গণভোট নিয়ে অধ্যাপক আলী রীয়াজ

সংস্কার বাস্তবায়নে সব দল দায়বদ্ধ নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে

Printed Edition
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ গতকাল ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন : পিআইডি
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ গতকাল ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন : পিআইডি

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • এমপিরা একই সাথে দুই শপথ নেবেন
  • দেশের নাগরিকদের বড় অংশ রাষ্ট্রের সংস্কার চায়
  • রাজনৈতিক দলের ইশতেহার পরোক্ষ; কিন্তু গণভোটের রায় প্রত্যক্ষ
  • কাস্ট ভোটের ৬৮ শতাংশই ‘হ্যাঁ’ দিয়েছেন

কোনো রাজনৈতিক দলের ইশতেহার পরোক্ষ। কিন্তু সংবিধান সংশোধনে গণভোটে যে রায় এসেছে, তা কেবল সরকারের এজেন্ডা নয়, রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা। দলগুলোর শীর্ষ নেতারাও জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে সংস্কার বাস্তবায়নে সব রাজনৈতিক দল নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দায়বদ্ধ। নবনির্বাচিত এমপিরা একই সাথে দুটি শপথ নেবেন।

গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী-(সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি) অধ্যাপক আলী রীয়াজ এবং বিশেষ সহকারী মনির হায়দার এসব কথা বলেন। রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সদ্য অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফলের বিষয়ে জানাতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এ সময়ে উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের মোট ভোটারের ৬০ শতাংশের বেশি গণভোটে অংশ নিয়েছেন। আর প্রদেয় (কাস্ট হওয়া) ভোটের ৬৮ শতাংশই ‘হ্যাঁ’ দিয়েছেন। এর মানে হলো- দেশের মানুষ অত্যন্ত সুস্পষ্ট এবং দ্বিধাহীনভাবে জুলাই সনদের সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবের পক্ষে রায় দিয়েছেন। নাগরিকদের বড় অংশ আর পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যেতে বা বর্তমান অবস্থা বজায় রাখতে চান না। তারা পরিবর্তন চান। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সংস্কার চান। তাদের মতে, বিএনপি সব সময় জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। তাই আশা করা যায়, দেশ পরিচালনা ও সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে দলটি জনগণের এই প্রত্যাশা বিবেচনায় নেবে।

জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ অনুযায়ী আগামী সংসদ হবে দুইকক্ষ বিশিষ্ট। আর গণভোটের প্রশ্নপত্রে উল্লেখ ছিল, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে সংসদের উচ্চকক্ষের প্রতিনিধির সংখ্যা নির্ধারিত হবে। কিন্তু বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল সংসদে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে হবে উচ্চকক্ষ। এ ক্ষেত্রে বিএনপি গণভোটের রায় মানতে বাধ্য কি না, এ প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আলী রীয়াজ ও মনির হায়দার বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে অনেক বিষয় থাকে। ফলে সেখানে একটি বিষয় উল্লেখ থাকলে তা পরোক্ষ। কিন্তু গণভোটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সংসদের উচ্চকক্ষ হবে। ফলে এর আইনগত ভিত্তি আছে। তারা বলেন, দলগুলো যেমন নিজেদের ইশতেহার দিয়েছে, তেমনি দলের শীর্ষ নেতারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষেও জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন। সুতরাং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া কেবল সরকারের নয়, এটি রাষ্ট্রের এজেন্ডা। সব রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা। আলী রিয়াজ আরো বলেন, গণভোটে যে প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে, তার ভিত্তিতেই জনরায় এসেছে। বিএনপি সব সময় জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। তাই আশা করা যায়, দেশ পরিচালনা ও সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে দলটি জনগণের এই প্রত্যাশা বিবেচনায় নেবে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আইনি বিবেচনার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাকেই বড় করে দেখছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ‘আইনগত বিবেচনার চেয়েও রাজনীতিতে প্রথম এবং প্রধান বিবেচনাটা আপনাকে রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। আমরা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, জনরায় হয়েছে, আবার রাজনৈতিক দলের প্রতিও জনগণের সমর্থন দেখা গেছে। ফলে এর মধ্যে একটি সমন্বয় করতে হবে। সমন্বয়ের দায়িত্বটা রাজনীতিকদের।’

সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার গঠন করতে যাওয়া দল বিএনপির কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আলী রীয়াজ বলেন, সার্বভৌম জনগণের অভিপ্রায় হিসেবে এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলেরই এ বিষয়ে নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা আছে। তিনি বলেন, কেবল লিখিত আইনের বিবেচনার চেয়ে রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে সেভাবেই বিবেচনা করবেন বলে আশা করি।’ আলী রীয়াজ বলেন, গণভোটের মধ্য দিয়ে সংবিধানের বড় রকমের সংস্কারের যে প্রস্তাব, সেটা দেশের জনগণ সরাসরি অনুমোদন করেছে। এটাকে জনরায় হিসেবে দেখতে হবে। সংস্কারের জন্য জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি হিসেবে দেখতে হবে। সংস্কার বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, কাজটি কিভাবে এগোচ্ছে তার ওপরই অগ্রাধিকার নির্ভর করবে। তবে সুনির্দিষ্ট আদেশে উচ্চকক্ষ গঠনের কথা থাকায় এটি ছয় মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবেন ক্ষমতাসীন দল ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলো। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে আলী রিয়াজ বলেন, ‘গণভোটের মধ্য দিয়ে সংস্কারের বিষয়ে যে সুস্পষ্ট গণরায় প্রকাশিত হয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। রাষ্ট্র সংস্কারের ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দল অঙ্গীকারবদ্ধ। ক্ষমতাসীন দল এবং জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো এবং সংসদের বাইরেও যেসব রাজনৈতিক দল আছে তাদের সবার প্রতি আহ্বান হচ্ছে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যম ঐক্যবদ্ধভাবে এই গণরায় বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।’

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, গণভোটের রায়কে কেবল সংখ্যার বিবেচনায় দেখলেই হবে না। এই রায় হচ্ছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন, তারা আমাদের ওপরে যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, তার স্বীকৃতি। তাদের দেয়া দায়িত্ব পালনের জন্য জনগণের অঙ্গীকার। প্রায় ১৬ বছর ধরে যে বীরের রক্তস্রোত, মায়ের অশ্রুধারা, নির্যাতিতের হাহাকার তার যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠনের জনআকাক্সক্ষার প্রকাশ। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুথানের মধ্য দিয়ে সার্বভৌম জনগণের অভিপ্রায়ের যে প্রকাশ ঘটেছিল, গণভোটের রায়ে তা প্রকাশিত হলো। তার মতে, গণভোটের মধ্য দিয়ে সংস্কারের ব্যাপারে সুস্পষ্ট গণরায় প্রকাশিত হয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলের। রাষ্ট্র সংস্কারের ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দল অঙ্গীকারবদ্ধ। ক্ষমতাসীন দল এবং জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদে প্রতিনিধিত্বকারী দল এবং সংসদের বাইরেও যেসব রাজনৈতিক দল আছে তাদের সবাইকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যম ঐক্যবদ্ধভাবে এই গণরায় বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে একে জয়যুক্ত করেছেন। গণভোটে ভোট দিয়েছেন সাত কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩ জন ভোটার, যা মোট ভোটের প্রায় ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এর মধ্যে মোট চার কোটি ৮২ লাখ ৬৬০ জন ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন, যা কাস্ট হওয়া মোট ভোটের ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ‘না’ ভোট দিয়েছেন দুই কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬ জন ভোটার, যা কাস্ট হওয়া ভোটের প্রায় ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ ভোটারদের ৬০ শতাংশেরও বেশি গণভোটে অংশ নিয়েছেন। জাতীয় সংসদের নির্বাচনের চেয়েও যা এক শতাংশের বেশি।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর নিম্নকক্ষের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষে ১০০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন। ২৪টি রাজনৈতিক দল এতে একমত হলেও বিএনপিসহ সাতটি দল এতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল। বিএনপি নির্বাচনে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। কাল পরশুর মধ্যেই নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হতে পারে। সংসদ সদস্যরা একই সাথে দুটি শপথ নেবেন বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। আগামী ছয় মাস বা ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার করবেন। জুলাই সনদ অনুযায়ী এই সময়ের (৬ মাস) মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠিত হওয়ার কথা।