নয়া দিগন্ত ডেস্ক
গাজা উপত্যকার পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে আগামী ১০ বছরে ৭১ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসঙ্ঘ। সোমবার প্রকাশিত ‘র্যাপিড ড্যামেজ অ্যান্ড নিডস অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলের সামরিক হামলার ফলে অঞ্চলটির মানবোন্নয়ন ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খবর আলজাজিরার।
পুনর্গঠনের প্রথম ১৮ মাসেই জরুরি অবকাঠামো পুনরুদ্ধার, মৌলিক সেবা চালু এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল করতে প্রয়োজন হবে প্রায় ২৬.৩ বিলিয়ন ডলার। মোট অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩৫.২ বিলিয়ন ডলার, আর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি প্রায় ২২.৭ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়াও গাজায় তিন লাখ ৭১ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্ধেকের বেশি হাসপাতাল অচল হয়ে পড়েছে এবং প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত। অর্থনীতি সঙ্কুচিত হয়েছে ৮৪ শতাংশ, আর বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সঙ্ঘাত গাজার উন্নয়নকে প্রায় ৭৭ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাণিজ্য ও কৃষি খাত। জাতিসঙ্ঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন জোর দিয়ে বলেছে যে, গাজার পুনর্গঠন অবশ্যই ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বে হতে হবে এবং শাসনব্যবস্থাকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে স্থানান্তরের উপযোগী কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ৫৬০
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের সামরিক হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ৫৬০ জনে পৌঁছেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে আনাদোলু জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলমান হামলায় আহত হয়েছেন এক লাখ ৭২ হাজারের বেশি মানুষ।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় অন্তত সাতজন নিহত এবং ২১ জন আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেও সহিংসতা থামেনি। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৭৮৪ জন নিহত এবং দুই হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। দক্ষিণ গাজার খান ইউনুস এলাকায় সাম্প্রতিক হামলায় তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন কয়েকদিন আগে বিয়ে করেছিলেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় সমুদ্র উপকূলে ইসরাইলি গুলিতে এক নারী নিহত হয়েছেন। এদিকে, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এখনো শত শত লাশ উদ্ধারের কাজ চলমান রয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পরও হামলা অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে।
পশ্চিমতীরে যৌন নির্যাতন ও ভয়ভীতি প্রদর্শন
পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, নির্যাতন ও ভয়ভীতির নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে জাতিসঙ্ঘের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নিউইয়র্কে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক। খবর আনাদোলু এজেন্সির। নরওয়েজিয়ান শরণার্থী কাউন্সিলের নেতৃত্বে প্রস্তুত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিলিস্তিনিরা নিজেদের ঘরেও নিরাপদ নন। পুরুষ ও কিশোরদের জোর করে কাপড় খুলতে বাধ্য করা, অপমান করা এবং অমানবিক আচরণের শিকার হওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে। সমীক্ষায় অংশ নেয়া বাস্তুচ্যুত পরিবারের ৭০ শতাংশের বেশি জানিয়েছে, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে হুমকি ও যৌন সহিংসতার আশঙ্কাই তাদের এলাকা ছাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। জাতিসঙ্ঘের মানবিক সমন্বয় সংস্থার তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৬ সাল নাগাদ পশ্চিমতীরে আড়াই হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যার মধ্যে এক হাজার ১০০-এর বেশি শিশু। এর ৭৫ শতাংশই বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও চলাচলে বাধার কারণে। প্রতিবেদনটিতে পশ্চিমতীরের পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক মহলের জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
বিস্ফোরক অপসারণে লাগবে দীর্ঘ সময়
গাজা উপত্যকার শহরাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা বিস্ফোরক অপসারণে দীর্ঘ সময় লাগবে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থা। জেনেভায় জাতিসঙ্ঘ কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান মানবিক মাইন অপসারণ কেন্দ্রের পরিচালক টোবিয়াস প্রিভিটেলি। খবর আনাদোলু এজেন্সির। তিনি বলেন, গাজার আবাসিক এলাকায় বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক অবশিষ্ট রয়েছে, যা অপসারণ করা প্রযুক্তিগতভাবে জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ৬০টির বেশি দেশে ১০ কোটিরও বেশি মানুষ মাইন ও অবিস্ফোরিত অস্ত্রের ঝুঁকিতে বসবাস করছে।



