আলজাজিরা
লেবাননে তিন সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এর স্থায়িত্ব নিয়ে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে। খোদ জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন জানিয়েছেন, এই যুদ্ধবিরতির পরিস্থিতি ‘শতভাগ নিশ্চিত নয়’। তা ছাড়া হিজবুল্লাহ ও ইরানকে আলোচনার বাইরে রাখায় এই চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন বলেন, ‘আগের পরিস্থিতির তুলনায় বর্তমান অবস্থা কিছুটা উন্নত হলেও একে শতভাগ স্থিতিশীল বলা যাচ্ছে না।’ তিনি বলেছেন, হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে যেকোনো রকেট হামলার জবাবে ইসরাইলি বাহিনী ‘পাল্টা ব্যবস্থা’ নিতে বাধ্য হবে। ড্যাননের মতে, মূল প্রশ্ন হলো- লেবানন সরকার দক্ষিণ লেবাননে তাদের সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করতে এবং হিজবুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম কি না।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসন অব্যাহত রয়েছে। ১০ দিনের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইলি বাহিনী তাদের অবস্থান থেকে সরে যায়নি। উল্টো ইসরাইলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, তারা লেবাননের লিটানি নদী পর্যন্ত অঞ্চলটি দখল করে রাখতে চায়।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুতের পাবলিক পলিসি ফেলো রামি খুরি এই যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের প্রধান দুই পক্ষ হিজবুল্লাহ এবং ইরানকে আলোচনার টেবিলে না রেখে এই তিন সপ্তাহের মেয়াদ বৃদ্ধি কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন।’
খুরির মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল লেবাননের ওপর এমন একটি চুক্তি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে যা দেশটির অর্ধেক জনগোষ্ঠীই সমর্থন করে না। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘লেবাননের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং বলেন যে কেবল কূটনৈতিক চাপ বা হুমকির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
রামি খুরি আরো উল্লেখ করেন, ইসরাইল আসলে লেবাননের সাথে সম-সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে কোনো শান্তি চুক্তি চায় না, বরং তারা গাজার মতো পরিস্থিতি লেবাননেও সৃষ্টি করতে আগ্রহী। তবে তিনি কিছুটা আশার কথা শুনিয়ে বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বর্তমানে প্রস্তাবিত ‘আরব শান্তি পরিকল্পনা’ গ্রহণ করে, তবে আগামী তিন মাসের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আসা সম্ভব। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মূল কারণ ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হলেই এই সঙ্ঘাতের অবসান ঘটবে।’
হোয়াইট হাউজে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পর্যায়ের এক বৈঠকের পর লেবানন ও ইসরাইল তাদের যুদ্ধবিরতি তিন সপ্তাহ বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার তিনি ওভাল অফিসে ওয়াশিংটনে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লাইতার ও যুক্তরাষ্ট্রে লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা মোয়াওয়াদের মধ্যে দ্বিতীয় দফার বৈঠকের আয়োজন করেন। দুই রাষ্ট্রদূতের আগের বৈঠকও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হয়েছিল, যেখানে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। ওই বিরতি রোববার শেষ হওয়ার কথা। তার আগেই বৃহস্পতিবার ওই বিরতির মেয়াদ তিন সপ্তাহ বাড়ল। প্রথম দফা যুদ্ধবিরতির মধ্যেও লেবাননে ইসরাইল একাধিক হামলা চালিয়েছে; বুধবারই তাদের হামলায় এক সাংবাদিকসহ অন্তত পাঁচজন নিহতও হয়। ‘চমৎকার বৈঠক হয়েছে। হিজবুল্লাহর হাত থেকে লেবাননকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাথে কাজ করতে যাচ্ছে,’ ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া পোস্টে ট্রাম্প এমনটাই বলেছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া লেবাননের ইরান-সমর্থিত রাজনৈতিক-সামরিক গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ওভাল অফিসের বৈঠকে ছিল না। ইসরাইলি বাহিনীকে ‘দখলদার’ আখ্যা দিয়ে তারা বলছে, ‘দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার’ অধিকার তাদের রয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, নিকট ভবিষ্যতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনকে আতিথেয়তা দিতে তিনি মুখিয়ে আছেন। বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের সাথে নিয়ে ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সাথে কথোপকথনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, তিন সপ্তাহের বিরতি চলাকালে লেবানন ও ইসরাইলের নেতারা আরো বসবেন বলে তিনি আশা করছেন। ‘দুই দেশ এ বছরই একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাবে এমন চমৎকার সম্ভাবনা রয়েছে,’ বলেছেন তিনি। বৈঠকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, ইসরাইলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকেবি ও লেবাননে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিশেল ইসাও উপস্থিত ছিলেন।
প্রথম দফার যুদ্ধবিরতির কারণে লেবাননে সহিংসতার পরিমাণ অনেকখানি কমলেও দেশটির দক্ষিণে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত ছিল। ওই এলাকায় ইসরাইলি বাহিনী স্বঘোষিত একটি ‘বাফার জোনের’ দখলও নিয়েছে। যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজে বৈঠকে যাওয়া রাষ্ট্রদূত মোয়াওয়াদ বৈঠক আয়োজনের জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ দিয়ে বলেছেন, ‘আপনার সহায়তা, সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা আবার লেবাননকে মহান বানাতে পারবো।’ লেবাননের এক কর্মকর্তা এর আগে বলেছিলেন, আলোচনার পরের ধাপে তারা লেবানন ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, ইসরাইলে আটক লেবাননের নাগরিকদের দেশে ফেরানো ও স্থলসীমান্ত চিহ্নিত করার দাবি আদায়ের চেষ্টা করবেন।
অন্য দিকে হিজবুল্লাহর ব্যাপারে লেবানন সরকারের সাথে এক জায়গায় দাঁড়াতে চাইছে তেল আবিব। গত এক বছর ধরে বৈরুত শান্তিপূর্ণ উপায়ে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে চেষ্টা চালিয়ে গেছে। ওভাল অফিসে বৈঠকে ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত লাইতার বলেছেন, হিজবুল্লাহকে নির্মূল কিভাবে করা যায়, আলোচনায় সে ব্যাপারে প্রাধান্য দিতে হবে, ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার নয়।
‘হিজবুল্লাহ ও আইআরজিসির চরদের সাথে যদি খুবই কোমল আচরণ করা অব্যাহত থাকে তাহলে আমাদের পারস্পরিক অভিন্ন লক্ষ্য অর্জন অসম্ভবই থেকে যাবে,’ লাইতার এমনটাই বলেছেন বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটনের ইসরাইল দূতাবাস।
হিজবুল্লাহর সাথে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে সহযোগিতা করবে- এমন প্রশ্নের জবাবে বিস্তারিত উত্তর না দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, ‘লেবাননের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের চমৎকার সম্পর্ক আছে।’ হিজবুল্লাহর আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষায় সক্ষমতা থাকা ইসরাইলের জন্য আবশ্যক, বলেছেন তিনি। তিনি লেবাননকে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগবিরোধী আইনগুলো বাতিল করতেও বলেন।
‘ইসরাইলের সাথে কথা বলা অপরাধ?’ সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ বিরোধী আইন বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। তিনি সম্ভবত এ ধরনের আইন সম্বন্ধে জানতেন না বলেই সেসময় মনে হচ্ছিল। ‘ঠিক আছে, আমি নিশ্চিত যে এটার দ্রুত ইতি ঘটবে। আমি তা নিশ্চিত করবো,’ বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।



