পুঁজিবাজারের ধারাবাহিক দরপতনে দিশেহারা বিনিয়োগকারীরা

সঙ্কট উত্তরণে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

দেশের পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক দরপতন অব্যাহত রয়েছে। আর দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা দরপতন বাজারের বিনিয়োগকারীদের পুঁজির একটি বড় অংশই লোকসানের মুখে। প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা এ লোকসানে একপ্রকার দিশেহারা বিনিয়োগকারীরা। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সক্ষমতার কারণে এ চাপ সামলে নিতে পারলেও ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশই এরই মধ্যে তাদের পুঁজির একটি বড় অংশই হারিয়েছেন। অথচ তাদের জানা নেই সামনের দিনগুলোতে কবে এ সঙ্কটের শেষ হবে। হারানো পুঁজি তারা আদৌ ফিরে পাবেন, নাকি পুঁজির যে সামান্য অবশিষ্ট আছে তাও হারাতে হবে?

বাজার সংশ্লিষ্ট কারো কাছেই এই প্রশ্নের সঠিক কোনো উত্তর জানা নেই। খোদ পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষ ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুঁজিবাজারের সংস্কার ও উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানালেও বাজারের ধারাবাহিক পতনের কারণ উদঘাটন ও এর প্রতিকার নিয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। দুই মাসের ব্যবধানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচকটির অবনতি ঘটেছে ৫৪৭ পয়েন্টের বেশি। আর একই সময় বাজারটির লেনদেন নেমে এসেছে এক হাজার ৬০০ কোটি থেকে ৪৮৬ কোটি টাকায়।

গতকাল মতিঝিলে ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজে গিয়ে দেখা যায় বিনিয়োগকারীদের বেহাল দশা। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত যতক্ষণ বাজার সূচক ঊর্ধ্বমুখী ছিল ততক্ষণ তাদের মনে কিছুটা স্বস্তি দেখা যায়। তাদের প্রত্যাশা ছিল আগের দিনের বড় পতন সামলে নিয়েছে বাজার। এবার ভালো কিছু হবে। কিন্তু এর পরপরই বাজারে বিক্রয়চাপ শুরু হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার পর তা আরো তীব্র আকার ধারণ করে। ফলাফল সেই আগের মতোই। সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনটিও শেষ হলো বড় পতন দিয়ে। দিনের পর দিন একই ঘটনা ঘটতে থাকলেও তা নিরসনে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।

বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, বাজারের সংস্কার ও উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার যেমন প্রয়োজন, তেমনি চলমান সঙ্কট নিরসনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করাও জরুরি। কারণ প্রতিদিনের দরপতনে বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হয়ে গেলে কাদেরকে নিয়ে পুঁজিবাজার টিকে থাকবে। এমনিতেই পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংক ও বেশ কয়েকটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে করা বিনিয়োগের শতভাগই তারা হারিয়ে বসেছেন যেগুলোর কোনোটার জন্যই তারা নিজেরা দায়ী নন। অথচ দুই পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষ ও বিএসইসি যাদের দায়িত্ব ছিল বিনিয়োগকারীদের স্বর্থ রক্ষা তারা বিনিয়োগকারীদের এত বড় লোকসানেও বিনিয়োগকারীদের পাশে দাঁড়ায়নি।

আখতার হোসেন নামের একজন বিনিয়োগকারী নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা কেউ দেয় না। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে ও পরে পুঁজিবাজার নিয়ে অনেক ভালো ভালো কথা বলেছিল। বিনিয়োগকারীদের পুঁজির নিরাপত্তার ওয়াদা দিয়েছিল। এমনকি প্রধানমন্ত্রী পুঁজিবাজারের জন্য বিশেষ সহকারীরও নিয়োগ দিয়েছেন। কিন্তু সরকার গঠনের সাত মাস পার হতে চললেও লোকসানের পাল্লা ভারী করা ছাড়া আর কিছুটা পাননি বিনিয়োগকারীরা। এভাবেই বারবার প্রতারণা করা হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের সাথে।

তিনি আরো বলেন, একসময় হয়তো বাজারে ভালো ভালো কোম্পানি আসবে। কিন্তু ততদিন এ বাজার আর বাজারের বিনিয়োগকারীদের কিছু অবশিষ্ট থাকবে তো?। তিনি মনে করেন, পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত বাজার ঠিক রেখেই সংস্কার ও উন্নয়নের কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া। পুঁজিবাজারে প্রতিদিনই সূচকের উন্নতি ঘটবে এমনকি কেউই আশা করেনা। বাজারে সূচকের উন্নতি যেমন ঘটবে, তেমনি সংশোধনকেও সবাই স্বাগত জানায়। কারণ এর মাধ্যমেই বাজার টেকসই হতে পারে। কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া দিনের পর দিন এমনকি মাসাধিককাল বাজারে সূচকের পতন ঘটতে থাকবে তাও কোনো বিনিয়োগকারী আশা করে না। তাই দুই পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে চলমান সঙ্কটের আশু সমাধানের দিকেই প্রথম নজর দেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৯ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ৪১৮ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার লেনদেন শেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৪৭৯ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৯ দশমিক ১৯ ও ৮ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ১৬১ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট হারায়। ১৪ হাজার ৭১৫ দশমিক ৮২ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে স্থির হয় ১৪ হাজার ৫৫৩ দশমিক ৮৫ পয়েন্টে। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের পতন ঘটে যথাক্রমে ২৭ দশমিক ৪৪ ও ৮৪ দশমিক ৭১ পয়েন্ট। আর এভাবে চলতি সপ্তাহের প্রথম গত দুই দিনেই ডিএসইর প্রধান সূচকটি প্রায় ১৩৭ ও সিএসইর প্রধান সূচকটি ৩১০ পয়েন্টের বেশি হারায়।

গতকাল দুই বাজারের লেনদেনে যে বিষয়টি বেশি নজর কাড়ে তা হলো, ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি। এগুলোর মধ্যে ছিল আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক। সংশ্লিষ্টদের মতে, বড় মূলধনের এসব কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি না ঘটলে গতকাল সূচকের অরো পতন ঘটতে পারত।

গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল টেক্সটাইল খাতের কোম্পানি এনভয় টেক্সটাইলস। ২৫ কোটি দুই লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৩৪ লাখ ৭৭ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকায় ২১ লাখ সাত হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস উঠে আসে লেনদেনের দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, ব্র্যাক ব্যাংক, সায়হাম টেক্সটাইলস, সায়হাম কটন মিলস, ইস্টার্ন ব্যাংক, নিটল ইন্স্যুরেন্স যমুনা ব্যাংক ও রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স।