বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যকার বাণিজ্য সম্পর্ক আরো শক্তিশালী ও সহজীকরণের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘ইইউ-এর চিহ্নিত ৬১টি শুল্কবহির্ভূত বাণিজ্য বাধার মধ্যে ৪৮টিরই সমাধান করেছে বাংলাদেশ। অবশিষ্ট বিষয়গুলোও দ্রুত নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
একই সাথে বাংলাদেশের বৃহত্তম রফতানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে আনুষ্ঠানিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি নিয়ে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে।
গতকাল রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসব তথ্য জানান। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও হেড অব ডেলিগেশন মাইকেল মিলার, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিসহ বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, ডেলিগেশন প্রধান মাইকেল মিলার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, বোয়িংয়ের পাশাপাশি ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা এয়ারবাসের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি বাংলাদেশের ‘খুব গুরুত্ব সহকারে’ নেয়া উচিত।
তিনি বলেছেন, আমাদের দৃষ্টিতে, এয়ারবাসের একটি অবিশ্বাস্য প্রতিযোগিতামূলক অফার রয়েছে। এটিকে খুব গুরুত্ব সহকারে নেয়া উচিত এবং আমরা এয়ারবাস ও বিমানের মধ্যে খুব দ্রুত আলোচনা সমাপ্তির প্রত্যাশা করছি।
মাইকেল মিলার বলেন, আমরা সব ক্ষেত্রে একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির অনুরোধ করছি। আপনি যদি কোনো সরকারি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তা যেন বাণিজ্যিক যোগ্যতার ভিত্তিতে নেয়া হয় এবং আমাদের কোম্পানিগুলো যেন যে কোনো দেশের কোম্পানির সাথে তাদের সাধ্যমতো সর্বোত্তম প্রতিযোগিতা করতে পারে।
অন্যদিকে, বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর গত মার্চ মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য পরিচালনায় বিদ্যমান কিছু নির্দিষ্ট প্রতিবন্ধকতার বিষয় তুলে ধরে। এরপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুততম সময়ে এসব সমস্যার বড় অংশের সমাধান করা হয়েছে।
সমাধান হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে- শতভাগ বিদেশী মালিকানাধীন লজিস্টিক কোম্পানির লাইসেন্স নবায়ন সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন। বাণিজ্যিক স্যাম্পল আমদানির বার্ষিক সীমা ১০ হাজার মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি করে ২০ হাজার মার্কিন ডলারে উন্নীতকরণ। রফতানি পণ্যের ট্রেসিবিলিটি নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত স্ক্যানিং স্মার্ট কার্ডের শুল্কায়ন জটিলতা দূরীকরণ এবং যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ।
বাংলাদেশের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেয়ার উদ্যোগ সম্পর্কে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাতিসঙ্ঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি ও অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ-এর সুপারিশ ইতিবাচকভাবে এসেছে। আগামী জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শক্তিশালী সমর্থন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের পর ইউরোপীয় কমিশন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন হলে চলতি সপ্তাহ থেকেই এ বিষয়ে যৌথ কারিগরি আলোচনা শুরু হতে পারে।
তিনি বলেন, উভয় পক্ষের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরো গভীর করতে হলে একটি স্বচ্ছ, স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা বজায় থাকলে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয়ই লাভবান হবে।
এ সময় তিনি বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিমান চলাচল ও বাণিজ্য সহযোগিতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে এয়ারবাস ক্রয় সংক্রান্ত আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেয়ার বিষয়েও আশাবাদ প্রকাশ করেন।
জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আমদানি সিদ্ধান্ত
যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সবসময় জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এবং জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে আমদানি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। জ্বালানি (এলএনজি) ও খাদ্যশস্য আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, পণ্যের গুণগত মান এবং অপচয়ের হার বিশ্লেষণ করেই সরকারি ক্রয় কমিটি সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে থাকে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রভাব দ্বারা পরিচালিত নয়; বরং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণই সব সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি।



