কালেমার দাওয়াত

Printed Edition
কালেমার দাওয়াত
কালেমার দাওয়াত

আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন

আমরা সবাই জানি দাওয়াত দানের মূলমন্ত্র আমাদের কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ সা:। এই কালেমাই সব নবী রাসূলগণ শত শত বছর থেকে দাওয়াত দিয়ে এসেছেন। এই কালেমা একদিকে অনেক ছোট বাক্য অপর দিকে অনেক ভারী বা ওজনি গুরুগম্ভীর যা শুধু অনুধাবনের বিষয়।

এটি প্রচার প্রসারের লক্ষ্যে যদি কাউকে বলা হয়, যে আপনি আমাদের মুসলমানদের কালেমা বলুন বা গ্রহণ করুন। তিনি হাসতে হাসতে বলতেই পারেন ওহ কালেমা! জানি তো, হয়তো পড়েও শুনাবেন। তারপর কি মনে করবেন ব্যস তিনি মুসলমানও হয়ে গেছেন। বিষয়টি কি এমনই? না বন্ধু না এখানে শুরু। যে এর গভীরতা বুঝে, এর মর্ম তত্ত্ব তথ্য বুঝে সে কখনোই এটাকে হালকা মনে করবে না। শুনেছি স্বাধীনতার সময় পাকিস্তানিদের হাত থেকে বাঁচার জন্য বহু হিন্দু কালেমা বলে, সুরা ফাতেহা বলে বেঁচে গেছেন। তাহলে এখন একটু জানতে চাই একজন পাদ্রী বা ঠাকুরের কাছে গিয়ে যদি বলেন যে, ভাই আমাদের কালেমাটা একটু বলুন। তিনি কি ওই সাধারণ লোকটির মতো মুখে কালেমা উচ্চারণ শোনাবেন? কখনোই তা মুখে নেবেন না। কারণ তিনি জানেন এর লোড কত।

এই কালেমার ধার এত বেশি যে, কখনো কখনো এই কালেমার কারণে যুদ্ধ বেধেছে, এর কারণে আপন পর হয়ে যায়। মাতা-পিতা, বাস্তুভিটা, চাকরি, কর্ম, সব হাতছাড়া হয়ে যায়। এমনকি জীবনও হুমকির মুখে পড়ে। এই সেই কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। এর অর্থ কোনো ইলাহ নেই আল্লাহ ছাড়া, কোনো মাবুদ নেই আল্লাহ ছাড়া। এই ইলাহ আর মা’বুদের অর্থও ব্যাপক। ইলাহ অর্থ সৃষ্টিকর্তা, আইনদাতা, হুকুমদাতা, ভাগ্যদাতা, রিজিকদাতা, সম্মানদাতা, ভালো-মন্দ দাতা, জন্ম-মৃত্যু দাতা, দৃশ্য-অদৃশ্য সব কিছুর দাতা হলো এই ইলাহ। তাহলে আপনি যখন কায়মনোবাক্যে স্বীকার করে নিলেন, আমি জেনেশুনে সজ্ঞানে ইলাহকে বরণ করলাম। তখন থেকে আপনি এই ইলাহকে মনেপ্রাণে ইচ্ছায় অনিচ্ছায়, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মেনে নিতে হবে এবং তার উপরে কাউকে প্রাধান্য দিতে পারবেন না। কেননা আল্লাহ বলেছেন, ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ এবং ইচ্ছা করলেই অন্য কোনো মতকে প্রাধান্যও দিতে পারবেন না। কেননা আপনার গলায় ইসলাম নামক শেকল বাঁধা আছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, এসব জেনে বুঝেও কেন মানুষ এই কালেমার পতাকাকে গ্রহণ করে এবং দলে দলে এসে জড়ো হয়? এর অনেক উত্তর আছে।

অন্যতম উত্তর হলো-এই কালেমায় যে আইন বিধান বা নিয়ম আছে তাতে কোনো মানুষ কখনো ঠকেনি ও ঠকবে না, ধোঁকার কোনো কাজ এখানে নেই। কোনো মিথ্যা প্রতারণার আশ্রয় নেই। এখানে আছে সত্য আর সত্য। এই সত্য যে গ্রহণ করবে সে বিন্দুমাত্র টেনশনে থাকবে না, সে এক মুহূর্তের জন্যও চিন্তিত হবে না এবং পেরেশানির মধ্যেও পড়বে না। এই কালেমার অধীনে যে এসেছে সে শান্তি পেয়েছে। শান্তির ছায়াতলে থাকলে কেউ কি অশান্তি খোঁজে? ইসলাম শব্দের অর্থ শান্তি। তাই এই ধর্মের, এই কালেমার নাম পরশ পাথর। এই কালেমার দাওয়াত যে পায় সে কখনো এটা ছাড়তে চায় না।

