মিডল ইস্ট আই
ইরানের বিপক্ষে চলমান সামরিক অভিযানের কারণে অত্যাধুনিক অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার (ইন্টারসেপ্টর) তীব্র সঙ্কটে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। উদ্ভূত এ পরিস্থিতিকে ‘সঙ্কটজনক সীমার বাইরে’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ন্যাটোর উচ্চপদের কর্মকর্তারা। সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আমেরিকার এ মারাত্মক অস্ত্র ঘাটতির তথ্য উঠে এসেছে।
সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ে পড়েছে মূলত ‘প্যাট্রিয়ট’ মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম, যা মূলত রাশিয়ার তৈরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে অপরিহার্য। ইউরোপে নিযুক্ত এক শীর্ষ আমেরিকান সামরিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, রুশ বাহিনীর কোনো সামগ্রিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানোর সক্ষমতা বর্তমানে তাদের কাছে নেই; এমনকি বিচ্ছিন্ন একক মিসাইল প্রতিরোধ করার সামর্থ্যও মারাত্মকভাবে সীমিত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ ইরান আক্রমণের মধ্য দিয়ে এ বৈশ্বিক সঙ্ঘাতের সূচনা। জুনে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের সাহায্যে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেয়া হলেও গ্রীষ্মজুড়ে পাল্টাপাল্টি আঘাত অব্যাহত থাকে। সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাস মাদুরোকে বন্দী করার সাফল্য ও ইসরাইলের শাসন পরিবর্তনের আশ্বাসে অনুপ্রাণিত হয়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো ইরানেও দ্রুত জয়ের হিসাব কষেছিলেন। তবে ইরান তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলে সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ শুরু করলে আমেরিকান সামরিক বাহিনী বাধ্য হয়ে পূর্ব এশিয়া থেকে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেয়।
মার্কিন সামরিক শক্তির এ আকস্মিক শূন্যতায় ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা শঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ন্যাটো জোটের এ দুর্বল সামরিক কাঠামোর সুযোগ নিয়ে রাশিয়া নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। সার্বিক ঝুঁঁকি বিবেচনা করে সম্প্রতি সিআইএ প্রধান জন র্যাটক্লিফ মস্কো সফর করে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে ন্যাটোভুক্ত কোনো রাষ্ট্রে হামলা না চালানোর বিষয়ে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। অন্য দিকে, ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে হামলার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত সরবরাহকৃত দূরপাল্লার ‘এটাকমস’ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদও প্রায় শেষের পথে বলে এপির প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেয়া হয়। রয়টার্সের পৃথক এক খবরে বলা হয়, ইরান যুদ্ধে আমেরিকান বাহিনী তাদের সারফেস-টু-সারফেস উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র, বিশেষ করে এটাকমস এবং প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইলের (পিআরএসএম) প্রায় পূর্ণ মজুদ নিঃশেষ করে ফেলেছে। নিজেদের যুদ্ধবিমান নিরাপদ রেখে দূর থেকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে এসব মিসাইলই ছিল মূল চালিকাশক্তি। সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) অন্যান্য অঞ্চল থেকে এনে এ ঘাটতি পূরণের ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে। বস্তুত, ২০২৫ সালের জুনে ইসরাইলকে ঢালাও প্রতিরক্ষা সহায়তা প্রদানকাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের এ ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টর সঙ্কট দেখা দিতে শুরু করে।
যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত ক্ষয়ক্ষতির বাইরেও বিশাল আর্থিক ও সামরিক ক্ষতির মুখে পড়েছে ওয়াশিংটন। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে আমেরিকান বাহিনী প্রায় ১৩০ কোটি ডলার মূল্যের ‘এমকিউ-৯ রিপার’ ড্রোন খুইয়েছে, যা ছিল তাদের মোট যুদ্ধক্ষেত্রের চালকবিহীন বাহনের প্রায় ২৫ শতাংশ। প্রায় তিন থেকে পাঁচ কোটি ডলার মানসম্পন্ন একেকটি রিপার ড্রোন মূলত নজরদারি ও হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সুনির্দিষ্ট হামলায় ব্যবহৃত হতো। পেন্টাগন থেকে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা গুঁড়িয়ে দেয়ার দাবি জানানো হলেও, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করছে যে, তেহরান রাশিয়া ও চীন থেকে আরো উন্নতমানের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সংগ্রহ করে নিজেদের আকাশসীমা পুনর্গঠন করে ফেলেছে।



