শহরে বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে অন্ধকারে থাকছে গ্রামের মানুষ। যদিও সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে যে তথ্য দেয়া হচ্ছে তার সাথে বাস্তবতার কোনো মিল খুুঁজে পাচ্ছেন না কেউই। বিদ্যুতের এই সঙ্কট গত কয়েক সপ্তাহ থেকে আরো বেশি প্রকট হয়েছে। এ দিকে মাত্র দুই দিন পর থেকেই শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এই অবস্থায় গ্রামের পাড়া মহল্লাতেও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। পরীক্ষার আগে এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে পরীক্ষার্থী বা অন্য শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক শিক্ষার্থী তাদের অনলাইনে পড়াশোনা করতে পারছে না। একই সাথে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল শিক্ষা এবং ইন্টারনেটনির্ভর শিক্ষাও চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অবশ্য বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। এর আগে বিভিন্ন অনুষ্ঠান এমনকি জাতীয় সংসদের মন্ত্রী নিজেই বিদ্যুতের স্বাভাবিক সরবরাহের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রামাঞ্চলের মানুষ। শহরের তুলনায় গ্রামে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং অব্যাহত থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, কৃষি উৎপাদন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ১৩ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু জ্বালানি সঙ্কটের কারণে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি থাকছে। দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ঘাটতির কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
সূত্র বলছে গ্রীষ্মে লোডশেডিংমুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রতিদিন ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে গড়ে ৯০ কোটি ঘনফুট। এতে শুধু গ্যাসের ঘাটতির কারণেই প্রায় ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। একই সাথে কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের সরবরাহ সঙ্কটে বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রও পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারছে না। এ দিকে আগামী ২ জুলাই থেকে সারা দেশে একযোগে শুরু হচ্ছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। পরীক্ষার ঠিক আগ মুহূর্তের এই সময়টাতে বিদ্যুতের সঙ্কটের সবচেয়ে বড় শিকার গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যা ও রাতের পড়ার সময় বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় এসএসসি, এইচএসসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় দিনে ৮-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় চার্জলাইট কিংবা মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা করতে হচ্ছে।
সরকারি হিসাবে বিদ্যুতের ঘাটতি
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিবি) পিএলসির হিসাবে তিন সপ্তাহ ধরে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার গড়ে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। বৃষ্টি না হলে এ সপ্তাহে চাহিদা আরো বাড়বে। তখন বাড়তে পারে লোডশেডিংও। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তাদের নির্দেশনায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন করে পিজিবি। আর ছয়টি বিতরণ সংস্থা গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ দেয়, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। এ তিনটি সংস্থার তথ্য বলছে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। যদিও জ্বালানি সঙ্কটে উৎপাদন হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অথচ চাহিদা সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পিজিবির তথ্য বলছে, প্রতিদিন রাত ১০টার পর থেকে বাড়তে থাকে লোডশেডিং। কিছুদিন ধরে রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং করা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পরও প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। এরপর শুক্রবার রাত ১২টায় লোডশেডিং হয় দুই হাজার ২৭৫ মেগাওয়াট। রাত ১টায় এটি বেড়ে হয় ২ হাজার ২৮৪ মেগাওয়াট। গত শনিবার দিনের বেলায়ও প্রায় এক হাজার ৭০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে।
গ্রামে লোডশেডিং বেশি
সূত্র বলছে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে আরইবির এলাকায়, অর্থাৎ গ্রামাঞ্চলে। কোনো কোনো গ্রাম এলাকায় দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কয়েক বছর ধরেই মধ্যরাতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তি থাকছে। যদিও এ সময় কমার কথা। সারা দেশে রিকশার ব্যাটারির চার্জের কারণে এটি হতে পারে। এর সাথে এবার যুক্ত হয়েছে ফুটবল বিশ্বকাপ। অধিকাংশ ম্যাচ হচ্ছে রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত। এ সময় রাত জেগে খেলা দেখার কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি হচ্ছে। কিন্তু ওই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানো হয়। এতে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
আরইবির অন্য একটি সূত্র বলছে, শুক্রবার ভোররাত ৪টায় শেরপুরে ৫৬ শতাংশ লোডশেডিং করতে হয়েছে। ৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে তারা সরবরাহ পেয়েছে মাত্র ২৭ মেগাওয়াট। গতকাল বিকেল ৫টায় বাগেরহাটে পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৭০ মেগাওয়াট, সরবরাহ পেয়েছে ৪১ মেগাওয়াট। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রামগুলোতে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ। গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। নিয়মিত ফোন করে অসন্তুষ্টির কথা জানাচ্ছে। গ্রাহকদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি মানানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে কোথাও দিনে সাত থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি সময় লোডশেডিং হচ্ছে। নেত্রকোনার এক গ্রাহক জানিয়েছেন তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। ময়মনসিংহে এক রাতে চাহিদা ছিল ৮৭ মেগাওয়াট, সরবরাহ পেয়েছিল ৪৮ মেগাওয়াট; দিনাজপুরে যেখানে চাহিদা ৩৩ মেগাওয়াট, সরবরাহ হচ্ছে ১৮-২০ মেগাওয়াট। এসব আলাদা আলাদা ঘটনা একত্র করলে বোঝা যায়, গ্রামে গ্রামে চাহিদার অর্ধেক সময়ও তারা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। আর বিদ্যুৎ না পাওয়াই যেন এখন সেখানে নিয়মে পরিণত হয়েছে।
বিপাকে পড়েছেন পরীক্ষার্থীরা
দেশব্যাপী চলমান এই বিদ্যুৎ সঙ্কটে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্কুল কলেজ এবং এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। এ ছাড়া অভিভাবকদের অনেকের সাথেই কথা বলে জানা গেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুতের লোডশেডিং ও অনিয়মিত সরবরাহের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে গ্রামের শিক্ষার্থীরা। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় ও মাত্রা বেশি হওয়ায় নিয়মিত পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। সন্ধ্যার পর দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত আলো না পেয়ে পড়তে পারছে না। পরীক্ষার প্রস্তুতি, অনলাইন ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি এবং ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহারে তারা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।



