গ্যাসসঙ্কটে স্থবির অর্থনীতির চাকা প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে লাখো কর্মঘণ্টা

কারখানা, সিএনজি, রেস্টুরেন্ট ও বেকারিতে উৎপাদন ব্যাহত : বাড়ছে বিকল্প জ্বালানির খরচ

শাহ আলম নূর
Printed Edition

গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কটে দেশের শিল্প, পরিবহন, বেকারি, রেস্তোরাঁসহ উৎপাদন ও সেবা খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ক্রমেই ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কারখানা পুরোপুরি বন্ধ, কোথাও উৎপাদন নেমে এসেছে স্বাভাবিক সক্ষমতার ২০ থেকে ৩০ শতাংশে। আবার কোনো কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন চালু রাখতে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কাঠ, ডিজেল বা অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মঘণ্টাও নষ্ট হচ্ছে। দিনের পর দিন মেশিন বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা কারখানায় উপস্থিত থেকেও কাজ করতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতিতে দেশে অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে পড়ছে।

শিল্প খাতে জ্বালানি সঙ্কটের আর্থিক ক্ষতির একটি ধারণা দিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটির হিসাবে জ্বালানি সরবরাহে বিঘেœর কারণে শিল্প খাতে সর্বোচ্চ দৈনিক দুই হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা পর্যন্ত উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। এমনকি কারখানাগুলো গড়ে ৫৫ শতাংশ সক্ষমতায় চললেও দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৭৪ কোটি টাকা হতে পারে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

এ দিকে ডিসিসিআইর হিসাবের বাইরে রয়েছে শ্রমিকদের নষ্ট হওয়া কর্মঘণ্টা, পরিবহন খাতে অতিরিক্ত সময় ও জ্বালানি ব্যয়, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের খরচ, পণ্য নষ্ট হওয়া, উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়া এবং বিদেশী ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারার সম্ভাব্য ক্ষতি। ফলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কটের প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষতি শিল্প খাতের উৎপাদন কমার হিসাবের চেয়েও বড় হতে পারে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত আগস্টে দেশে গ্যাসের সঙ্কট পরিস্থিতি এমন নাজুক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তার চিত্র পাওয়া যায় গ্যাস সরবরাহের পরিসংখ্যানে। আগস্ট মাসে দেশে গড়ে প্রতিদিন দুই হাজার ২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ হয়েছে, যা এক দশকের মধ্যে আগস্ট মাসের সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে সরবরাহ নেমেছিল দুই হাজার ২০ এমএমসিএফডিতে। বর্তমানে সরকারি হিসাবে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় তিন হাজার ৮৬০ এমএমসিএফডি। তবে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত চাহিদা চার হাজার এমএমসিএফডিরও বেশি; অর্থাৎ সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

গ্যাসের এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সঙ্কটের একপর্যায়ে গড়ে ঘণ্টায় প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের নিম্নচাপের পাশাপাশি বিদ্যুৎবিভ্রাটও উৎপাদনকে আরো অনিশ্চিত করে তুলছে। এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে গ্যাসনির্ভর টেক্সটাইল, ডাইং, নিটিং, স্পিনিং ও পোশাক কারখানায়। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, অনেক কারখানায় দিনের একটি বড় অংশ মেশিন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও গ্যাসের চাপ সামান্য বাড়লে মেশিন চালু করা হচ্ছে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার চাপ কমে যাচ্ছে। এতে একটি ব্যাচের উৎপাদন শুরু করেও শেষ করা যাচ্ছে না। মেশিন বারবার চালু ও বন্ধ করার কারণে জ্বালানি ও কাঁচামালের অপচয়ও বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

দেশের শিল্প কারখানাগুলো বড় একটি অংশ রয়েছে নরসিংদী অঞ্চলে। এখানে গ্যাসের তীব্র সঙ্কটে তিন দিন ধরে শতাধিক কারখানা বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্তত ৫০টি কারখানা উৎপাদন চালু রাখতে বিকল্প হিসেবে কাঠ পোড়াচ্ছে। এসব কারখানার প্রতিটিতে দিনে ১০ হাজার টাকার বেশি কাঠের পেছনে ব্যয় হচ্ছে। স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের হিসাবে নরসিংদীর শিল্প খাতে গ্যাসসঙ্কটের কারণে দৈনিক প্রায় ৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে।

এ দিকে কিছু কারখানায় উৎপাদন কমেছে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ১০ শতাংশে ব্যবহার করতে পারছে। এ অঞ্চলের একটি বড় টেক্সটাইল কারখানার ১০টি ইউনিটের মধ্যে সাতটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। আবার একটি কারখানায় যেখানে প্রতিদিন এক লাখ গজ কাপড় উৎপাদন হতো, সেখানে উৎপাদন নেমে এসেছে ৩০ হাজার গজের নিচে। শ্রমিকদের শিফট কমিয়ে দেয়া হয়েছে, অনেকে শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

