পুরনো ছকে পাট গবেষণায় নিয়োগবাণিজ্য!

লিখিত পরীক্ষায় অসঙ্গতি তুলে ধরে তদন্তের দাবিতে কমিটির সদস্যের চিঠি

আওয়ামী সরকার পতনের পর প্রথম নিয়োগ পরীক্ষা হওয়া সত্ত্বেও বিজেআরআইয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

কাওসার আজম
Printed Edition

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিজেআরআই) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (এসও) নিয়োগ পরীক্ষা আবারো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। গত ২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত গ্রেড-০৯ ভুক্ত বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শূন্য পদে নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর স্বয়ং নিয়োগ কমিটির এক সদস্য লিখিতভাবে গুরুতর অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁসের আশঙ্কা ও ফলাফল মূল্যায়নে অসঙ্গতি তুলে ধরেন। ফলে আওয়ামী সরকার পতনের পর প্রথম নিয়োগ পরীক্ষা হওয়া সত্ত্বেও বিজেআরআইয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

নিয়োগ কমিটি-১-এর সদস্য ও বিজেআরআইয়ের পরিচালক (সিএসপি) ড. মাহমুদ আল হোসেন নিয়োগ কমিটির সভাপতির (মহাপরিচালক) কাছে দেয়া লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, তিনি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র প্রণয়ন কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত ছিলেন এবং পুরো প্রক্রিয়া অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে শেষ করা হয়। প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং কমিটির সদস্যরা পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিকেল ৪টা পর্যন্ত মোবাইল ফোনবিহীন অবস্থায় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন কক্ষে অবস্থান করেন। তবুও লিখিত পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে তিনি একাধিক ঘটনা ‘অত্যন্ত সন্দেহজনক ও রহস্যজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ৬০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর এসেছে ৫৫। প্রতিযোগিতামূলক সরকারি চাকরির পরীক্ষায় এত বেশি সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া সাধারণত অস্বাভাবিক এবং এতে প্রশ্নপত্র আগাম জানার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। পাশাপাশি পরীক্ষার সিট ও কক্ষ বণ্টনেও বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখা গেছে বলে অভিযোগ করা হয়। মোট ৬৮টি কক্ষে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও লিখিত পরীক্ষায় ৮৮ জন পরীক্ষার্থী কৃতকার্য হন। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজের কক্ষ নম্বর ১০৪ থেকে ১৫ জন এবং লালমাটিয়া সরকারি মহিলা কলেজের কক্ষ নম্বর ৪৫১ থেকে সাতজন পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হন, যা স্বাভাবিক গড়ের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি।

গুরুতর অভিযোগ হিসেবে আরো বলা হয়, পরীক্ষা শুরুর আগেই কিছু পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষার হলের গেটের কাছে মোবাইল ফোন থেকে তথ্য নিতে দেখা গেছে। পরবর্তী সময়ে ওই তথ্য বিভিন্ন পরীক্ষার্থীর মোবাইল ফোনে ছড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া ‘খ’ বিভাগে ১০ নম্বর প্রশ্নের ক্ষেত্রে ভুল উত্তর থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট কয়েকজন পরীক্ষার্থী সেই একই ভুল উত্তর লিখেছেন, যা প্রশ্নপত্র ফাঁস বা আগাম তথ্য পাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। অথচ যারা সঠিক উত্তর লিখেছেন, তারা সেই প্রশ্নের পূর্ণ নম্বর পাননি, যা মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তোলে।

ড. মাহমুদ আল হোসেন তার অভিযোগে এসব অনিয়ম তদন্তের জন্য গোয়েন্দা সংস্থা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তার ভাষায়, প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হলে ভবিষ্যতে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ও সম্ভাব্য জালিয়াতির দায় থেকে সংশ্লিষ্ট সবাই মুক্ত থাকতে পারবেন এবং কৃষি সেক্টরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সিন্ডিকেটের মুখোশ উন্মোচিত হবে।

আওয়ামী সরকার পতনের পর বিজেআরআইয়ে এটিই ছিল প্রথম নিয়োগ পরীক্ষা। ফ্যাসিস্ট আমলে এই নিয়োগের প্রথম সার্কুলার প্রকাশিত হলেও ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার পুনরায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। দীর্ঘ দিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিজেআরআইসহ বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও দফতরে নিয়োগবাণিজ্যের অভিযোগ ছিল ব্যাপক। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রশ্নপত্র ফাঁস, ফলাফল প্রভাবিত করা, মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর কারসাজি এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠে আসে। বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণীর পদে নিয়োগে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের সরকারের সময় যেসব ব্যক্তি ও চক্র নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ছিলেন, তাদের বড় একটি অংশ এখনো বর্তমান নিয়োগব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত। বর্তমান নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিজেআরআইয়ের মহাপরিচালক ড. নার্গীস আক্তার এবং সদস্যসচিব হিসেবে রয়েছেন পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) ড. মো: ইয়ার উদ্দিন সরকার। ফলে নতুন সরকারের আমলেও যদি একই কাঠামো ও ব্যক্তিদের মাধ্যমে নিয়োগ পরিচালিত হয়, তাহলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রত্যাশা নিয়ে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বিজেআরআইয়ের এই নিয়োগ পরীক্ষাকে একটি ‘পরীক্ষা’ হিসেবেই দেখছিলেন চাকরিপ্রার্থীরা। কিন্তু সেই পরীক্ষায় এবার স্বয়ং নিয়োগ কমিটির একজন সদস্য অনিয়মের অভিযোগ তোলায় প্রশ্ন উঠেছে- বিজেআরআই কি সত্যিই আগের নিয়োগবাণিজ্যের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে, নাকি পুরনো সিন্ডিকেটই নতুন মোড়কে সক্রিয় রয়েছে?

এ বিষয়ে বিজেআরআইয়ের পরিচালক (সিএসপি) ড. মাহমুদ আল হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, বিএআরসির প্রতিনিধিসহ মোট আটজন নিয়োগ কমিটিতে ছিলাম। এসও পদে ১২ জন স্থায়ী ও একজন অস্থায়ী পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। এর মধ্যে স্থায়ী পদে ৮৮ জন এবং অস্থায়ী পদে সাতজন উত্তীর্ণ হন। স্থায়ী পদে এক কক্ষ থেকে ১৫ জন এবং আরেক কক্ষ থেকে সাতজন উত্তীর্ণ হওয়া নিয়ে আমার সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়াও আরো কিছু বিষয় আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এসব আমি নিয়োগ কমিটির সভাপতিকে জানিয়েছি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত তারাই নেবেন। এ বিষয়ে নিয়োগ কমিটির সদস্যসচিব ও পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) ড. ইয়ার উদ্দিন সরকারকে ফোন দিলেও রিসিভ করেননি।