আবদুল কাইয়ুম
- যানজট ও বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দায়
- ৫৬ খালের ২৬টিই বিলীন, বন্দী জলাবদ্ধতার ফাঁদে
- পুরান ঢাকা রাসায়নিকের বারুদের নীরব বোমা
দ্রুত নগরায়ণের চাপে রাজধানী ঢাকা এখন নানা সঙ্কটের ভারে জর্জরিত। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্বের নবম বৃহত্তম শহর থাকলেও বর্তমানে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরে উন্নীত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ২০৩০ সাল নাগাদ ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ জনবহুল শহরে পরিণত হবে। কিন্তু এই জ্যামিতিক প্রবৃদ্ধির বিপরীতে সেবার মান ও প্রশাসনিক সক্ষমতা কেবল তলানিতেই ঠেকেনি, বরং একপ্রকার মুখ থুবড়ে পড়েছে। বর্তমানে নগরায়ন এখানে কেবল একটি প্রাণহীন পরিসংখ্যান, যেখানে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ন্যূনতম মানও উপস্থিত নেই।
হারিয়ে যাওয়া ৫৬ খাল ও কৃত্রিম জলাবদ্ধতার অভিশাপ : সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকার রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ কিন্তু ভারী বৃষ্টিপাত নয়; বরং আমাদের অপরিকল্পিত ও বলপ্রয়োগকারী নগরায়ন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৪৩টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) এলাকায় ১০৮টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) এলাকায় ৩৫টি স্থান রয়েছে। ঢাকা ওয়াসা শহরের ৪৮টি এলাকাকে জলাবদ্ধতাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ।
নগর গবেষক খন্দকার গোলাম তাওহিদের গবেষণা থেকে জানা যায়, একসময় ঢাকা শহরে প্রায় ৫৬টি প্রাকৃতিক খাল প্রবাহিত হতো; কিন্তু আজ সেই ৫৬টি খালের মধ্যে ২৬টির কোনো বাস্তব অস্তিত্ব বা নামনিশানা নেই। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঢাকার প্রায় ৪০ শতাংশ ড্রেনেজ-ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। নদী ও ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, গত আট দশকে ঢাকা শহর প্রায় ১২০ কিলোমিটার প্রাকৃতিক খাল হারিয়েছে। এই খালগুলো কখনো পুরোপুরি ভরাট করা হয়েছে, কখনো দখলদারদের কবলে পড়ে সঙ্কুচিত হয়েছে, আবার কখনো ‘বক্স কালভার্ট’ বানিয়ে মাটির নিচে চাপা দেয়া হয়েছে।
রাজউকের আওতাধীন এলাকায় একসময় প্রায় তিন হাজার পুকুর ছিল, যার মধ্যে এখন মাত্র ২২৫টি কোনোমতে টিকে আছে। বুয়েটের পানি ও বন্যাব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের (আইডব্লিউএফএম) মতে, ঢাকায় এখন জলাশয়ের পরিমাণ মাত্র ২ শতাংশেরও কম।
শব্দের তীব্রতায় বধিরতা ও দৃশ্যদূষণের নীরব ক্ষত : শব্দদূষণ ঢাকার নাগরিকদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য আরেকটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইন অনুযায়ী নীরব এলাকায় শব্দের গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৫০ ডেসিবেল, আবাসিক এলাকায় ৫৫ ডেসিবেল এবং বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু হাসপালের সামনেও শব্দের মাত্রা ৮৯ দশমিক সাত ডেসিবেল পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে। বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা (ইউআরপি) বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ৮১টি ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র তিনটি ওয়ার্ডে শব্দের মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও নগর বিশেষজ্ঞ ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, দৃশ্যদূষণ হলো জনস্বাস্থ্য, সড়ক নিরাপত্তা ও নান্দনিকতার জন্য এক নীরব হুমকি, যার মূল কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ন ও দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনা।
জনস্বাস্থ্যের চরম হুমকি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ছোবল : ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ন ও পরিবেশের অবনতি সরাসরি আঘাত হানছে জনস্বাস্থ্যের ওপর। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগ এখন ঢাকার ঘরে ঘরে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে তিন লাখ ২৩ হাজারের বেশি ডেঙ্গু সংক্রমণ এবং রেকর্ড এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর গত বছর প্রায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৪০০ জন। ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বাশার তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও অনিয়মিত পানি সরবরাহের কারণে মানুষ বাসাবাড়িতে বালতি বা পাত্রে পানি জমিয়ে রাখে, যা এডিস মশার বংশবৃদ্ধির মূলকারণ।
বিষাক্ত বাতাসে পুড়ছে ফুসফুস : ঢাকার পরিবেশগত সঙ্কটের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ও দৃশ্যমান হলো এর বায়ুদূষণ। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ু মান পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার বায়ু দূষণের ৮৫ শতাংশ শহরের চারপাশের ইটভাটা, রাস্তাঘাটের ধুলাবালু ও অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ ও যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়া ও নির্গমন। ঢাকার আশপাশের এলাকায় প্রায় দুই হাজার ঐতিহ্যবাহী বা প্রচলিত ইটভাটা সচল রয়েছে, যা প্রতিনিয়ত বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়াচ্ছে। অন্য দিকে সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) সমীক্ষা মতে, বায়ুদূষণজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ বা তারও বেশি মানুষ অকালমৃত্যুর শিকার হচ্ছে। ঢাকার বাতাস আজ কেবল ধূলিময় নয়- এটি পরিণত হয়েছে এক নীরব ঘাতকে।
