রাম বিগ্রহ থেকে অর্থপাচার মামলা

গাইবান্ধার হরিদাস গ্রেফতার, ৯ কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে তদন্ত

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক ও গাইবান্ধা প্রতিনিধি

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে কথিত ‘এশিয়ার সর্ববৃহৎ’ রাম বিগ্রহ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় আসা হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস এবার অর্থপাচার মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন। সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের দায়ের করা মামলায় রোববার গভীর রাতে তাকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

সিআইডির দাবি, বৈধ আয়ের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে হরিদাসের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে প্রায় ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জমা হয়েছে। এ অর্থের অধিকাংশই পরবর্তীতে উত্তোলন করা হয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন ব্যক্তি তার হিসাবে অর্থ জমা দিয়েছেন, যা তার পেশা ও ঘোষিত আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে উত্তরা পশ্চিম থানায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয়েছে।

গভীর রাতে গ্রেফতার : রোববার রাত সাড়ে ১২টার দিকে পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামের রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি ওই গ্রামের গোপীনাথ চন্দ্র দাসের ছেলে।

পলাশবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সরোয়ার আলম খান জানান, ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতারের পর ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, সিআইডির রিকুইজিশনের ভিত্তিতেই এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বলেন, গ্রেফতারের পর হরিদাসকে সিআইডির হেফাজতে নেয়া হয়েছে এবং মামলার তদন্ত এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।

স্থানীয়ভাবে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে মন্দির এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পলাশবাড়ী থানা পুলিশ।

কী বলছে সিআইডি : সিআইডির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরি পাইয়ে দেয়া, বদলি বাণিজ্য, হুন্ডি ও সঙ্ঘ(বদ্ধ অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হরিদাসের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়। অনুসন্ধানে তার নামে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও এমএফএস অ্যাকাউন্টে ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। এসব অর্থের উৎস সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ তার হিসাবে জমা হওয়ার তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।

সিআইডি আরো জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে বনানী থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা একটি মামলার তথ্যও রয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেশী-বিদেশী মুদ্রাপাচার ও সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়ায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে নিয়মিত মামলা করা হয়েছে। তার আর্থিক লেনদেন, সম্পদ ও সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

তবে সিআইডির উত্থাপিত এসব অভিযোগ এখনো আদালতে বিচারাধীন। হরিদাস বা তার আইনজীবীর পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

রাম বিগ্রহ নির্মাণ ঘিরে আলোচনায় : হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস মূলত আলোচনায় আসেন পলাশবাড়ীর রাধা গোবিন্দ ও কালীমন্দির প্রাঙ্গণে ৮১ ফুট উচ্চতার রাম বিগ্রহ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ার পর। মন্দির কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, এটি নির্মিত হলে এশিয়ার সবচেয়ে বড় রাম বিগ্রহ হবে। এ ঘোষণার পর বিষয়টি স্থানীয় পর্যায় ছাড়িয়ে জাতীয় আলোচনায় আসে। তবে প্রকল্পটির অর্থায়নের উৎস নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয় ইমাম-ওলামাদের একটি সংগঠন প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করে এবং দাবি তোলে, প্রকল্পে বিদেশী ব্যক্তি, সংস্থা বা রাষ্ট্রের অর্থায়ন কিংবা অন্য কোনো অস্বচ্ছ উৎস রয়েছে কি না, তা তদন্ত করতে হবে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে গত ৯ জুন মন্দির কর্তৃপক্ষ বিগ্রহ নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করে।

স্থানীয় আন্দোলন ও দাবি : রাম বিগ্রহ নির্মাণকে কেন্দ্র করে পলাশবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে ছিল- বিগ্রহ নির্মাণের অর্থের উৎস তদন্ত; সম্ভাব্য বিদেশি অর্থায়নের তথ্য প্রকাশ; প্রকল্পের অনুমোদন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা যাচাই; অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা। এসব দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো বিষয়টি নজরদারিতে নেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

হরিদাস সম্পর্কে সিআইডির তথ্য : সিআইডির ভাষ্যানুযায়ী, হরিদাস ২০০৬ সালে পলাশবাড়ীর হাসবাড়ী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে ঢাকার ক্যামব্রিয়ান কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ২০১০ সালে অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নেন এবং ২০১৯ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ‘তৌহিদ ইসলাম’ নাম ধারণ করেন।

সিআইডির আরো দাবি, তিনি বিভিন্ন সময়ে নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রটোকল অফিসার হিসেবে পরিচয় দিতেন। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য সম্পাদিত ছবি প্রদর্শন এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে সংরক্ষিত নম্বর থেকে ভুয়া ফোনকল শোনানোর অভিযোগও করেছে সংস্থাটি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি এবং অভিযুক্তের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তদন্তে যেসব প্রশ্ন : হরিদাসের গ্রেফতারের পর কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। তদন্তে এখন যেসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-

৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার প্রকৃত উৎস কী? অর্থগুলো কারা এবং কী উদ্দেশ্যে তার হিসাবে পাঠিয়েছিল? বিগ্রহ নির্মাণ প্রকল্পের অর্থায়নের সাথে ওই লেনদেনের কোনো সম্পর্ক আছে কি না? অভিযোগে উল্লিখিত হুন্ডি বা সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সাথে তার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না? আর কেউ এ নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত কি না? তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংক হিসাব, এমএফএস লেনদেন, সম্পদের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে।

এ দিকে হরিদাসকে গ্রেফতারের ঘটনায় গাইবান্ধায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। এক দিকে অর্থপাচারের অভিযোগ, অন্য দিকে আলোচিত রাম বিগ্রহ প্রকল্প, দুই বিষয়কে ঘিরেই তদন্তের অগ্রগতি এখন জনমনে কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।