রক্তরঞ্জিত জুলাই-৯

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ২৫ পয়েন্ট অবরোধ শিক্ষার্থীদের

এ ছাড়া সারা দেশে সড়ক-মহাসড়ক, রেলপথ ও বিভিন্ন শহরে একই কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবার যানবাহন ছাড়া সব ধরনের গণপরিবহন ও ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

হারুন ইসলাম
Printed Edition

কোটা সংস্কারের দাবিতে ঘোষিত ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি সফল করার জন্য ১০ জুলাই ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ রাজধানীর ২৫টিরও বেশি পয়েন্টে অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন তারা। এ ছাড়া সারা দেশে সড়ক-মহাসড়ক, রেলপথ ও বিভিন্ন শহরে একই কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবার যানবাহন ছাড়া সব ধরনের গণপরিবহন ও ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

শিক্ষার্থীরা জানান, এক দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরবেন না। কোটা থাকলেও সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ থাকতে পারে, এর বেশি নয়। এ বিষয়ে আদালত নয়, তারা নির্বাহী বিভাগ ও সংসদ থেকে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান।

একই দিন কোটা বহালের দাবিতে শাহবাগে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চসহ একাধিক সংগঠন।

এ দিন বেলা সাড়ে ১১টায় সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের ওপর এক মাসের স্থিতাবস্থা দেয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। পাশাপাশি পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৭ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়। এক মাসের স্থিতাবস্থার রায়ের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের শিক্ষার্থীদের ঘরে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তবে শিক্ষার্থীরা এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। মানুষের দুর্ভোগ হয় এমন কর্মসূচি পরিহার করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’

শাহবাগসহ রাজধানীর ২৫টি পয়েন্টে অবরোধ শিক্ষার্থীদের : পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল ১০টায় শিক্ষার্থীরা ছোট ছোট মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে জড়ো হন। পরে সেখান থেকে মিছিল ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থান প্রদক্ষিণ করে। এরপর বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে শিক্ষার্থীরা শাহবাগ চানখারপুল, মৎস্য ভবন, মিন্টু রোড, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর, কাওরানবাজার, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নেন।

আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী রুবাবা ফাতিমা বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধারা এ দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন, তাদের জন্য কোটা থাকতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনীদের কোটা থাকতে পারে না। সর্বোচ্চ প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য কোটা থাকতে পারে।

আন্দোলনকারীদের সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর শাহবাগ, কাওরানবাজার, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর, ফার্মগেট, চাঁনখারপুল মোড়, চাঁনখারপুল ফ্লাইওভারে ওঠার মোড়, বঙ্গবাজার, শিক্ষা চতুর, মৎস্য ভবন, জিপিও, গুলিস্তান, সায়েন্সল্যাব, নীলক্ষেত, রামপুরা ব্রিজ, মহাখালী, আগারগাঁও, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসহ ১৭টি পয়েন্ট অবরোধ করে বিক্ষোভ করার নির্দেশনা ছিল। তবে আন্দোলনকারীরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রাজধানীর আরো বহু গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্র জানায়, রাজধানীর ২৫টি পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোট ২৫টি পয়েন্টেই অবরোধ করেন তারা।

সেদিন শাহবাগ ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে সরেজমিন দেখা যায়, সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা কলেজের সামনে থেকে মিছিল নিয়ে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী সায়েন্সল্যাব মোড়ে অবরোধ করেন। এর ফলে এ এলাকার সব প্রধান ও শাখা সড়ক বন্ধ হয়ে তীব্র যানজট তৈরি হয়। বেলা ১১টার দিকে মহাখালীর আমতলীতে তিতুমীর কলেজসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেন। এতে আশপাশের সব সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আগারগাঁও মোড় অবরোধ করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষার্থীরা। এতে মিরপুর-ফার্মগেট এবং মহাখালী-শিশুমেলা সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে দুই রুটে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশপাশের বেশ কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। রামপুরা এলাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এতে আশপাশের সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে।

শাহবাগে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের অবস্থান : কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীরা শাহবাগে অবস্থান নিলে তাদের পাশে জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ও মুক্তিযুদ্ধ সংসদ সন্তান কমান্ডসহ কোটার পক্ষের বেশ কয়েকটি সংগঠন। তারা মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহাল ও কটূক্তির বিচারের দাবিতে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য হয়ে প্রেস ক্লাব পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা। তাদের সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দিন, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, সাধারণ সম্পাদক মো: আল মামুন, বীর মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন মজুমদার প্রমুখ। এ সময় তারা ৭ দফা দাবি জানান।

হাইকোর্টের রায়ের উপর স্থিতাবস্থা জারি : ১০ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টায় সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের ওপর এক মাসের স্থিতাবস্থা দেয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। পাশাপাশি পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৭ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়। এক মাসের স্থিতাবস্থার রায়ের পর প্রধান বিচারপতি শিক্ষার্থীদের ঘরে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তবে শিক্ষার্থীরা এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

এ দিন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। মানুষের দুর্ভোগ হয় এমন কর্মসূচি পরিহার করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’

কোটা বাতিল নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিষয়ে আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থার পর অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘আপিল বিভাগ স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে বলেছেন। অর্থাৎ, যেমন আছে, তেমন থাকবে। কোটা বাতিলসংক্রান্ত ২০১৮ সালের পরিপত্রের ভিত্তিতে যেসব সার্কুলার দেয়া হয়েছে, সেখানে কোটা থাকছে না। যারা আন্দোলন করছেন, তাদেরকে আমি অনুরোধ করব, যেহেতু সুপ্রিম কোর্ট এটা বিবেচনায় নিয়েছেন, অতএব এখন আন্দোলন করার কোনো যৌক্তিক কারণ নাই। এটি বন্ধ করে তাদের ফিরে যাওয়া উচিত।’

শাহবাগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের ওপর এক মাসের স্থিতাবস্থা দিয়েছেন। এতে স্থায়ী কোনো সমাধান দেখি না। আমরা চাই সরকারের নির্বাহী বিভাগ একটি কমিশন গঠন করে কোটার যৌক্তিক সংস্করণ করুক। আমরা বলেছি, সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ কোটা থাকতে পারে। আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত সারা দেশে আন্দোলন চলবে। বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে সংবিধানে উল্লিখিত অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য কোটাকে ন্যূনতম মাত্রায় এনে সংসদে আইন পাস করে কোটা পদ্ধতি সংস্কার করতে হবে।

অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ পরের দিন ১১ জুলাই কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে বলেন, আমাদের দাবি অত্যন্ত সুস্পষ্ট- আমরা এক দফা দাবি করেছি। সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণা আসতে হবে যে, একটি কমিশন গঠন করে একটি স্থায়ী সমাধানের দিকে কোটাব্যবস্থাকে সরকার নিয়ে যাবে। কর্মসূচির ব্যাপারে তিনি বলেন, আগামীকাল (১১ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা বাংলা ব্লকেড অব্যাহত রাখবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে আমরা আমাদের ব্লকেড কর্মসূচি শুরু করব।