সবুজের হাহাকার ও কংক্রিটের নির্মম খাঁচা : ঢাকা আজ পরিণত হয়েছে এক ধূসর কংক্রিটের জঙ্গলে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডিএসসিসির মোট ৯৯ দশমিক ২৯ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে মাত্র সাত দশমিক ৯৯ শতাংশ এলাকায় ঘন সবুজ স্থান বা গাছপালা রয়েছে। এটি একটি বাসযোগ্য শহরের জন্য অত্যন্ত নগণ্য। ফলে নাগরিকরা একটু বুক ভরে শ্বাস নেয়ার মতো সবুজ স্থান থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
৭ কিলোমিটারের কচ্ছপ গতি ও ৩৭ হাজার কোটির ক্ষতি : ঢাকার যানজট শুধু নাগরিকদের সময় নষ্ট করছে না, এটি দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বিগত এক দশকে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতিবেগ ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে চরম যানজটের কারণে ঢাকার গড় গতি এখন ৪ কিলোমিটারেরও নিচে নেমে গেছে। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণা মতে, যানজটে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় এবং এর ফলে বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা! এই বিপুল পরিমাণ ক্ষতি ঢাকার দু’টি পূর্ণাঙ্গ মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের ব্যয়ের সমান।
অপরিকল্পিত নগরায়ন ও ঝুঁকিপূর্ণ ভূমি ব্যবহার : ঢাকার অনেক শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র ছাড়াই আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠেছে। বিবিএসের জনশুমারি অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে বাস করছে চার কোটি ৪৪ লাখ মানুষ, এই দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে আবাসন, শিল্প ও বাণিজ্যের জন্য কৃষিজমি ও জলাভূমি ক্রমেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া পুরান ঢাকার সঙ্কীর্ণ অলিগলিতে আবাসিক ভবনের ভেতরেই গড়ে উঠেছে হাজার হাজার দাহ্য রাসায়নিকের গুদাম। একটি সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরান ঢাকায় প্রায় ২৫ হাজার কেমিক্যাল বা রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ১৫ হাজার গুদামের বৈধ ট্রেড লাইসেন্স আছে। এর ফলে বিভিন্ন সময়ে বিস্ফোরণে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। ঢাকার বর্জ্যব্যবস্থাপনা অবকাঠামো নগরায়নের গতির সাথে তাল মিলিয়ে গড়ে ওঠেনি।
নারী, শিশু, প্রবীণ ও ভিন্নভাবে সক্ষমদের জন্য এক নিষ্ঠুর শহর : ঢাকা আজ নারী, শিশু ও প্রবীণদের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল। নিম্নআয়ের নারী কর্মীদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৮৬ শতাংশ নারী গণপরিবহনে হয়রানির শিকার হন। এ ছাড়া ঢাকার ৬৭ শতাংশ নারী সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। শিশুদের খেলার মাঠ ও ও উন্মুক্ত স্থানের অভাবে তারা ঢাকা শহরকে নেতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (পিআইডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, আমাদের নগরের অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত নেতিবাচক চিত্রও সমান্তরালভাবে বিদ্যমান। ফুটপাতে অবৈধ দখলদার আরো বেড়ে গেছে, যার কারণে প্রায় তিন কোটি মানুষ ফুটপাথে নিরাপদে হাঁটার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ঢাকার খাল উদ্ধার ও খনন কর্মসূচির কথা চার দিকে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, খননকাজ চললেও গত ১৫ থেকে ৩০ বছর ধরে যেসব প্রভাবশালী ব্যক্তি এই খালগুলো অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে, তাদের আইনের আওতায় আনার বিষয়ে সরকারের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ আমরা দেখছি না। মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধুমাত্র ‘ফগিং’ বা ওষুধ ছিটানোই যথেষ্ট নয়; বরং ভবনের মধ্যবর্তী প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রাখা এবং শহরের তাপ কমানোর মতো সুদূরপ্রসারী নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমরা মেট্রোরেল বা মনোরেলের মতো বড় বড় মেগা প্রকল্পের কথা শুনছি। অথচ আমাদের সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতের বাহন বাসের মানোন্নয়নে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয় পর্যায়ে বর্তমানে কোনো কাউন্সিলর না থাকায় সাধারণ নাগরিকরা তাদের দৈনন্দিন সমস্যা কিংবা ময়লা অপসারণের মতো জরুরি অভিযোগ জানানোর সুনির্দিষ্ট কোনো জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না। অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, পার্ক কিংবা ঢাকার বিভিন্ন মাঠ আজ বিভিন্ন নামী ক্লাব বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেয়া হচ্ছে। খেলার মাঠগুলো আজ নিছক বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।



