রোজার শুরুতেই খেজুর-লেবু পেঁয়াজ সবখানেই ঊর্ধ্বগতি

শাহ আলম নূর
Printed Edition

পবিত্র রমজানের প্রথম দিনেই রাজধানীর কাঁচাবাজারে নিত্যপণ্যের দামে নতুন করে ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। ইফতারের অপরিহার্য উপকরণ খেজুর, লেবু, পেঁয়াজ, শসা ও বেগুন সব কিছুর দামই বেড়েছে কেজিতে ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত। বাজারভেদে কোথাও অনেক পণ্যের দাম দ্বিগুণ চাওয়া হচ্ছে। চাহিদা বৃদ্ধির অজুহাত দিলেও সরবরাহে বড় কোনো ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতিতে রোজার শুরুতেই বাড়তি খরচের চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারভেদে দামে পার্থক্য থাকলেও ক্রেতাদের অভিযোগ, রোজা এলেই একশ্রেণীর ব্যবসায়ী চাহিদার সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেন। এ দিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ ঘাটতি, পাইকারি দরের ঊর্ধ্বগতি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে খুচরা বাজারেও প্রভাব পড়েছে।

গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল বাজার, কাওরানবাজার, ধানমন্ডি কাঁচাবাজার, রায়েরবাজার ও গুলশান এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, লেবুর দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। বর্তমানে মোটামুটি মানের প্রতিটি লেবুর দাম ২০ টাকা থেকে শুরু। আকারে বড় ও ভালো মানের একটি লেবু কিনতে গুনতে হচ্ছে ৪০ টাকা। অনেক বাজারে হালিতে (চারটি) বড় লেবু বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৬০ টাকায়। কোনো কোনো দোকানে হালিতে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম চাওয়া হচ্ছে।

মিরপুর-৬ বাজারে সবজি বিক্রেতা আবদুর রহমান বলেন, কাওরানবাজার থেকে প্রতিটি লেবু পাইকারিতে ২৭ টাকা ৫০ পয়সা দিয়ে কিনতে হয়েছে। এখন হালিতে ১৪০ টাকায় বিক্রি করছি। সন্ধ্যার দিকে কম দামে ছাড়তে হয়, তাই এখন একটু বেশি রাখতে হচ্ছে। তিনি জানান, রোজার আগে-পরে কয়েক দিন লেবুসহ কিছু পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়, তখন দামও বাড়ে।

এ দিকে শুধু লেবু নয়, শসা ও বেগুনের বাজারও চড়া। শসা কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো দোকানে দাম ১৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। সপ্তাহ দুই আগেও ৭০-৮০ টাকায় শসা মিলেছে বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা। বেগুনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। গোল ও লম্বা বেগুন কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোথাও ১৩০-১৪০ টাকা, আবার কোথাও ১৪০-১৬০ টাকা পর্যন্ত দাম। এক সপ্তাহ আগেও ভালো মানের বেগুন ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে জানান বিক্রেতারা।

দুয়াড়িপাড়া বাজারে ব্যবসায়ী নূর মোহাম্মদ বলেন, রোজার শুরুতে অনেকে একসাথে বেশি পণ্য কেনেন। এতে চাহিদা বাড়ে, পাইকারিতেও দাম বাড়ে। খুচরায় সেই প্রভাব পড়ে। তবে কয়েক দিন পর চাহিদা কমলে দামও কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। বর্ধিত পল্লবীর বাসিন্দা শামসুল হক বলেন, রোজা এলেই বাজারে আগুন লাগে এ অনেক পুরনো রীতি। দুই সপ্তাহ আগে ৮০ টাকায় শসা কিনেছি, এখন ১৫০ টাকা চাইছে। আগে ১২০ টাকায় এক ডজন লেবু পেয়েছি, এখন এক হালিই ১২০ টাকা।

ইফতারের আরেক অপরিহার্য পণ্য খেজুরের বাজারেও অস্বস্তি বেড়েছে। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের খেজুরের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে সাধারণ ও মধ্যবিত্তের কাছে জনপ্রিয় জাহিদি খেজুরের। গত বুধবার যে জাহিদি খেজুর ২৮০-৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, প্রথম রোজায় তা ৩৫০ টাকায় উঠেছে। ভালো মানের জাহিদি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকায়, যা গত বছর ছিল ৩৫০ টাকা।

