মধ্যপ্রাচ্য সঙ্ঘাতে অর্থনীতিতে ৮ ঝুঁকি

দীর্ঘ যুদ্ধে অর্থনৈতিক স্থিতি নাজুক হবে

ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান যুদ্ধ আগামী এপ্রিল মাস পর্যন্ত গড়ালে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরো নাজুক করে তুলতে পারে। ভতুর্কির ব্যয় মেটানোর জন্য আগামী অর্থবছরে (২০২৬-২০২৭) বাজেটের শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাখাতে সরকারের কাক্সিক্ষত বরাদ্দকে সঙ্কুুচিত করে তুলবে। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সরকারকে অনেকটা বাধ্য হয়ে ভতুর্কি ও সুদখাতে আরো বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হবে। আর এতে করে আগামী অর্থবছরে বাজেটে ঘাটতি অর্থায়ন করার জন্য সরকারের ঋণ তিন লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) পুরোটা ঋণ করে বাস্তবায়ন করতে হবে।

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
Printed Edition

ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান যুদ্ধ আগামী এপ্রিল মাস পর্যন্ত গড়ালে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরো নাজুক করে তুলতে পারে। ভতুর্কির ব্যয় মেটানোর জন্য আগামী অর্থবছরে (২০২৬-২০২৭) বাজেটের শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাখাতে সরকারের কাক্সিক্ষত বরাদ্দকে সঙ্কুুচিত করে তুলবে। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সরকারকে অনেকটা বাধ্য হয়ে ভতুর্কি ও সুদখাতে আরো বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হবে। আর এতে করে আগামী অর্থবছরে বাজেটে ঘাটতি অর্থায়ন করার জন্য সরকারের ঋণ তিন লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) পুরোটা ঋণ করে বাস্তবায়ন করতে হবে।

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি যুদ্ধ দেশের অর্থনীতির ওপর আটটি ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে। এ যুদ্ধ চলমান থাকলে আমাদের পণ্য আমদানি খরচ, বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও সারের আমদানিতে ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। এর ফলে দেশে পণ্যমূল্যে বাড়বে, বাড়বে মূল্যস্ফীতি। মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রফতানি কমে যাবে, এর একটি নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে পরবে প্রবাস আয়ের ক্ষেত্রে, কমে যাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। জ্বালানি তেলের স্বল্পতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হবে, যার প্রভাব পড়বে ব্যবসা-বাণিজ্যর ওপর, সার আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়া এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এ যুদ্ধ। এর ফলে আগামী অর্থবছর বাজেটে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে।

এ দিকে, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকে ঘিরে চলমান অস্থিরতা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে খাঁদে ফেলতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা-পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ। শুধু তাই নয়, দেশকে কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

ইরান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে তিনি এক সংলাপে বলেছেন, এ যুদ্ধের কারণে রফতানি, প্রবাসী কর্মসংস্থানে আঘাত আসতে পারে। সরকারের ভর্তুকি বাড়ানোরও প্রয়োজন হতে পারে। ইতোমধ্যে জ্বালানিতে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

মাসরুর রিয়াজ আরো বলেন, স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকার টাকা নিতে ব্যয় করতে পারে, কিন্তু ফরেন কারেন্সি কোথায় পাবেন? এটার কোনো সমাধান নাই। ফলে ডলারের ওপর প্রেসার ক্রিয়েট হবে। টাকার মান যদি আবার ২০ বা ৩০ শতাংশে কমে যায়, এটা কিভাবে আটকাবেন?

অর্থ বিভাগসূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। এখন পর্যন্ত আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে আকার ধরা হয়েছে সাড়ে আট লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে এডিপির আকার হবে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বাজেটে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সামাজিক নিরাপত্তাখাতে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু চলমান যুদ্ধের কারণে এসব খাতে কতটুকু বরাদ্দ বাড়ানো সম্ভব হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। কারণ এ যুদ্ধের ফলে সরকার যে বিভিন্নখাতে প্রতি বছর সোয়া লাখ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয় তার পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও এলএনজিখাতে ভতুর্কি বেড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে ইচ্ছে থাকা স্বত্ত্বেও জনকল্যাণমূলকখাতে আগামী অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দ কাক্সিক্ষত পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব হবে না।

এ দিকে, নতুন করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজি দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ভর্তুকির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগে দুই কার্গো এলএনজি আমদানি করতে ব্যয় হয়েছে এক হাজার কোটি টাকা। এখন সে দুই কার্গো এলএনজিই স্পট মার্কেটে আমদানি করতে দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। এভাবে আরো অন্তত ছয় কার্গো এলএনজি দ্বিগুণের বেশি দাম দিয়ে এখন পর্যন্ত কেনা হচ্ছে। এই এলএনজির সিংহভাগই ব্যবহৃ হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন প্ল্যান্টে।

এখন দেশের বাজারে যদি জ্বালাানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি না করা হয় তবে এ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বছর শেষে যে অনেক বেড়ে যাবে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। দাম বাড়ানোর বিষয়ে এখুনি সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেবে কি না তা বলা যায় না। কারণ, গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি আট থেকে ১০ শতাংশের ঘরে রয়েছে। এ অবস্থায় যদি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয় তবে মূল্যস্ফীতি তো বাড়বেই, উপরন্তু সব ধরনের গণপরিবহনের ভাড়া বেড়ে যাবে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ বিভিন্ন জিনিসপত্রের দামও বেড়ে যাবে। আরো বাড়বে মূল্যস্ফীতি। তাই সরকার এ মুহূর্তে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর বিষয়ে নীতিগত একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। তখন জ্বালানির ওপর আমদানি শুল্ক কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় আনা হবে বলে জানা গেছে।

এ দিকে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৩০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৮.৫ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে, যা গত দুই বছরের মধ্যে সর্র্বোচ্চ।