মানুষ যেমন মাতৃগর্ভে ছিল এটা নিশ্চিত হলো কি করে? সে তো তার অবস্থা জানে না। পরবর্তী প্রজন্মদের দেখে বিশ্বাস করে। তেমনি সব মানুষের জন্য আরো একটি জগত আছে মৃত্যুর পরে, সেটাও মুসলিমরা বিশ্বাস করে। আর সেখানে এই জগতের সব কর্মের ভালো মন্দের যাররা পরিমাণেরও বিচার হবে সেটাও বিশ্বাস করে। ফলে এই ধর্মকে সবাই যেমন ভালোবাসে তেমনি ভয়ও করে। কেউই ইচ্ছাকৃত কোনো ভুল অন্যায় অবিচার নির্যাতন করে না। যে সমাজ ইসলামের দাওয়াত মেনে নেয় সেই সমাজে সবাই সবার ভাই বন্ধু আপনজন হয়ে ওঠে। আপনজনের মধ্যে কোনো ঝগড়া মারামারি কাটাকাটি হানাহানি নেই। তার মানে সেখানে বিরাজ করে ইসলাম নামক শান্তি।

ইসলাম শান্তির ধর্ম। এর প্রধান কাজ হলো নিজে শান্তি পাবেন, আবার অন্যজনকেও শান্তির দাওয়াত দিতে হবে। এই দাওয়াত যারা গ্রহণ করে তারা নেতৃত্ব চায় না। যারা নেতৃত্ব চায় তাদেরকে নেতৃত্ব দেয় না বরং ছিনিয়ে নেয়। অযোগ্য লোকের হাতে নেতৃত্ব থাকতে দেয় না। যে বেশি ইসলাম মানে সে নেতৃত্ব পায়। যে কম মানে সে নেতার অনুসরণ করতেও বাধ্য হয়। যেহেতু ইসলামে নিজ ইচ্ছার কোনো স্বাধীনতা নেই, আনুগত্য হলো উলিল আমরি মিনকুম। তাই আমরা দেখতে পাই- উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সব আনুগত্য আর আনুগত্য। কর্মীরা করবে নেতার আনুগত্য, নেতা করবে কুরআন হাদিসের আনুগত্য। এতেই নিহিত রয়েছে শান্তি ও কল্যাণ। যারা আনুগত্য করতে অস্বীকার করবে তারা খারিজ।

এমনকি অর্ধেক মানবেন অর্ধেক মানবেন না, তা হবে না। ইসলাম পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের নাম। এজন্য ধন লোভী, ক্ষমতা লোভী বা অন্যান্য দুনিয়ার মোহ লোভীরা কখনো এখানে এসে শান্তি পাবে না। এখানে ইলমেরও প্রয়োজন আছে। ইলমের আলো থাকতে হয়। ইলম না থাকলে এই শৃঙ্খলা সম্পর্কে কিছুই জানবে না। এই ইলমের কথা কুরআনেও আছে। হাদিসেও আছে। প্রত্যেক নরনারীর ওপর ইলম অর্জন করা ফরজ বা অবশ্যই কর্তব্য।

এই ইলম হলো আলো। এই ইলমের আলোতে যারা আলোকিত তারা এই আলোকে ছড়িয়ে দিতে চায়। দাওয়াতি কাজ করে আপামর জনসাধারণের ঘরে ঘরে। এই আলো যারা সহ্য করতে পারে না তারা এই দাওয়াতের বিরোধিতা করে। সব নবী রাসূলের দাওয়াতি কাজে বাধা দেয়ার কথা আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন। স্বয়ং মহানবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা:-এর দাওয়াতি কাজে বাধা দেয়া হয়েছে। তাঁকে আহত করা হয়েছে। তবুও তিনি এই মিশন থেকে দূরে সরে যাননি। তাঁর দাওয়াতের মূল টার্গেট ছিল রাষ্ট্রে আল্লাহর হুকুমাত কায়েম করা। আল্লাহর সৃষ্টি করা পৃথিবী তথা গোটা জগত, সব প্রাণী, সব বস্তু, সব জগৎ তাঁর আদেশে চলবে এই হলো তাঁর নির্দেশ। তাঁর নির্দেশ পালনে সদা প্রস্তুত সেই দাওয়াত গ্রহণকারী আলোকিত মানুষ। পৃথিবী যতদিন থাকবে, কুরআন ততদিন থাকবে। কুরআন যতদিন থাকবে এই দাওয়াতি কাজও থাকবে, সব মানুষের দাওয়াতি কাজের ফলাফলে একদিন দুনিয়ায় সবাই ইসলামকে পছন্দ করবে। সবার পছন্দের ফলে ইসলামী শাসনের পক্ষে সবাই ভোট দেবে আর ইসলাম কায়েম হয়ে যাবে। এভাবে মদিনার বর্বর জাতিকে যেমনি সোনালি যুগ উপহার দেয়া হয়েছিল, সেভাবে দাওয়াতের মাধ্যমে গোটা দুনিয়া সোনালি শাসনের অধীনে চলে আসবে।

এই দাওয়াত সব নবী রাসূল দিয়ে গেছেন। তাঁদের সবার মিশন একটিই ছিল; তা হলো আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করা। সব মুসলমানের উচিত কালেমার ব্যাখ্যাসহ এর দাবি জেনে বুঝে শুনে নেয়া তাহলে ইসলামের সুমহান আদর্শ সবাইকে শান্তির ছায়া দান করবেন।

লেখক : সাবেক অধ্যাপক ও প্রবন্ধকার