ঢামেকে দালালদের উপদ্রব ও তথ্য না পাওয়াই প্রধান সমস্যা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

দালালদের উপদ্রব ও প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়াই সবচেয়ে বড় সমস্যা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের। তা ছাড়া এই হাসপাতালে ডাক্তার বা স্টাফ, কেউ কথা বলতে চান না। বাইরে থেকে আসা রোগী বা তাদের স্বজনদের এই হাসপাতালের অনেক কিছুই অজানা। আর সেই সুযোগটি নিয়ে থাকে এখানে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালরা। তারা নানাভাবে রোগী তাদের স্বজনদের ম্যানেজ করে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায়। ঢামেকে আসা কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনরা বলছেন, এই সমস্যাগুলোর সমাধান হলে এটা হয়ে উঠতে পারে ‘রোগীবান্ধব বেস্ট হাসপাতাল’। তারা বলছেন, সবাই যে একই রকম তাও নয়, কোনো কোনো ডাক্তার, নার্স এতটাই সহায়তা করে থাকেন যা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি।

এমনি একজন রোগীর স্বজন মো: ফারুক হোসেন জানান, তিনি চাঁদপুরের কচুয়া থেকে এসেছেন বোনকে নিয়ে। ডায়াবেটিস ও গ্যাস্ট্রিকের রোগী তার বোন। এলাকার ডাক্তারদের চিকিৎসায় হাড্ডি-কঙ্কালসার অবস্থা থেকে সুস্থ হচ্ছিলেন না। এখানে ভর্তির তিন-চার দিনের মধ্যে অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে। ভর্তি হওয়ার পর অনেকগুলো টেস্ট করাতে হয়। কিন্তু এখানকার কোথায় টেস্ট হয়, কে করে কিছুই জানতাম না। রক্ত নিয়ে মানুষের কাছে জিজ্ঞাসা করে জানতে চাইলেই একজন বললেন, যে সাতটি টেস্ট দেয়া হয়েছে এর একটি মাত্র এখানে হবে, বাকিগুলো বাইরে থেকে করে আনতে হবে। তা ছাড়া এখানকার মেশিন ভালো না, অনেক পুরনো বলে ভালো রিপোর্ট আসে না, বাইরে যেতে হবে।’ তিনি পরিচয় জানতে চাইলে লোকটি নিজেকে এখানকার ডাক্তার বলেন। ঠিক সে সময়, আরেকজনকে দেখিয়ে বলল, ওনার সাথে কথা বলেন, বাইরের ভালো হাসপাতালে নিয়ে যেতে আপনাকে সহায়তা করবে।

ফারুক হোসেন জানান, ওই লোকটা এসে কাগজ দেখে বললো, এখানে এই টেস্টগুলো হয় না। ওই ডাক্তার সাহেবের কথা বিশ্বাস করে নতুন লোকটার সাথে একটা রিকশায় করে ওই হাসপাতালে (প্রকৃতপক্ষে ডায়াগনস্টিক সেন্টার) গিয়ে টেস্টগুলো করতে গেলাম। কিন্তু পরদিন রিপোর্ট নিয়ে এসে দেখালে নার্স বলল, এই টেস্টগুলো এখানেই (ঢাকা মেডিক্যালে) হয় এবং অনেক কম টাকায়। বাইরে থেকে কত টাকা দিয়ে করলাম জানালে নার্স বলেন, ‘আপনি দালালের খপ্পরে পড়েছেন।’ এরপর সব টেস্ট এখান থেকেই করিয়েছি, খুবই কম টাকায়।

ফারুক হোসেন আরো বলেন, আমি মোটামুটি শিক্ষিত হওয়ার পরও দালালের খপ্পরে পড়েছি। কী করলে দালালের উৎপাত হতে মুক্তি পাওয়া যাবে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, হাসপাতালের দৃশ্যমান স্থানগুলোতে ডিজিটাল বিলবোর্ড স্থাপন করে এখানে কী কী টেস্ট হয়, কত টাকায় করা যাবে এটা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে যেন সবাই পড়তে পারে। কোন বিল্ডিংয়ে কী সেবা এবং কোন টেস্টের জন্য কোথায় যেতে হবে সেটাও থাকতে হবে। তাহলে দালালদের অত্যাচার কিছুটা কমতে পারে।

ঢামেক হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের আমজাদ আলী নামে একজন রোগীর সাথে কথা হয়। তিনি এসেছেন কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে। রিকশা থেকে পড়ে পা ভেঙে গেছে। ষাটোর্র্ধ্ব ওই ব্যক্তি বলেন, বেশির ভাগ দায়িত্বরত স্টাফ কোনো কথা বলতে চান না। ডাক্তারদের কাছে কিছু জিজ্ঞাসা করলে নার্সদের দেখিয়ে দিয়ে বলেন, তারা সব বুঝিয়ে বলবে। নার্সের কাছে জিজ্ঞাসা করলে তারা কথাই বলতে চান না। তা ছাড়া সর্বত্র পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগীর কারণে ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়। রোগীদের সাথে স্বজনদেরও থাকতে হয়। অতিরিক্ত মানুষের কারণে পরিচ্ছন্ন থাকে না ওয়ার্ডগুলো। তা ছাড়া কিছু রোগী ও স্বজনদের নিজেদেরও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক কোনো জ্ঞান নেই। সুযোগ পেলে কফ-থুতু ফেলেন। যেখানে-সেখানে কাগজ ফেলে দেন। খাবারও ফেলেন। নিচতলার করিডোরের দেয়ালগুলোতে পানের পিক, কফ-থুতুতে ভর্তি। এখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরও যথেষ্ট অভাব, আর যারা আছেন তারা ঠিকমতো কাজ করেন না। এখানকার টয়লেটে যাওয়া যায় না। রোগীরা নিজেরা পরিষ্কার রাখেন না আবার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সঠিকভাবে পরিষ্কার রাখেন না। আমজাদ আলী বলেন, পরিষ্কার না রাখতে পারলে এখান থেকেই জীবাণু ছড়াবে এবং ছড়াচ্ছে বলেই মনে হয়। আমি আর বেশিদিন থাকব না। ডাক্তারকে বলে রেখেছি, একটু সুস্থ হলেই রিলিজ দিয়ে দিতে।

৬০ দালাল আটক

এদিকে ঢামেক হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে দালাল চক্রের ৬০ সদস্যকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ওষুধ কোম্পানির ১২ জন বিক্রয় প্রতিনিধিও আছেন। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দেড় ঘণ্টায় দালালবিরোধী অভিযান চালিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও পুলিশ। ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো: ফারুক জানান, এই হাসপাতালকে দালালমুক্ত করতে যৌথভাবে এই অভিযান চালানো হয়েছে।