বিএনপির ছেড়ে দেয়া ৭টি আসনের পাঁচটিতেই অস্বস্তিতে জোট প্রার্থীরা

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ
Printed Edition

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় অবস্থান অনুযায়ী বিভিন্ন শরিক দলকে ৭টি আসনে ছাড় দিয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসন ছাড় পেয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। তাদের একাংশকে চারটি ও অপর অংশকে একটি আসন দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে কিছুটা দরকষাকষি হলেও সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন তারা।

তবে এসব আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের অংশগ্রহণে বড় ধরনের মানসিক চাপে রয়েছে জোট প্রার্থীরা। এ সব আসনে বিএনপি তাদের প্রার্থীদের কথা শুনাতে না পেরে বহিষ্কারও করেছে। এসব প্রার্থীকে বহিষ্কার করা হলেও দীর্ঘ সময় বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে তারা যুক্ত থাকায় ভোটের মাঠে বড় প্রভাব ফেলবে বলে জানান স্থানীয়রা। এমনকি বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকার কারণে এসব আসনে জোট সঙ্গীরা হারতেও পারেন বলে শঙ্কা করছেন অনেকে।

জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের একটি অংশ পেয়েছে চারটি আসন। তারা ধানের শীষ নয়, নিজ দলের ‘খেজুর গাছ’ প্রতীকেই নির্বাচন করছেন। অপর অংশ পেয়েছে একটি।

এর মধ্যে সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনে দলটির সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ উবায়দুল্লাহ ফারুক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনে সহ-সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, নীলফামারী-১ (ডিমলা-ডোমার) আসনে মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী ও নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনে প্রার্থী হয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতা মুফতি মনির হোসেন কাসেমী।

এছাড়া নিজ দলীয় প্রতীকে ভোট করবেন ভোলা-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ (গরুর গাড়ি), ঢাকা-১২ আসনে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক (হাতুড়ি), ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি (মাথাল), পটুয়াখালী-৩ (দশমিনা, গলাচিপা) আসনে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর (ট্রাক)।

যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের বিএনপির ছেড়ে দেয়া সাতটি আসনে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সাথে এখনো সমঝোতায় পৌঁছতে পারছেন না ঘোষিত প্রার্থীরা। সেখানে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও প্রচারণা চালাচ্ছেন। কোনো কোনো জায়গায় দিন দিন বিবাদ ও অসন্তোষ আরো বেড়েছে। ঘটেছে বিক্ষোভের ঘটনাও।

এ নিয়ে বেকায়দায় আছেন শরিক নেতারা। বিশেষ করে যারা নিজ দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করছেন, তারা সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ভুগছেন। কারণ একই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকলে নেতাকর্মীরা ছুটছেন তাদের দিকে। আর দল মনোনীত জোট প্রার্থীর পক্ষে থাকছেন হাতেগোনা কিছু নেতাকর্মী। তাই এ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে নেতাদের।

এই তালিকায় আছেন পটুয়াখালী-২ (দশমিনা, গলাচিপা) আসনে বিএনপির সমর্থন পাওয়া গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর। তার শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এখনো ভোটে আছেন বিএনপির বহিষ্কৃৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন। তিনি একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন।

সিলেট-৫ (কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ) আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে জোটের একক প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। তবে তিনি নির্বাচন করছেন দলীয় প্রতীক খেজুর গাছ নিয়ে। কওমি মাদরাসা অধ্যুষিত এ আসনটিতে দলটির উল্লেখযোগ্য ভোট ব্যাংকও আছে। অতীতে সেখান থেকে দলটির প্রার্থী বিজয়ী হওয়ারও রেকর্ড আছে। তবে এবার জোটের প্রার্থী হয়েও স্বস্তিতে নেই। একাংশের সমর্থন পেলেও এখনো মাঠে রয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী (বহিষ্কৃত) মামুনুর রশিদ (চাকসু) মামুন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সিনিয়র সহ-সভাপতি মুফতি জুনায়েদ আল হাবিব। তিনি লড়ছেন খেজুর গাছ প্রতীক নিয়ে। তার আসনে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেত্রী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। দুই প্রার্থীই একে অপরকে ছাড় দিতে নারাজ। প্রতিদিনই দেশব্যাপী ছড়াচ্ছে তাদের কথার উত্তাপ। স্থানীয়দের মতে ভোটের মাঠে এগিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা।

নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনে বিএনপির সমর্থনে লড়ছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের নেতা মুফতি মনির হোসেন কাসেমী। অবশ্য তিনি দলটির একটি অংশের সমর্থন পেয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তবে তার গলার কাঁটা হিসেবে মাঠে রয়ে গেছেন বিএনপির দুই নেতা শাহ আলম ও গিয়াস উদ্দিন। এ আসনেও বিদ্রোহী হেভিওয়েট দুই নেতার সামনে জয় লাভ করা মনির হোসেন কাসেমীর জন্য অনেক কঠিন।

ঢাকা-১২ (তেজগাঁও, শেরেবাংলা নগর) আসনে যুগপতের সঙ্গী হিসেবে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। ইতোমধ্যে বিএনপির একাংশকে নিয়ে তিনি প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে সেখানে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন সাইফুল আলম নিরব। তিনি প্রার্থিতায় এখনো অনড়। বহিষ্কারকে মেনে নিয়েই সক্রিয় আছেন তিনি।

এর মধ্যে ভোলা-১ (সদর) আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থকে সমর্থন দিয়ে তার পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও দলটির জেলার আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর। ইতোমধ্যে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন তিনি।

তিনি মূলত বিএনপির প্রার্থীই ছিলেন। আর আন্দালিব রহমান পার্থের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ছিল ঢাকা-১৭ আসন থেকে। গত ২৭ ডিসেম্বর বিএনপি থেকে জানানো হয় সেখান থেকে নির্বাচন করবেন তারেক রহমান। তাই ভোলার স্থানীয় বিএনপি তাকে সহজে মেনে নিয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসন থেকে বিএনপির সমর্থন পেয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি। প্রথমে সেখানে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ঝাড়ু মিছিল পর্যন্ত হয়েছে। তবে পরবর্তীকালে বিএনপির হাইকমান্ডের নির্দেশে প্রার্থিতা থেকে সরে গেছেন সাবেক এমপি আবদুল খালেক।