রোদবৃষ্টি মোহাম্মদ আব্দুল্লা হেল বাকী

Printed Edition
রোদবৃষ্টি  মোহাম্মদ আব্দুল্লা হেল বাকী
রোদবৃষ্টি মোহাম্মদ আব্দুল্লা হেল বাকী

নাইম সাহেব যুক্তরাজ্যে থাকেন প্রায় ৪০ বছর ধরে। যুক্তরাজ্যের কামব্রিয়া কাউন্টির লেক ডিস্ট্রিক্ট এলাকায় থাকেন। সেখানকার এক ছোট্ট গ্রাম কেসউইকে তার শৈল্পিক বাড়ি। নিটোল প্রকৃতির কাছে। ওপরে উদাস আকাশ। পাশে টলটলে পানির লেক। উঁচু-নিচু পাহাড়। পুরনো পাথরের ঘর,সবুজ মাঠ, নদী, বন- কী নেই সেখানে! প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি। কত দেশের কত পর্যটক এখানে ঘুরতে আসে! এখানকার নদী পাহাড়ের রূপ দেখে মানুষের মন ভরে যায়। প্রতি ঋতু এখানে স্বমূর্তিতে উপস্থিত হয়। এমন উদাস করা প্রকৃতিও নাইম সাহেবকে ধরে রাখতে পারে না। প্রতি বসন্তে উনি বাংলাদেশে চলে আসেন শিমুল ফুল দেখতে। তার গ্রামের বাড়ির পেছনে বাঁশবাগানের পাশে দু’টি শিমুল গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বসন্তের শুরুতে যখন ফুল ফোটে, এই ফুলে উনি তার মায়ের হাসি দেখতে পান। এই হাসি দেখতে সুদূর যুক্তরাজ্য থেকে চলে আসেন। এবারো উনি এসেছেন। তার সাথে তার ছোট নাতনী মরিয়ম। সকালের মৃদুমন্দ বাতাসে শিমুলের পাতা এপাশ-ওপাশ নড়ে। পাতায় পাতায় মুচকি হাসির মতো রোদ খেলা করে। নাইম সাহেব গাছের গায়ে হাত রেখে ফুলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনের অজান্তেই দুফোঁটা চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল। নানার চোখে পানি দেখে মরিয়ম হতভম্ব হয়ে গেল। সে জিজ্ঞেস করল, নানাভাই শিমুল ফুল দেখে কাঁদো কেন? মরিয়মের প্রশ্ন শুনে উনি তার জীবনের গল্পের ঝাঁপি খুললেন।

‘আমি তখন ক্লাস টেনে পড়ি। হঠাৎ প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমাকে তাড়াহুড়ো করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখানে একটি কথা বলে রাখা দরকার। আমার মা-বাবার বিয়ের ১২ বছর পর আমার বড় ভাইয়ের জন্ম হয়। বড় ভাইকে মা মাথায় রাখতেন না উঁকুনের ভয়ে,আর মাটিতে রাখতেন না পিঁপড়ার ভয়ে। অতি আদরে বড় হচ্ছিল বড় ভাই। এক শ্রাবণ মাসে মামা বাড়ি বেড়াতে গিয়ে পুকুরে পড়ে মারা যায়। শুনেছি, ভাইকে পারলে আকাশের চাঁদ এনে দেন। অথচ, একটু সাঁতার শেখাননি। সে মারা যায় ১৪ বছর বয়সে। ছোট্ট একটি পুকুরে পড়ে। একটু সাঁতার জানলেই হয়তো এই অঘটন নাও ঘটতে পারত। আমি ছিলাম তার উল্টো। খুব দুরন্ত ছিলাম আমি। খুব ছোট্ট কাল থেকেই যেকোনো গাছে উঠতে পারতাম। সাইকেল চালাতে পারতাম। ¯্রােতস্বিনী নদী সাঁতরে পাড়ি দেয়া আমার জন্য কোনো ব্যাপারই ছিল না। নিয়মের কোনো শিকলই আমাকে বাঁধতে পারত না। আমি ছিলাম বাঁধনহারা। দাপুটে ফুটবলার ছিলাম। সেই বয়সেই ভালো ফুটবলার হিসেবে আমার নাম চার দিকে ছড়িয়ে পড়ল। ভবিষ্যৎ বড় অচেনা, জানা। কে জানত, এমন একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাকে যেতে হবে! আন্তঃবিদ্যালয় ফুটবল খেলায় আমি খেলছিলাম। হঠাৎ মাঠের মধ্যে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ি। হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত ডাক্তার আমাকে মৃত ঘোষণা করেন। আমার মা খুব বিলাপ করে কাঁদছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে মায়ের চোখের পানি শুকিয়ে যায়। আমার বন্ধু বান্ধবরাও কাঁদছিল। শেষে আমার লাশ অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো। গ্রামের বাড়িতে নেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে খবরটা বাড়িতে পৌঁছে গেছে। কবর খোঁড়া সম্পন্ন। অ্যাম্বুলেন্সে আমার পাশে মা বসা। পাথর খোদাই দৃষ্টি নিয়ে বসে আছেন। আমার দুই বন্ধুও পাশে ছিল। গাঁয়ের মেঠো পথে অ্যাম্বুলেন্স চলছে। রাস্তা বেশি ভালো ছিল না। ঝাঁকিতে ঝাঁকিতে আমি নড়ে উঠলাম। সবার দৃষ্টি তীক্ষè হলো আমার ওপর। আমি হাত নাড়ালাম। আমার দুই বন্ধু চিৎকার দিয়ে উঠল ভয়ে। তাদের চিৎকারে আমি চোখ মেলে তাকালাম। আমার মায়ের মুখে অশ্রুভেজা, মলিন হাসি। উ™£ান্ত দৃষ্টি। মনে হচ্ছে কোনো কিশোরী তার হারানো খেলনাটা খুঁজে পেয়েছে। পরক্ষণেই আমাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগলেন। এবার আমি একটু ভড়কে গেলাম। উঠে বসে পড়লাম। আমার উঠে বসা আমার বন্ধুরা মেনে নিতে পারল না। তারা ভয়ে জড়োসড়ো। পারলে চলন্ত অ্যাম্বুলেন্স থেকে লাফ দেয়। একজন তো চিৎকার দিয়ে বলেই ফেলল, ড্রাইভার সাহেব, অ্যাম্বুলেন্স থামান। আমি কোনো কিছু আঁচ করতে পারছি না। আমার মা কেঁদেই যাচ্ছেন। তার চোখে পানি নেই। আমাকে বাড়িতে নেয়া হলো। সাত গাঁয়ের লোক আমাকে দেখতে এলো। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। কোনো কথা বলে না। পরে আমাকে সব জানানো হলো। আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানালাম। দেখলাম, আমার জন্য খুব সুন্দর কবর খোঁড়া হয়েছে। সেই কবরে আমি দুটো শিমুল গাছ লাগিয়ে দিলাম। এই সেই শিমুল গাছ। আমার মা মারা গেছেন তাও প্রায় ১৫ বছর হয়ে গেল। কিন্তু মায়ের সেই হাসিটা এখনো ভুলতে পারি না। সেই হাসির বর্ণনা দেয়ার ভাষাও আমার জানা নেই। যখনই এই শিমুল গাছের ফুলের দিকে তাকাই সেই হাসিটা স্পষ্ট দেখতে পাই। আর এই হাসিটা দেখার জন্য আমি হাজারো মাইল পাড়ি দিতে রাজি।