ঈদুল আযহা

ত্যাগ ও মানবতার চিরন্তন আহ্বান

অধ্যাপক এবিএম ফজলুল করীম

Printed Edition

ইসলামে তাকওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। তাকওয়া মানে আল্লাহভীতি ও আল্লাহর প্রতি সচেতনতা। কোরবানির মাধ্যমে একজন মুসলমান নিজের ভেতরে তাকওয়া অর্জনের চেষ্টা করে।

হজরত ইবরাহীম (আ:) তাঁর প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, আল্লাহর ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো ভালোবাসা নেই। বর্তমান যুগে মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- সম্পদ, ক্ষমতা ও ভোগবিলাসের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি। ঈদুল আজহা মানুষকে সেই আসক্তি থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষা দেয়। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন- “সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।”

এই হাদিস কোরবানির গুরুত্বকে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরে। তবে একই সাথে মনে রাখতে হবে, কোরবানি যেন লোকদেখানো বা আত্মপ্রচার না হয়ে যায়।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে অনেকেই কোরবানিকে প্রদর্শনের বিষয় বানিয়ে ফেলেছে। দামি পশুর ছবি, ভিডিও, শোভাযাত্রা- এসবের মাধ্যমে এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। অথচ ইসলাম বিনয় ও আন্তরিকতাকে গুরুত্ব দেয়।

কোরবানি ও সামাজিক সাম্য

ঈদুল আজহার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করা। কোরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিব মানুষের মধ্যে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে সহমর্মিতা গড়ে ওঠে। ইসলাম চায় না সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ুক। বরং সমাজের বিত্তবানদের দায়িত্ব হলো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কোরবানি সেই দায়িত্ববোধকে জাগ্রত করে।

আজ পৃথিবীতে এক দিকে অঢেল সম্পদ, অন্য দিকে কোটি কোটি মানুষ খাদ্যসঙ্কটে ভুগছে। এমন বাস্তবতায় কোরবানির শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি মানুষকে শেখায়- নিজের সম্পদের একটি অংশ অন্যের কল্যাণে ব্যয় করতে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন- “তোমরা তোমাদের উপার্জিত উত্তম বস্তু থেকে ব্যয় কর।” (সূরা আল-বাকারা : ২৬৭)

কোরবানির শিক্ষা যদি সারা বছর মানুষের জীবনে কার্যকর হতো, তবে সমাজে দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও বৈষম্য অনেকাংশে কমে যেত।

আত্মশুদ্ধি ও নৈতিকতার শিক্ষা

ঈদুল আজহার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি। মানুষ বাহ্যিকভাবে ধর্মীয় আচার পালন করলেও অন্তরের পরিবর্তন না ঘটলে সেই ইবাদতের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।

কোরবানি মানুষের ভেতরের অহঙ্কার, হিংসা, লোভ ও স্বার্থপরতাকে দমন করার শিক্ষা দেয়। মূলত এটি একটি নৈতিক বিপ্লবের আহ্বান। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন-“তোরা ভোগের পাত্র ফেলরে ছুঁড়ে, ত্যাগের তরে হৃদয় বাঁধ।”

এই আহ্বান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ আধুনিক মানুষ ক্রমশ ভোগবাদে ডুবে যাচ্ছে। মানুষ নিজের স্বার্থ ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে চায় না। পরিবার, সমাজ ও মানবতার প্রতি দায়িত্ববোধ কমে যাচ্ছে। ঈদুল আজহা সেই হারানো মানবিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার শিক্ষা দেয়।

কোরবানি : কেবল পশুবধ নয়

আজ অনেকেই কোরবানিকে শুধুমাত্র পশু জবাই হিসেবে ব্যাখ্যা করে বিভ্রান্তি ছড়ায়। অথচ ইসলামে কোরবানির উদ্দেশ্য নিষ্ঠুরতা নয়; বরং আত্মত্যাগ ও মানবিকতার বিকাশ।

কোরবানির পশু প্রতীক মাত্র। প্রকৃত কোরবানি হলো মানুষের ভেতরের পশুত্বকে দমন করা। অহঙ্কার, হিংসা, লোভ, অন্যায়, দুর্নীতি ও স্বার্থপরতাকে কোরবানি না করতে পারলে পশু জবাই করেও প্রকৃত কোরবানির শিক্ষা অর্জন করা সম্ভব নয়।

আজ সমাজে দুর্নীতি, ঘুষ, মিথ্যাচার ও প্রতারণা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেকেই কোরবানি করে, কিন্তু অন্যের হক নষ্ট করতে দ্বিধা করে না। এমন কোরবানি আল্লাহর কাছে কতটা প্রহণযোগ্য, তা গভীরভাবে ভাবার বিষয়।

