অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
এক সপ্তাহের স্থবিরতা ভেঙে হঠাৎ করেই প্রত্যাশার বাইরে ইতিবাচক আচরণ দেখাল দেশের পুঁজিবাজার। গতকাল রোববার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে সূচক ও লেনদেনে বড় ধরনের উন্নতি ঘটে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে জোরালো আগ্রহের ফলে বাজারে এ অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যায়।
এর আগে টানা কয়েক দিন ধরে দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের অবনতি ও লেনদেনে বড় ধরনের ভাটা চলছিল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, তারল্য সঙ্কট এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে যায়। ফলে বাজার কার্যত স্থবির অবস্থায় ছিল। তবে কোনো নির্দিষ্ট ইতিবাচক খবর ছাড়াই গতকালের বাজার আচরণে হঠাৎ এই পরিবর্তন নজর কেড়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব দ্রুত পরিবর্তিত হয়। কখনো গুজব, কখনো নির্ভরযোগ্য তথ্য আবার কখনো কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই বাজারে বিক্রয়চাপ বা ক্রয়চাপ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে দীর্ঘ মন্দার পর গতকালের এই উত্থান বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গতকাল প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৭৬ দশমিক ২১ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৩৫ দশমিক ১৯ পয়েন্টে। আগের কার্যদিবসে সূচকটি ছিল ৪ হাজার ৯৫৮ দশমিক ৯৮ পয়েন্টে। এর মাধ্যমে ৩৩ কার্যদিবস পর আবারো ৫ হাজার পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করল ডিএসইএক্স। সর্বশেষ গত বছরের ২৭ নভেম্বর সূচকটি ৫ হাজার পয়েন্টের ওপরে ছিল। লেনদেনের শুরু থেকেই কোনো উল্লেখযোগ্য বিক্রয়চাপ না থাকায় সূচক দিনভর ঊর্ধ্বমুখী ছিল। ডিএসইর বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ সূচক যথাক্রমে ২৬ দশমিক ৪১ ও ১৩ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট বেড়েছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) ছিল একই রকম ইতিবাচক চিত্র। সিএসইর প্রধান সূচক সিএএসপিআই ১৮৪ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট বেড়েছে। এ ছাড়া সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচক যথাক্রমে ২৬৬ দশমিক ২৫ ও ১১৫ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে।
দিনের বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে দাপট থাকলেও অন্যান্য খাতের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। সিমেন্ট, সিরামিকস, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক, ওষুধ ও রসায়ন, টেক্সটাইল এবং চামড়া শিল্পখাতের শেয়ারেও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা যায়। বিশেষ করে মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলো আবারো বিনিয়োগকারীদের পছন্দের তালিকায় ফিরতে শুরু করেছে।
ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক। কোম্পানিটির ২৪ লাখ শেয়ার ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকায় হাতবদল হয়। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, যার শেয়ার লেনদেন হয় ১২ কোটি ৪৬ লাখ টাকায়। এ ছাড়া সিটি ব্যাংক, বেক্সিমকো ফার্মা, লাভেলো আইসক্রিম, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, মেঘনা ইন্স্যুরেন্স, যমুনা ব্যাংক ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন লেনদেনের শীর্ষ দশে ছিল।
মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল এপেক্স ট্যানারি, যার দর বেড়েছে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, রহিম টেক্সটাইলস, হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস, রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, রহিমা ফুড করপোরেশন, কর্ণফুলি ইন্স্যুরেন্স ও সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স।
দরপতনের তালিকায় শীর্ষে ছিল ফ্যামিলিটেক্স, যা ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ মূল্য হারায়। ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ দরপতনের শিকার অ্যাপোলো ইস্পাত ছিল এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি। দরপতনে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে মেঘনা সিমেন্ট, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, নুরানি ডাইং, পিএইচপি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, আল আরাফাহ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এস আলম কোল্ড রোল স্টিলস ও ফার ইস্ট ফিণ্যান্স।
বাজার সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ব্যাংক ও বিমা খাতের পাশাপাশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আসন্ন আর্থিক প্রতিবেদন ও লভ্যাংশ ঘোষণার প্রভাব সামনে বাজারে আরো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরবে বলেই মনে করছেন তারা।


