সিরাজনগর বিল : বর্ষায় জলভাণ্ডার শীতে পাখির ঠিকানা

হাবিবুল বাশার
Printed Edition
  • প্রায় ১০০ বিঘা জলাভূমি দখল ও পানিপ্রবাহ বন্ধের অভিযোগ;
  • মাছ চাষে কমছে পরিযায়ী পাখি

রাজধানী ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের তারানগর ইউনিয়নের সিরাজনগর গ্রামের পাশে প্রায় ১০০ বিঘা এলাকাজুড়ে বিস্তৃত সিরাজনগর বিল। বর্ষায় এ বিল পরিণত হয় বিস্তীর্ণ জলরাশিতে। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে বিলের বিভিন্ন অংশে শুরু হয় ধান, পাট ও শাকসবজির চাষ। আর শীত এলেই জলাভূমিটি হয়ে ওঠে দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির আশ্রয়স্থল।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, পরিযায়ী পাখির বিচরণ রয়েছে এমন বিলগুলো চিহ্নিত করে সংরক্ষণের আওতায় আনতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত লিজ বন্ধের পাশাপাশি পাখি শিকার ও পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আইন কার্যকর করতে হবে। একই সাথে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে বিলের নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। উন্নয়নের নামে জলাশয় ধ্বংস না করে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা যেমন একাডেমিক সিটি, কলাতিয়া, নতুন বাজার, নাজিরপুর ও বটতলীসহ আশপাশের এলাকার পানি বর্ষায় বিলটিতে প্রবেশ করে। পানি কানায় কানায় পূর্ণ হওয়ার পর শুষ্ক মৌসুমে ধীরে ধীরে কমে যায়। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই বিলের মৌসুমি জলচক্র চলছে।

শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে বিলের বিভিন্ন অংশে কৃষিকাজ শুরু করেন স্থানীয় কৃষকেরা। ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল চাষ হয় সেখানে। ফলে একই জলাভূমি বছরের এক সময়ে মাছের আবাসস্থল, অন্য সময়ে কৃষিজমি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তবে বিলটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় সময় শীতকাল। স্থানীয়দের মতে, এ সময় সাদা বক, হাঁস, পানিকৌড়িসহ বিভিন্ন দেশীয় পাখির পাশাপাশি পরিযায়ী পাখিরও আনাগোনা দেখা যায়। শীত মৌসুমে বিলজুড়ে পাখির উপস্থিতি দেখতে আশপাশের মানুষও ভিড় করেন।

দখল ও পানিপ্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ

স্থানীয় বাসিন্দা মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘একসময় সিরাজনগর বিলটি কালীগঙ্গা নদীর একটি শাখা ছিল। পরে এটি উন্মুক্ত জলাশয় হিসেবে ব্যবহৃত হলেও গত কয়েক বছর ধরে সরকারি লিজের মাধ্যমে সেখানে মাছ চাষ করা হচ্ছে।’ তার অভিযোগ, বিভিন্ন স্থানে মাটি ফেলে বিলের অংশ দখল করায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আগে প্রতি বছর বন্যার পানি এলাকায় প্রবেশ করলেও বর্তমানে পানি প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত বর্ষায় স্থানীয়রা সমস্যায় পড়েন।

মহিদুল ইসলামের দাবি, একসময় বিলে অতিথি পাখির আনাগোনা আরো বেশি ছিল। এখনো পাখি আসে, তবে মাছ চাষের কারণে গত দুই-তিন বছরে পাখির সংখ্যা কিছুটা কমেছে। মাছের পোনা রক্ষায় মাছচাষিরা পাখি তাড়াতে মাঝেমধ্যে শব্দবোমা ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

কেরানীগঞ্জ মডেলের একজন ইউনিয়ন কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, সিরাজনগর বিলটি একসময় অনেক বড় ছিল। তার দাবি, বর্তমানে মানুষের দখল ও চার পাশে চাপ পড়ে বিলটি অনেক ছোট হয়ে গেছে। তিনি, বিলটির আয়তন ১০০ বিঘারও বেশি হতে পারে। আগে বিলের একপাড় থেকে অন্যপাড়ে যেতে নৌকায় ৪০ মিনিট এবং বিল পার হতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগত বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, এক সময় বিলটির একদিকে ধলেশ্বরী ও অন্য দিকে বুড়িগঙ্গার সাথে সংযোগ ছিল। মফিজুর রহমান পলাশের নামে দীর্ঘ সময় বিলটি লিজ ছিল বলেও জানান তিনি। পরে কিছু মুক্তিযোদ্ধারা মিলে এটি নিয়ে নেন এবং বর্তমানে তাদের লিজের মেয়াদ চৈত্র মাসে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। বিলটি সীমানা নির্ধারণ করে সংরক্ষণ করা গেলে এলাকার উন্নয়ন এবং স্থানীয় জেলেদের জন্য উপকার হতো বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, এতে নৌকা চলাচলসহ পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারত।

লিজ কতটা পরিবেশবান্ধব?

পরিবেশবাদী সংগঠন নোঙর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সুমন শামস বলেন, পরিযায়ী পাখিরা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শীত মৌসুমে বাংলাদেশে আসে। দেশের বিল, হাওর ও জলাশয় তাদের খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। কিন্তু মাছ চাষ, পর্যটনসহ বিভিন্ন কাজে এসব জলাশয় লিজ দেয়ার ফলে পাখির আবাসস্থল ও জলজ প্রতিবেশব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ছে।

তিনি বলেন, লিজ নেয়ার পর মাছের উৎপাদন বাড়াতে অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফিড, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এতে পানির স্বাভাবিক পরিবেশ ও পাখির খাদ্যশৃঙ্খল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি জলজ উদ্ভিদ ও নলখাগড়া পরিষ্কার, নেট-জাল দিয়ে বিল ঘিরে ফেলা, উচ্চ শব্দ ও নৌযানের চলাচল পাখির বিচরণে বাধা সৃষ্টি করে। পাখি শিকারও এ ক্ষেত্রে বড় হুমকি।

সুমন শামস বলেন, বিলের গুরুত্ব শুধু পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল হিসেবে নয়; মাছ, ব্যাঙ, জলজ উদ্ভিদসহ বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবেও এর ভূমিকা রয়েছে। একই সাথে বন্যার পানি ধারণ, পানি পরিশোধন ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে বিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব জলাশয়ের ওপর স্থানীয় মানুষের জীবিকাও নির্ভরশীল।

তিনি বলেন, কেরানীগঞ্জের সিরাজনগরসহ আশপাশের বিলগুলো ঢাকার কাছাকাছি হওয়ায় এর পরিবেশগত গুরুত্ব আরো বেশি। নগরায়ণ, দখল ও ভরাটের পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত লিজের কারণে এসব বিলের অস্তিত্ব ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিল হারিয়ে গেলে পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ঢাকার আশপাশের প্রাকৃতিক পানি ধারণের সক্ষমতাও কমে যাবে।

বর্ষায় পানি ধরে রাখা, শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং শীতে পরিযায়ী পাখিকে আশ্রয় দেয়া-সিরাজনগর বিলের এই বহুমুখী ভূমিকা কেবল স্থানীয় মানুষের সম্পদ নয়, নগরঘেঁষা পরিবেশেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই বিলটির ব্যবহার ও সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।