- উত্তর গাজায় আবারো হামলায় শিশু-কিশোরসহ নিহত ৩
- যুদ্ধের প্রভাবে ইসরাইলি সেনাদের আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে
গাজা উপত্যকায় ইসরাইল ও হামাসের মধ্যকার যুদ্ধ অবসানে এবং পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রম তদারকির জন্য ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। গত শুক্রবার হোয়াইট হাউজের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, এ উচ্চপর্যায়ের বোর্ডে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে থাকছেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
বোর্ড অব পিস ও ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এ বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। বোর্ডে ‘প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী সদস্য’ হিসেবে থাকছেন ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার। এ ছাড়াও বোর্ডের নির্বাহী কমিটিতে রয়েছেন বিশ্বব্যাংকের প্রধান অজয় বাঙগা, শীর্ষ বিনিয়োগকারী মার্ক রোয়ান এবং সাবেক মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট গ্যাব্রিয়েল। ট্রাম্প এ বোর্ডকে ‘বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বোর্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর মূল লক্ষ্য হলো গাজার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং ট্রাম্প ঘোষিত ‘২০ দফা পরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন করা।
গাজার প্রশাসনিক কাঠামো ও নিরাপত্তা গাজা পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে ১৫ সদস্যের একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটি ‘দ্য ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ (এনসিএজি) ঘোষণা করা হয়েছে। পশ্চিমতীরের সাবেক ডেপুটি মিনিস্টার আলী শাথ-এর নেতৃত্বে এ কমিটি গাজার নিয়মিত নাগরিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, বুলগেরিয়ার সাবেক রাজনীতিক নিকোলে ম্লাদেনভ বোর্ডের প্রতিনিধি হিসেবে এ কমিটির সাথে সমন্বয় করবেন।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গাজায় ‘ইন্টারন্যাশনাল স্টাবিলাইজেশন ফোর্স’ (আইএসএফ) মোতায়েন করার পরিকল্পনা রয়েছে। মার্কিন মেজর জেনারেল জ্যাসপার জেফারসের নেতৃত্বে এ বাহিনী ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে। ট্রাম্পের পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে গাজাকে পুরোপুরি অসামরিকীকরণ এবং হামাসসহ সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। স্টিভ উইটকফ সতর্ক করে বলেছেন, হামাস শর্ত মেনে না চললে এর পরিণতি হবে ‘ভয়াবহ’।
ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও অব্যাহত রক্তপাত : কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকলেও গাজায় ইসরাইলি হামলা থামার কোনো লক্ষণ নেই। গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া ও দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১০ বছরের এক কন্যাশিশু এবং ১৬ বছরের এক কিশোর রয়েছে। হামাসের পক্ষ থেকে একে যুদ্ধবিরতির ‘চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। গত অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া কথিত এ যুদ্ধবিরতির পর এ পর্যন্ত অন্তত ৪৬৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এ দীর্ঘ যুদ্ধে গাজায় নিহতের মোট সংখ্যা ৭১ হাজার ২৬০ ছাড়িয়েছে।
পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ ও মানবিক সঙ্কট কায়রোতে এনসিএজি (এনসিএজি) কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও গাজার বাস্তব চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) জানিয়েছে, গাজার ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতেই অন্তত সাত বছর সময় লাগতে পারে। বর্তমানে উপত্যকার ৫০ শতাংশেরও বেশি এলাকা ইসরাইলি দখলে থাকায় পুনর্গঠন প্রক্রিয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তীব্র শীতের মধ্যে লাখ লাখ মানুষ তাঁবুতে দিন কাটাচ্ছেন, যেখানে খাদ্য, পানি ও ওষুধের তীব্র সঙ্কট বিদ্যমান।
ইসরাইলি সেনাদের মানসিক সঙ্কট ও আত্মহত্যা : দীর্ঘস্থায়ী এ যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ইসরাইলি সেনাদের ওপরও। ফ্রান্স-২৪ এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গাজা ও লেবাননে টানা অভিযানে অংশ নেয়া সেনাদের মধ্যে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) এবং আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে সেনাদের মধ্যে পিটিএসডি’র ঘটনা প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ২৭৯ জন ইসরাইলি সেনা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। বিশেষজ্ঞরা একে ‘মানসিক আগ্নেয়গিরি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ ও শিশুদের মৃত্যুর অপরাধবোধ সেনাদের তাড়া করে ফিরছে।
গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে ট্রাম্পের এ উচ্চাভিলাষী রাজনৈতিক পরিকল্পনা যখন টেবিলে ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত সাধারণ ফিলিস্তিনিদের কাছে এর গুরুত্ব সামান্যই। তাদের কাছে বর্তমানে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাবার এবং নিরাপত্তাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।