এ দিকে নিম্নআয়ের মানুষের জনপ্রিয় ‘বস্তা’ খেজুরের দামও দুই দিনের ব্যবধানে ২০-৩০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ২৫০-২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর একই মানের খেজুর ১৮০-২২০ টাকায় পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা। অন্যান্য খেজুরের মধ্যে সুরমা ৩৬০-৪০০, বরই ৪৮০-৬৫০, ছড়া ৫৫৫-৬০০, দাবাস ৬০০-৬৫০, সুদাই ৭৫০-৮০০, কালমি মরিয়ম ৮৫০-৯০০, মাবরুম মরিয়ম ৮৫০-৯৫০, সুকারি ৯২০-৯৫০, আজওয়া ৯৫০-১০০০, ইরানি মরিয়ম ১২৫০-১৪০০ এবং প্রিমিয়াম মেডজুল ১৬৫০-১৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

মতিঝিলে খেজুর কিনতে আসা মোহাম্মদ বিল্লাল বলেন, গত সপ্তাহে ২৮০ টাকায় জাহিদি কিনেছি, আজ ৩৫০ টাকা। এত দ্রুত দাম বাড়লে তো খেজুর না খেয়ে থাকতে হবে। ইফতারে খেজুর রাখা সুন্নত, সেটি নিয়েও যদি এমন কারসাজি হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের বলার কিছু থাকে না। তিনি বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপ চান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে বছরে খেজুরের চাহিদা ৯০ হাজার থেকে এক লাখ টন, যার মধ্যে রমজানেই প্রয়োজন হয় ৬০-৮০ হাজার টন। বর্তমানে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি খেজুর মজুদ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। খেজুর আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করায় আমদানি বেড়েছে। তবে সম্প্রতি থাইল্যান্ডের সাগরে বাংলাদেশগামী ১৫০ কনটেইনার খেজুর ডুবে যাওয়ার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীদের একটি অংশ এই গুঞ্জনের সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ দিকে পেঁয়াজের বাজারও স্থিতিশীল নেই। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেড়ে বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকারে ছোট পেঁয়াজ ৫৫ টাকায় মিললেও ভালো মানের পেঁয়াজ ৬০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। বিক্রেতারা বলছেন, মৌসুমের শেষ দিকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় ও পরিবহন খরচ বাড়ায় দাম বেড়েছে। রমজানকে কেন্দ্র করে পাইকারিতেও চাহিদা বেড়েছে।

পেঁয়াজ বিক্রেতা আবদুল হালিম বলেন, গত দুই-তিন দিন ধরেই দাম বাড়ছে। মোকামে কয়েক দফা দাম বেড়েছে। খুচরায় সমন্বয় করা ছাড়া উপায় নেই। তবে ক্রেতারা এ ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। কিবরিয়া আহমেদ নামে এক ক্রেতা বলেন, গত সপ্তাহে ১০০ টাকার নিচে দুই কেজি পেঁয়াজ কিনেছি, গতকাল ১২০-১৩০ টাকা চাইছে। রোজা এলেই ব্যবসায়ীরা পকেট কাটার ধান্দায় থাকেন।

এ দিকে ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা কমেছে। সপ্তাহ দুই আগে ১৬০-১৭০ টাকা থাকা ব্রয়লার বুধবার ২০০-২২০ টাকায় উঠেছিল। গতকাল কেজিতে ১০-২০ টাকা কমে ১৯০-২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে সোনালি মুরগির দাম ৩২০-৩৫০ টাকাতেই স্থির রয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজান এলেই বাজারে নজরদারি শিথিল হয়। এতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা করেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি কমে যাওয়া, সরবরাহে বিঘœ ও বাড়তি চাহিদার কারণে দাম বাড়ছে। তবে ভোক্তারা বলছেন, বাজারে পণ্যের ঘাটতি নেই; তার পরও কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে।

রাজধানীর বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রথম রোজাতেই নিত্যপণ্যের এমন চড়া দামে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটে চাপ বেড়েছে। অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম কিনছেন, কেউ আবার কিছু পণ্য না কিনেই ফিরছেন। বাজারে ভিড় থাকলেও ক্রেতাদের মুখে হাসি নেই। তাদের প্রত্যাশা সরকারি সংস্থাগুলো কঠোর মনিটরিং জোরদার করলে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে অন্তত রমজানের বাকি দিনগুলোতে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।