নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর আবারো ইতিবাচক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। টানা তিন কার্যদিবস ঊর্ধ্বমুখী ধারায় এগিয়েছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার। একই সাথে লেনদেন বেড়েছে, অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এ দিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) একাধিক নীতিগত সিদ্ধান্ত বাজারে নতুন আশাবাদ তৈরি করেছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সূচকের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স এখন ৬ হাজার পয়েন্ট স্পর্শের খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
গতকাল লেনদেন শেষে ডিএসইএক্স সূচক ৪৪ দশমিক ৬৯ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৯১১ দশমিক ২৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ১০ দশমিক ২৪ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ২০৭ দশমিক ৩ পয়েন্টে এবং ব্লু-চিপ ডিএসই-৩০ সূচক ১৫ পয়েন্টের বেশি বেড়ে ২ হাজার ২২৭ দশমিক ১০ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। ফলে সূচক এখন মনস্তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ৬ হাজার পয়েন্টের মাত্র ৮৯ পয়েন্ট নিচে অবস্থান করছে।
গতকাল দিন শেষে ডিএসইতে ৩৯৩টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৯টির দর বেড়েছে, ১৩৭টির কমেছে এবং ৫৭টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ দর বৃদ্ধির পাল্লাই ছিল ভারী। লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দিন শেষে মোট ১ হাজার ৬৫১ কোটি ২৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় প্রায় ২৩২ কোটি টাকা বেশি।
এ দিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই ধরনের ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। গতকাল সিএসইতে ৭৮ কোটি ১৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। মোট ২৫২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩৭টির দর বেড়েছে, ৮৯টির কমেছে এবং ২৬টির দর অপরিবর্তিত ছিল। সিএএসপিআই সূচক ৬৭ দশমিক ৪৮ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ৭৭৮ দশমিক ৪৬ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুধু সূচকের উত্থান নয়, বরং লেনদেনের পরিমাণ বাড়া এবং মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারে ক্রয়চাপ বৃদ্ধি পাওয়া বাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা। কয়েক মাস আগেও যেখানে দৈনিক লেনদেন এক হাজার কোটি টাকার নিচে নেমে গিয়েছিল, সেখানে এখন ধারাবাহিকভাবে লেনদেন বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে শিগগিরই দৈনিক লেনদেন দুই হাজার কোটি টাকার ঘরে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ইতিবাচক প্রবণতার মধ্যেই বাজারকে আরো গতিশীল ও আধুনিক করতে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি। গতকাল অনুষ্ঠিত কমিশনের ১০২০তম সভায় দেশের পুঁজিবাজারে স্ক্রিপ নেটিং বা ইন্ট্রাডে ট্রেডিং চালুর নীতিগত সম্মতি দেয়া হয়েছে।
বর্তমানে কোনো বিনিয়োগকারী একটি শেয়ার কিনলে সেটি একই দিনে বিক্রি করতে পারেন না। নতুন ব্যবস্থা চালু হলে একই কার্যদিবসে শেয়ার কিনে বাজার বন্ধ হওয়ার আগেই বিক্রি করা যাবে। আবার দিনের শুরুতে নিজের হিসাবে থাকা শেয়ার বিক্রি করে একই দিন পুনরায় কেনার সুযোগও থাকবে। দিন শেষে মোট কেনা ও বিক্রির পার্থক্য বা নিট অবস্থানের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি সম্পন্ন হবে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত পুঁজিবাজারে এই ব্যবস্থা বহুদিন ধরেই চালু রয়েছে। বাংলাদেশেও এটি কার্যকর হলে বাজারে তারল্য বাড়বে, লেনদেনের গতি বৃদ্ধি পাবে এবং বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ আরো বাড়বে। বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাদার বিনিয়োগকারীরা নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।
এ দিকে গতকাল কমিশন সভায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫-এর সংশোধনী খসড়া অনুমোদন করা হয়েছে। বিএসইসি জানিয়েছে, সংশোধনীটি শিগগিরই জনমত যাচাইয়ের জন্য জাতীয় দৈনিক পত্রিকা এবং কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে পরে এটি চূড়ান্ত করা হবে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মার্জিন ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজ ও বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ ছিল। বাস্তব পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিধিমালার সংশোধন হলে বাজারে ঋণ ব্যবস্থাপনা আরো কার্যকর হবে এবং অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমবে।
এ দিকে দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় পর কোনো কোম্পানির যোগ্য বিনিয়োগকারীদের (কিউআই) কাছে শেয়ার ইস্যুর প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে বিএসইসি। শতভাগ রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ফুটওয়্যার পিএলসি ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের এক কোটি ২০ লাখ সাধারণ শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ১২ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমোদন পেয়েছে।
বিএসইসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোম্পানিটি সংগৃহীত অর্থ ব্যাংকঋণ পরিশোধ, কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ ক্রয় এবং ইস্যুসংক্রান্ত ব্যয় নির্বাহে ব্যবহার করবে। নতুন কোম্পানির মূলধন সংগ্রহে নিয়ন্ত্রকের ইতিবাচক অবস্থান ভবিষ্যতে ভালো মানের আরো প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত করবে। অন্য দিকে বাজারে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানও নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সম্প্রতি কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই অস্বাভাবিকভাবে শেয়ারদর বাড়ায় ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স এবং উসমানিয়া গ্লাসের শেয়ার লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুই কোম্পানির শেয়ারদরের ঊর্ধ্বগতির সাথে তাদের প্রকৃত ব্যবসায়িক অবস্থার সুস্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। সম্ভাব্য কারসাজি, সমন্বিত লেনদেন বা গোপন তথ্যের অপব্যবহার হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ ধরনের নজরদারি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং বাজারকে আরো স্বচ্ছ করবে।
বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সূচকের উত্থানের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার ধারাবাহিক সংস্কারমূলক উদ্যোগ বাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। তবে এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে হলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সুশাসন নিশ্চিত করা, ভালো মৌলভিত্তির নতুন কোম্পানিকে বাজারে আনা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখা জরুরি।
তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকলেও দেশের পুঁজিবাজারে এখন পর্যন্ত তার উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারের দিকে ঝুঁকছেন। চলতি সপ্তাহের বাকি দুই কার্যদিবসেও যদি একই ধারা বজায় থাকে, তাহলে ডিএসইএক্সের ৬ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করা শুধু সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।