গ্যাসসঙ্কটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে তৈরী পোশাক খাতে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, একটি কারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে গেলে শুধু উৎপাদনের পরিমাণই কমে না, প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। কারণ শ্রমিকের মজুরি, কারখানা ভবনের ভাড়া, ঋণের কিস্তি, সুদ, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণসহ অধিকাংশ স্থায়ী ব্যয় একই থাকে। এমন পরিস্থিতিতে কম পণ্য উৎপাদনের বিপরীতে একই ধরনের স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হয়। এতে রফতানিমুখী কারখানাগুলো লোকসানের মুখে পড়ছে।

গ্যাসের সঙ্কটে শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন যেমন কমে যাচ্ছে এর সাথে যুক্ত হচ্ছে বিদেশী ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহের ঝুঁকি। উৎপাদন কমে গেলে নির্ধারিত সময়ে অর্ডার সরবরাহ করা কঠিন হয়। এতে ক্রেতাদের কাছ থেকে মূল্যছাড়ের চাপ আসতে পারে, অর্ডার বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গ্যাসের সঙ্কটে শুধু বড় শিল্প নয়, গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কটের অভিঘাত পড়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ও। বেকারি শিল্পে পাউরুটি, কেক, বিস্কুট ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের খরচ গত এক বছরে ২০ শতাংশ বা তার বেশি বেড়েছে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানকে এলপিজি বা অন্য জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ চলে গেলে ওভেনে থাকা পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসসঙ্কটের কারণে শুধু উৎপাদন ক্ষেত্রেই কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে না, পরিবহন খাতেও মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। গ্যাসের সঙ্কটে সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। এতে একই সময়ে কম সংখ্যক ট্রিপ দেয়া সম্ভব হচ্ছে, কমছে চালকদের আয় এবং বাড়ছে যাত্রীদের যাতায়াতের সময়। একই সাথে শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের কর্মস্থলে পৌঁছাতেও দেরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে গ্যাসের সঙ্কট একটি কারখানার ভেতরের সমস্যা না থেকে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে সময়ের অপচয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমইএ) সভাপতি ময়নুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাসের অভাবে কোনো কারখানা বন্ধ থাকলে সেখানে কর্মরত শ্রমিকরা সরাসরি উৎপাদনে অংশ নিতে পারেন না। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বেতন, কারখানার স্থায়ী ব্যয় এবং ঋণের দায় বহাল থাকে। ফলে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার অর্থ শুধু শ্রমিকের কাজ না হওয়া নয়; এর সাথে যুক্ত থাকে উৎপাদন মূল্য, শ্রমের মূল্য, কারখানার সক্ষমতার অপচয় এবং জাতীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব।

তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব ইতোমধ্যে বিভিন্ন সূচকে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে আগস্টের সামগ্রিক পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) জুলাইয়ের ৫৭ দশমিক ৮ থেকে ৭ দশমিক ৯ পয়েন্ট কমে ৪৯ দশমিক ৯-এ নেমেছে। ৫০-এর নিচের পিএমআই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সঙ্কোচনের ইঙ্গিত দেয়। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে উৎপাদন খাতে। আগস্টে উৎপাদন খাতের পিএমআই ১৮ পয়েন্ট কমে ৪৭ দশমিক ৪-এ নেমেছে। নতুন আদেশ, রফতানি আদেশ, উৎপাদন, কাঁচামাল সংগ্রহ, আমদানি ও কর্মসংস্থান- সব উপসূচকেই সঙ্কোচনের চিত্র পাওয়া গেছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগ ধরে রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত। সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ালেই সঙ্কটের সমাধান হবে না; শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহও স্থিতিশীল করতে হবে। একই সাথে এলএনজি আমদানি, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন, সংরক্ষণ সক্ষমতা এবং সরবরাহ অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা দূর করার উদ্যোগ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এমন সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কটে যে ক্ষতি হচ্ছে তার পুরোটা তাৎক্ষণিকভাবে হিসাবের খাতায় ধরা পড়ে না। একটি কারখানা কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকলে শুধু ওই কয়েক ঘণ্টার উৎপাদনই হারায় না; এর সাথে যুক্ত হয় শ্রমিকের নিষ্ক্রিয় সময়, অর্ডার সরবরাহে বিলম্ব, অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়, কাঁচামালের অপচয়, ব্যাংকঋণের চাপ এবং বাজারে প্রতিষ্ঠানের আস্থার ক্ষতি। তাই গ্যাস সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শিল্পের সীমানা ছাড়িয়ে রফতানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর আরো গভীর হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।