ঈদুল আজহা ও বিশ্ব মুসলিম ঐক্য

ঈদুল আজহার সাথে হজের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। জিলহজ মাসে বিশ্বের লাখ লাখ মুসলমান মক্কায় সমবেত হয়। জাতি, বর্ণ, ভাষা ও শ্রেণিভেদ ভুলে সবাই একসাথে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হয়। এটি বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের এক অনন্য উদাহরণ। হজ ও কোরবানি মুসলমানদের শেখায়- মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নয়; বরং ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের ভিত্তিতে সমাজ গড়ে তুলতে হবে।

আজ মুসলিমবিশ্ব নানা বিভক্তি, সঙ্ঘাত ও সঙ্কটে জর্জরিত। এমন পরিস্থিতিতে ঈদুল আজহার শিক্ষা মুসলিম উম্মাহকে নতুনভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

আধুনিক সমাজে ঈদুল আজহার প্রাসঙ্গিকতা

বর্তমান যুগে মানুষ প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হলেও নৈতিকভাবে অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়েছে। পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে, আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়ছে। মানুষ কেবল নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভাবছে। এই বাস্তবতায় ঈদুল আজহার শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি মানুষকে শেখায়- ত্যাগ, ধৈর্যধারণ, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, নৈতিকতা ও মানবিকতা চর্চা করতে।

যদি ব্যক্তি ও সমাজজীবনে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা বাস্তবায়িত হতো, তবে সমাজে অন্যায়, বৈষম্য ও হিংসা অনেকাংশে কমে যেত।

কোরবানির আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

কোরবানি মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর ভালোবাসা জাগ্রত করে। এটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়- এই পৃথিবীর সবকিছু ক্ষণস্থায়ী, কেবল আল্লাহই চিরস্থায়ী।

যখন একজন মুসলমান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের অর্থ ব্যয় করে কোরবানি করে, তখন তার ভেতরে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। সে উপলব্ধি করতে শেখে- মানুষের প্রকৃত সফলতা সম্পদে নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিতে। ইবরাহীম (আ:) ও ইসমাঈল (আ:)-এর আত্মত্যাগের ঘটনা মানবজাতিকে যুগে যুগে এই শিক্ষাই দিয়ে আসছে।

আত্মত্যাগের মাধ্যমে মানবকল্যাণ

কোরবানির একটি বড় শিক্ষা হলো মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ। ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম নয়; বরং সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিকতার ধর্ম।

আজ সমাজে অনেক মানুষ না খেয়ে দিন কাটায়, চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পায়, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। অথচ সমাজের বিত্তবানদের অনেকেই বিলাসবহুল জীবনযাপনে ব্যস্ত। কোরবানি সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি নৈতিক বার্তা দেয়। শুধু ঈদের সময় নয়, সারা বছর মানুষের পাশে দাঁড়ানোই কোরবানির প্রকৃত দাবি।

ঈদুল আজহার শিক্ষা : পরিবার ও সমাজে

ঈদুল আজহার শিক্ষা পারিবারিক জীবনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইবরাহীম (আ:), হাজেরা (আ:) ও ইসমাঈল (আ:)-এর পরিবার ছিল আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের উজ্জ্বল উদাহরণ। সেখানে পারস্পরিক আস্থা, ধৈর্য ও ঈমান ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি।

আজ পরিবারগুলো নানা সঙ্কটে ভুগছে। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই অবস্থায় ঈদুল আজহার শিক্ষা পরিবারকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে।

ঈদুল আজহা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং এটি মানবতার, আত্মত্যাগের, তাকওয়ার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের এক মহিমান্বিত শিক্ষা। কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য পশু জবাই নয়; বরং নিজের অন্তরের পশুত্বকে বিসর্জন দেয়া।

আজ আমাদের প্রয়োজন কোরবানির বাহ্যিক আয়োজনের চেয়ে এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা বাস্তবায়ন করা। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের লোভ, অহঙ্কার, স্বার্থপরতা ও ভোগবাদকে কোরবানি করাই হোক আমাদের মূল অঙ্গীকার। যদি ইবরাহীমী ঈমান ও ইসমাঈলী আত্মত্যাগ আমাদের জীবনে পুনর্জাগরিত হয়, তবে সমাজে শান্তি, ন্যায়, সাম্য ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে। ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নৈতিক মূল্যবোধ ফিরে আসবে।

পরিশেষে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়-

“ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন,

ঐ খুনের খুঁটিতে কল্যাণকেতু লক্ষ্য ঐ তোরণ।

আজি আল্লাহর নামে জান কোরবানে

ঈদের পূত বোধন।”