৪ জন, খানাপ্রতি জনসংখ্যা ৪.৪৩। উপজেলায় সরকারী ১২ হাজার ৫৮৯টি পানি সরবরাহের বিভিন্ন উৎস রয়েছে। ৩৩ হাজার ৪৯২টি নলকূপের পানি পরীক্ষা করে ৭১ শতাংশ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া যায়। এ ছাড়া দেবীদ্বার উপজেলায় একটি পৌরসভা, ১৫টি ইউনিয়ন ও ২১২টি গ্রাম রয়েছে। দেবীদ্বার উপজেলার জনসংখ্যা চার লাখ ৭১ হাজার ৯১৭ জন এবং খানাপ্রতি জনসংখ্যা ৪.৪২। দেবীদ্বার উপজেলায় ৯৪৫০টি পানি সরবরাহের বিভিন্ন উৎস রয়েছে। ৯৭৭৯টি নলকূপে পানি পরীক্ষা করে ৩৯ শতাংশ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া যায়।
প্রকল্পের আওতায় কাজ : প্রকল্পের আওতায় কাজগুলো হলো, প্রকল্প এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে পাইপলাইনভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন, নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে নলকূপ এবং আর্সেনিক আয়রন রিমুভাল প্ল্যান্ট স্থাপন, পাবলিক টয়লেট এবং কমিউনিটি টয়লেট নির্মাণের মাধ্যমে স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন। প্রস্তাবিত মূল কার্যক্রমগুলো : টুইন পিট স্যানিটারি ল্যাট্রিন ১১ হাজারটি, গভীর নলকূপ (সাবমার্সিবল পাম্প ও উচ্চ জলাধারসহ) ১২শ’টি, কমিউনিটি নলকূপ ২৪০টি, আর্সেনিক আয়রণ রিমুভাল প্ল্যান্ট (এআইআরপি) ১১শ’টি, কমিউনিটি টয়লেট নির্মাণ ১২০টি, ভূগর্ভস্থ পানি পরিশোধনাগার (২০০ ঘনমিটার/ঘণ্টা)-১ বছরের পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণসহ একটি, ওভারহেড ওয়াটার ট্যাংক নির্মাণ দু’টি, বিতরণ পাইপ লাইন স্থাপন (১১০ মিলিমিটার ডায়া, এইচডিপিই) ১৫ কিলোমিটার, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ ১০টি, সঞ্চালন পাইপ লাইন স্থাপন (৩১৫ মিলিমিটার ডায়া, এইচডিপিই) ৩ কিলোমিটার, বিতরণ পাইপ লাইন স্থাপন (১৬০ মিলিমিটার ডায়া, এইচডিপিই) ৭ কিলোমিটার, অগভীর নলকূপ (সাবমার্সিবল পাম্প ও উচ্চ জলাধারসহ) ১০০টি, উৎপাদক নলকূপ (৬ ১র্৪র্ ব্যাস ও ৩০০ মিটার গভীর) স্থাপন চারটি, পাম্প, ট্রান্সফরমার ক্রয় ও স্থাপন (বৈদ্যুতিক সংযোগসহ) চারটি, গৃহসংযোগ এক হাজারটি।
খরচ বিশ্লেষণ : প্রকল্পের আওতায় ১০টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হবে। এতে মোট খরচ দেখানো হয়েছে তিন কোটি ৮০ লাখ টাকা। প্রতিটির ব্যয় ৩৮ লাখ টাকা। যেখানে ২৫ শহরে অন্তর্ভুক্তিমূলক স্যানিটেশন প্রকল্পে প্রতিটি গ্রামীণ শহরে পাবলিক টয়লেট নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ২০ লাখ টাকা। ফলে এখানে ব্যয় বাড়ছে ১৮ লাখ টাকা। আর ২০২১ সালে শুরু করা গ্রামীণ স্যানিটেশন প্রকল্পে এ টাইপের প্রতিটি টয়লেট বানাতে খরচ হচ্ছে ১৭ লাখ টাকা এবং বি টাইপের ৮ লাখ টাকা। ফলে এখানে ব্যয় তুলনা করলে অস্বাভাবিক বাড়ছে।
টুইন পিট স্যানিটারি ল্যাট্রিন ১১ হাজারটি বানাতে খরচ হবে সাড়ে ৭১ কোটি টাকা। ফলে প্রতিটির ব্যয় ৬৫ হাজার টাকা। আর কমিউনিটি ল্যাট্রিন ১২০টি বানাতে ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ফলে প্রতিটির নির্মাণ ব্যয় ৯ লাখ টাকা। এইটার ব্যয় ব্যবধান নিয়েও পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন। আগামী ৯ নভেম্বর প্রকল্পটির উপর মূল্যায়ন কমিটির সভায় খরচের বিষয়গুলো জানতে চাওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
গভীর নলকূপ (সাবমার্সিবল পাম্প ও উচ্চ জলাধারসহ) ১২ শ’টি স্থাপনে খরচ হবে ২০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। প্রতিটির স্থাপন খরচ এক লাখ ৭০ হাজার টাকা। আর কমিউনিটি নলকূপ ২৪০টিতে খরচ ১৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এখানে প্রতিটির ব্যয় সাত লাখ টাকা। অন্য দিকে, অগভীর নলকূপ (সাবমার্সিবল পাম্প ও উচ্চ জলাধারসহ) ১০০টির খরচ এক কোটি ২০ লাখ টাকা। এখানে প্রতিটির ব্যয় হবে এক লাখ ২০ হাজার টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন : প্রকল্পের প্রতিটি খরচের খাত ধরে আলোচনা ও জানতে চাওয়া হবে। সেমিনার বা ওয়ার্কশপ বাবদ ৩৯.২০ লাখ টাকা, পুনরায় সেমিনার বা কনফারেন্স বাবদ ১২ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। সেমিনার বা ওয়ার্কশপের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পিইসি সভায় আলোচনা হবে। এ খাতের আওতায় কেবল স্টার্টআপ কর্মশালার সংস্থান রাখা যেতে পারে। প্রশিক্ষণ বাবদ ৭৮.৪৫ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রকল্প এলাকায় চা বাগান কর্মীদের জন্য ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে হাইজেনিক প্রমোশন রাখা হয়েছে। এ এলাকায় তেমন চা বাগান না থাকায় এ খাতের আওতায় কেবল পানির মান মনিটরিং বাবদ প্রশিক্ষণের সংস্থান রাখা যেতে পারে। প্রকল্পটি কেমল কুমিল্লা জেলায় বাস্তবায়িত হবে বিধায় প্রকল্প পরিচালকের দফতর কুমিল্লা জেলায় হওয়া বাঞ্ছনীয়। অফিস এষ্টাব্লিসমেন্ট বাবদ ২০ লাখ টাকা এবং আসবাবপত্র বাবদ ১৫ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বিস্তারিত বিভাজন প্রদানসহ এ ব্যয় যৌক্তিকভাবে হ্রাস করার জন্য বলা হবে। সামগ্রিক ক্রয় পরিকল্পনায় প্রকল্পের প্যাকেজ সংখ্যা অধিক হওয়ায় তা যৌক্তিকভাবে কমিয়ে আনতে হবে।



