পর্যালোচনা করছে ওয়াশিংটন

ইরানের ৩০ দিনের আলটিমেটাম

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৪ দফার একটি নতুন শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান। তেহরান এই প্রস্তাবকে ‘বাস্তবিক’ আখ্যা দিয়ে তা বিবেচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ৩০ দিন সময় বেঁধে দিয়েছে। এই সময়সীমার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি, অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়ার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রস্তাবে এক মাসের মধ্যে একটি কাঠামোগত চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। এর মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইরান ও লেবাননে যুদ্ধের অবসান, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই প্রাথমিক চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরো এক মাস আলাদা পর্যায়ে আলোচনা শুরু হবে।

এ দিকে তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের ৯ দফা প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে ইরান। এতে মূল গুরুত্ব দেয়া হয়েছে যুদ্ধের অবসানের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রস্তাবে দুই মাসের যুদ্ধবিরতির কথা বললেও, ইরান জোর দিয়ে বলেছে- সব সমস্যার সমাধান ৩০ দিনের মধ্যেই করতে হবে। তেহরানের মতে, কেবল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো নয়, বরং সরাসরি যুদ্ধ শেষ করার দিকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত।

পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান জানিয়েছে, বিষয়টি আলাদা পর্যায়ে আলোচনা করা যেতে পারে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক বার্তায় বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন মেনে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অধীনে পারমাণবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইরান। একই অবস্থান জাতিসঙ্ঘের অধিবেশনেও তুলে ধরছেন ইরানের প্রতিনিধি আলী বাহরেনি।

প্রস্তাব পর্যালোচনায় যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের দেয়া নতুন শান্তি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি। একই সাথে সতর্ক করে দিয়েছেন, ইরান যদি কোনো ‘অসদাচরণ’ করে, তাহলে আবারো সামরিক পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে।

গত শনিবার সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরান তাদের প্রস্তাবের পূর্ণ বিবরণ পাঠাচ্ছে এবং তিনি তা পরে বিস্তারিত জানাবেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, গত কয়েক দশকে ইরানের কর্মকাণ্ডের তুলনায় তারা এখনো যথেষ্ট মূল্য দেয়নি, ফলে প্রস্তাবটি গ্রহণ করা কঠিন হতে পারে। ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি আবার সামরিক অভিযানের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বলেন, পরিস্থিতি খারাপ হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে।

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজিম গরিবাবাদি বলেছেন, এখন সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের। তারা কূটনীতির পথে এগোবে নাকি সঙ্ঘাত অব্যাহত রাখবে- ইরান উভয় পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ না হলে কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। যদিও তেহরান দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।

যুদ্ধবিরতির শর্ত

ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষ থেকে ইরানে হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা, হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়া এবং ইরানী বন্দরে অবরোধ প্রত্যাহারের শর্তে প্রথম ধাপে যুদ্ধ বন্ধ হতে পারে। পরবর্তী ধাপে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এর বিনিময়ে তেহরানের ওপর আরোপিত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে ইরান।

নতুন প্রস্তাবে আরো যেসব শর্ত রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ভবিষ্যতে কোনো সামরিক আগ্রাসন না চালানোর নিশ্চয়তা, সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার, নৌ-অবরোধ তুলে নেয়া, বিদেশে জব্দ ইরানি সম্পদ ফেরত দেয়া এবং লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে যুদ্ধ বন্ধ করা।

‘খারাপ চুক্তি অথবা ভয়াবহ অভিযান’

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) গোয়েন্দা শাখা বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘ভয়াবহ সামরিক অভিযান’ অথবা একটি ‘খারাপ চুক্তির’ মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে। বিবিসি পার্সিয়ানের তথ্য মতে, সংস্থাটির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য হাতে খুব কম সময় রয়েছে।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, তেহরান দেশের বন্দরগুলোতে মার্কিন সামরিক অবরোধ শেষ করার জন্য একটি সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। একই সাথে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে চীন, রাশিয়া ও ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থানের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।

হরমুজকে ‘কবরস্থান’ বানানোর হুমকি : ইরানের সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার এবং তেহরানের এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজায়ি হরমুজ প্রণালীকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও সৈন্যদের ‘কবরস্থানে’ পরিণত করার হুমকি দিয়েছেন। রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একমাত্র জলদস্যু; যাদের বিমানবাহী রণতরী আছে। জলদস্যুদের মোকাবেলার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে।”

গত মাসে মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান আইআরজিসি ভূপাতিত করার দাবি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আপনাদের রণতরী ও বাহিনীকে কবরস্থানের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি রাখুন; যেমনভাবে আপনাদের বিমানের ধ্বংসাবশেষ ইসফাহানে পড়ে ছিল।”