নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র

জাতীয় নিরাপত্তা সমন্বয় কমিটির গেজেট প্রকাশ

পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীর কাছেও রয়েছে। ফলে চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। এরই মধ্যে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠনের পর গত ৩০ এপ্রিল গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার।

এস এম মিন্টু
Printed Edition

  • পুরস্কার ঘোষণার পরও উদ্ধার হয়নি ১৩২১টি আগ্নেয়াস্ত্র
  • অস্ত্র উদ্ধারে দুই সপ্তাহের আলটিমেটাম প্রধানমন্ত্রীর
  • অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধারে সব বাহিনীর তোড়জোড়
  • কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডিজিএফআই, এনএসআইসহ সব শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ৫ আগস্ট থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে গোয়েন্দারা। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের তথ্য অনুযায়ী পুরস্কার ঘোষণার পরও গত ২০ এপ্রিল পর্যন্ত মোট এক হাজার ৩২৩টি অস্ত্র ও দুই লাখ ৫৭ হাজার ১৪৪টি বিভিন্ন গোলাবারুদ উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় ডাকাতি, চাঁদাবাজি, এমনকি হত্যাকাণ্ডে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম আসলেও অস্ত্রগুলো থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র বলে ধারণা করছে গোয়েন্দারা।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীর কাছেও রয়েছে। ফলে চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। এরই মধ্যে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠনের পর গত ৩০ এপ্রিল গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার।

কমিটির একাধিক সূত্র জানায়, সম্প্রতি ওই কমিটি গঠন সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব সদস্যকে আগামী দুই মাসের মধ্যে পুলিশের লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র এবং গোলাবারুদ উদ্ধারের জন্য নির্দেশ দেন। এমন নির্দেশনা পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীর সদস্যরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল র‌্যাব সদস্যরা থানা থেকে লুট হওয়া দুই সেট হ্যান্ডকাফ, একটি বিদেশী পিস্তল, ম্যাগাজিন, অ্যানোমেশন, র‌্যাবের কটি ও ওয়াকিটকিসহ দুই ডাকাতকে গ্রেফতার করেছে।

জাতীয় সমন্বয় কমিটির গেজেট প্রকাশ : কমিটির সভাপতি করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। এই কমিটির সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে। কমিটির মূল স্বমন্বয়কের দায়িত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামকে। এ ছাড়াও সদস্যরা হলেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, সশস্ত্রবাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালক, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদফতরের (এনএসআই) মহাপরিচালক, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেলের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক। এ ছাড়াও কমিটির সহায়তাকারী সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক, বাংলাদেশ ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। গেজেটে প্রকাশ করা হয়, কমিটি কর্তৃক তাদের আহ্বান করা হলে যোগদানের জন্য বলা হয় এবং কমিটির চাহিদা মোতাবেক প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়।

প্রকাশিত গেজেটে উল্লেখ করা হয়, জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত সেলের সদস্য হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, কাউন্টার টেরোরিজম ট্রানসন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এবং এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারকে সদস্য করা হয়েছে।

গত ৩০ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে গেজেটে স্বাক্ষর করেন অতিরিক্ত সচিব (কমিটি ও অর্থনৈতিক) মো: হুমায়ুন কবির।

গেজেটে তিনি আরো উল্লেখ করেন, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত সব ধরনের সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র, সংস্থা ও অনলাইন প্লাটফর্মগুলো নিয়মিতভাবে তদারকির ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তদনুযায়ী গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাধন ও নির্দেশনা প্রদান করা। কমিটির সভা প্রতি তিন মাসে বা প্রতি মাসে ন্যূনতম একবার অনুষ্ঠিত হবে। কমিটি প্রয়োজন ও ক্ষেত্র বিবেচনায় সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী/সংস্থার প্রধান বা অন্য কোনো কর্মকর্তাকে কমিটিতে সদস্য/সহায়তাদানকারী কর্মকর্তা হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কো-অপ্ট করতে পারবে।

কমিটির সচিবালয় : গেজেটে উল্লেখ করা হয়, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদফতর (এনএসআই কর্তৃক কমিটির সচিবালয় সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোগত সুবিধা প্রদান করা হবে। তবে কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সভাপতির নির্দেশক মোতাবেক পরবর্তীতে অন্য যেকোনো গোয়েন্দা সংস্থা/আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী/সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত মেয়াদে কমিটির সচিবালয়ের দায়িত্ব পালন করতে পারবে। এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে গেজেটে উল্লেখ করা হয়।

থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদ : পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানিয়েছে, ৫ আগস্ট ও তার পরে থানা থেকে পাঁচ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র লুট করা হয়। এর মধ্যে চায়না রাইফেল রয়েছে এক হাজার ১১৪টি তার মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে এক হাজার দু’টি। উদ্ধার বাকি রয়েছে ১১২টি। দেশী রাইফেল ১২টির মধ্যে ১১টি উদ্ধার করা হয়েছে। চায়না এসএমজি ২৫৩টার মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ২২২টি উদ্ধার করা হয়েছে বাকি ৩১টির কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। চায়না এলএমজির ৩৪টির মধ্যে ৩১টি উদ্ধার হয়েছে। চায়না পিস্তল ৫৩৯টির মধ্যে ৩৩৩ উদ্ধার হলেও ২০৬টির হদিস পাওয়া যায়নি।

৯.১৯ পিস্তল এক হাজার ৯২টির মধ্যে ৬৪৫টি উদ্ধার করা হয়েছে উদ্ধার বাকি রয়েছে ৪৪৭টি। এসএমপি/এসএমটি ৩৩টির মধ্যে সবগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। ১২ বোরের শর্টগান দুই হাজার ৭৯টির মধ্যে এক হাজার ৬৯৩টি উদ্ধার করা গেলেও এখনো ৩৮৬টি অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি। এ ছাড়াও গ্যাস গান (সিঙ্গেল শট) ৫৮৯ টার মধ্যে ৪৬১টি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এখনো উদ্ধার বাকি ১২৮টি। গ্যাস লাঞ্চার (সিক্স শট) ১৫টির মধ্যে আটটি উদ্ধার এবং সিগন্যাল পিস্তল ৩টির মধ্যে একটি উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী থানা থেকে লুণ্ঠনের ঘটনায় ছয় লাখ ১৩ হাজার ১৫৮টি বিভিন্ন বোরের গুলিসহ মোট ছয় লাখ ৫২ হাজার আটটি গোলাবারুদ খোয়া যায়। এর মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে তিন লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৮টি। এখনো উদ্ধার বাকি রয়েছে দুই লাখ ৫৭ হাজার ১৪৪টি গোলাবারুদ।

ডিএমপির হিসাব অনুযায়ী জুলাই আন্দোলনে মোট লুণ্ঠিত অস্ত্র এক হাজার ৮৯৮টি এ যাবৎ মোট উদ্ধার করা হয়েছে এক হাজার ২৬২টি।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে অপরাধীদের কাছে নিত্যনতুন আগ্নেয়াস্ত্র আছে। এর মধ্যে থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্রগুলো ব্যবহার করে রাজনীতি এবং রাজধানীসহ দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাচ্ছে। সরকারকে এখনি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার জোরালো ভূমিকা না নিলে সামনে কোরবানির ঈদে চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ গরুরহাটে চাঁদাবাজি এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অস্ত্রের ব্যবহার বাড়বে।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, শুধু পুলিশই নয় সব বাহিনীর সদস্যদের থানা থেকে লুট করা অস্ত্র গোলাবারুদ উদ্ধারের তৎপরতা বেড়েছে। তা না হলে এত অস্ত্র উদ্ধার হতো না। বাকি অস্ত্রগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।