বিশেষ সংবাদাতা
দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের (পোলাওজাতীয় চাল) চাহিদা ও দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। কয়েক মাস আগেও প্রতি কেজি সুগন্ধি চাল ১৬০-১৭০ টাকা করে বিক্রি হয়েছে। এখন সেই চাল কেজি-প্রতি কিনতে হচ্ছে মান ভেদে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা করে। ধারণা করা হচ্ছেÑ একশ্রেণীর মিল মালিক ও ব্যবসায়ীর কারসাজির কারণে সুগন্ধি চালের দাম এত বেড়ে গেছে। এই প্রেক্ষপটে এই চাল রফতানিতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। আগে অনুমোদন দেয়া রফতানি কোটা পুনর্বিবেচনা করে তা কমানো বা সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
এ ল্েয রফতানির অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃতপে কী পরিমাণ সুগন্ধি চাল বিদেশে পাঠিয়েছে, সে তথ্য আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রফতানি-২ শাখা থেকে জারিকৃত চিঠিতে এ নির্দেশনা দেয়া হয়।
এতে বলা হয়, সুগন্ধি চালের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আগে দেয়া রফতানির অনুমোদনের পরিমাণ হ্রাস বা সমন্বয় করা প্রয়োজন। এ জন্য অনুমতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে তাদের প্রকৃত রফতানির পরিমাণের বিস্তারিত তথ্য রফতানি-২ শাখায় জমা দিতে হবে।
মূলত যেসব প্রতিষ্ঠান অনুমতি পাওয়ার পরও নির্ধারিত পরিমাণ সুগন্ধি চাল রফতানি করতে পারেনি কিংবা আংশিক রফতানি করেছে, তাদের অব্যবহৃত কোটা পুনর্বিবেচনার আওতায় আসতে পারে।
এর আগে ২ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কে সুগন্ধি চালের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে চালের উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা, বাজার পরিস্থিতি ও রফতানির প্রকৃত চিত্র পর্যালোচনা করা হয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রথম দফায় ১৩ মে ২১১টি এবং দ্বিতীয় দফায় ৬৭টিসহ মোট ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৪৫ হাজার ২৭০ টন সুগন্ধি চাল রফতানির অনুমতি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ২ আগস্টের সভায় জানানো হয়, অনুমতি পাওয়া অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী চাল রফতানি করতে পারেনি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আংশিক রফতানি করেছে।
ফলে অনুমোদিত কোটা ও প্রকৃত রফতানির মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এ কারণেই প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রকৃত রফতানির হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করছে মন্ত্রণালয়।
ব্যবসায়ীদের প থেকে দাবি করা হয়, দেশের শীর্ষ ১০টি বড় মিল মালিকের কাছে বিপুল পরিমাণ সুগন্ধি চাল মজুদ রয়েছে। বাজারে প্রয়োজন অনুযায়ী চাল না ছেড়ে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করার কারণেই মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে বলে অভিযোগ তাদের।
সব পরে বক্তব্য পর্যালোচনার পর বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রবণতা ঠেকাতে কঠোর তদারকির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরণ অধিদফতর ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে সাথে নিয়ে বাজার মনিটরিং আরো জোরদার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
একই সাথে রফতানির অনুমতি পেয়েও যারা নির্ধারিত পরিমাণ সুগন্ধি চাল বিদেশে রফতানি করতে পারেনি, তাদের অব্যবহৃত কোটা বহাল রাখার যৌক্তিকতাও পর্যালোচনা করবে সরকার। এ জন্যই জরুরি ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রকৃত রফতানির তথ্য চাওয়া হয়েছে।
এসব তথ্য যাচাইয়ের পর অনুমোদিত রফতানি কোটা কমানো বা সমন্বয়ের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এর মাধ্যমে এক দিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে সুগন্ধি চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অন্য দিকে প্রকৃত সম রফতানিকারকদের সুযোগ অব্যাহত রাখার মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছে সরকার।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সুগন্ধি চাল রফতানি করে ২৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার আয় হয়েছিল। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২০ লাখ ৬০ হাজার ডলারে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই আয় আরো কমে ১০ লাখ ৭০ হাজার ডলারে নেমে আসে। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকার সুগন্ধি চাল রফতানির অনুমতি স্থগিত করে।
জানা গেছে, বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান যুক্তরাজ্য, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনেই, দণি কোরিয়াসহ বিশ্বের ১৩০টির বেশি দেশে এ চাল রফতানি করে আসছে।


