বিশেষ সংবাদদাতা
- উন্নয়ন প্রকল্প নজরদারিতে ‘ড্যাশবোর্ড’ জুলাই থেকে কার্যকর
- কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও শিক্ষার গুণগত মানই চ্যালেঞ্জ- হোসেন জিল্লুর
- প্রকল্প বাস্তবায়ন নির্দিষ্ট সময়সীমায় ধরে রাখা যাচ্ছে না- সাকী
দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে স্থিতিশীলতা আনা। তারপর সেখান থেকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাবো আমরা। সার্বিক যে পরিস্থিতি, তাতে আমাদের দুই বছর সময় দিতে হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, আমরা মনে করি তৃতীয় বছর থেকে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে। আর প্রকল্পের স্থবিরতা দূর করতে আগামী মাস থেকেই ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে।
রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে গতকাল বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাজেট সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। অতিথি ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। বাজেট নিয়ে আলোচনা করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী, বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
ব্যাংকনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনব- অর্থমন্ত্রী
আমীর খসরু বলেন, সরকার দেশের সামগ্রিক জন-অর্থায়ন কাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে স্থানীয় ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অর্থায়নের পথে হাঁটছে। স্থানীয় ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেয়ার ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। আমরা ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ঋণ নেয়ার প্রবণতা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছি। তিনি বলেন, বিগত ১০ বছর ধরেই আমি বলে আসছি যে স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেয়া উচিত নয়। সরকার ১০ থেকে ১৩ শতাংশ সুদে ব্যাংক থেকে টাকা নিলে বেসরকারি খাতের জন্য টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়ে। সরকার এই উচ্চ সুদে টাকা নিয়ে কিভাবে তা পরিশোধ করবে, তখন সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমরা ধীরে ধীরে ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে বাজারভিত্তিক ও বিকল্প অর্থায়নের দিকে নজর দিচ্ছি।
দেশের বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে প্রধান সমস্যা হিসেবে প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু বলেন, আমি তো তিন মাসে এসব সমস্যা সমাধান করতে পারব না। টাকা দিয়েও এত দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান হবে না। বিগত সরকার গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ না নিলেও বর্তমান সরকার তা শুরু করেছে। তবে বাইরে থেকে গ্যাস এনে সংরক্ষণ করে সরবরাহ করতে অন্তত ১৮ মাস সময় লাগবে। তিনি বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও শক্তিশালী ইন্টারনেট ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা এই তিন জায়গায় বিনিয়োগ করছি।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান সরকারের বাজেট বাস্তবায়নে তিন মাস মেয়াদি অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম চালু করার কথা বললে, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে ঐতিহাসিক স্থবিরতা ও দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে বিশেষ ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা নয়, আমরা একটা ড্যাশবোর্ড করছি। ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রতিটা প্রকল্প দৈনিক ভিত্তিতে তদারক করা হবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বাজেটে বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তুললে অর্থমন্ত্রী বলেন, পরিচালন ব্যয়ের জন্য থোক বরাদ্দ আমরা রাখিনি। যেটা আছে, তার সব উন্নয়ন কাজের জন্য।
নিয়মকানুন সহজ করতে টাস্কফোর্স হচ্ছে- অর্থমন্ত্রী
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাজেটে আমরা নিয়মকানুন সহজ করার যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেগুলো যেন সবাই ঠিকভাবে মেনে চলে, সে জন্য টাস্কফোর্স গঠন করা হচ্ছে। পাশাপাশি একটা ওয়েবসাইট তৈরি করা হচ্ছে। দেশের কোনো নাগরিক বা ব্যবসায়ী যদি মনে করেন, এই নিয়মকানুন ভঙ্গের বা সঠিক প্রয়োগ না হওয়ার কারণে তারা কোনোভাবে বাধা বা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তবে তারা এই ওয়েবসাইটে জানাতে পারবেন। এই পুরো বিষয় তদারকি করার দায়িত্ব থাকবে সেই টাস্কফোর্সের। আশা করা যায়, এর মাধ্যমে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে।
আমীর খসরু বলেন, সরকার শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক-কর অনেক কমিয়ে দিয়েছে। রফতানি খাতে পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। ফলে এখন শুধু তৈরী পোশাক খাতই নয়, বরং যেকোনো খাতের যেকোনো ব্যবসায়ী পণ্য রফতানি করতে চাইলে বন্ড (শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি) সুবিধা পাবেন। ব্যবসায়ীরা চাইলে সরাসরি বন্ড সুবিধা নিতে পারেন। আবার বন্ড সুবিধা নিতে না চাইলে ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে সম্পূর্ণ শুল্ক-করমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য তৈরি ও রফতানি করতে পারবেন। এমনকি কাঁচামাল আনার জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলাও এখন আর বাধ্যতামূলক রাখা হয়নি।
প্রকল্পে নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে রাখা যাচ্ছে না- প্রতিমন্ত্রী সাকী
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাজেট ও নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে রাখা যাচ্ছে না। সেসব সুনির্দিষ্ট সমস্যা ও সেগুলোর সমাধান নিয়ে বর্তমানে কাজ চলছে। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা বা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে।
বাজেট অবাস্তব ও ঋণনির্ভর- আখতার হোসেন এমপি
এনসিপির আখতার হোসেন বলেন, ঘোষিত নতুন বাজেটকে দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘অবাস্তব’ ও ‘ঘাটতি ও ঋণনির্ভর’। বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন খাতে যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, তার একটি স্বচ্ছ হিসাব যেন সময়ানুযায়ী সংসদ ও জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়।
সরকারের সামনে ৩ সঙ্কট- হোসেন জিল্লুর
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাজেটটি, যতদূর আমি দেখতে পাচ্ছি, একটি অর্থনৈতিক দলিল হওয়ার পাশাপাশি আংশিকভাবে একটি সামাজিক দলিলও বটে। এই অর্থে যে এটি একটি আকাক্সক্ষামূলক দলিল। আমি মনে করি, এমন একটি রূপান্তরমূলক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একটি নতুন সরকারের আকাক্সক্ষামূলক হওয়াটা আশ্চর্যের কিছু নয়। মনে করি এটি সঠিক পথেই এগোচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, আমরা সবাই বাস্তববাদী হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। বিশেষ করে লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে নয়। আমি জানি, রাজস্বের পূর্বাভাস, এডিপি বাস্তবায়ন ইত্যাদির মতো অনেক লক্ষ্য হয়তো অর্জিত হয়নি।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে ঋণ এখন বিনিয়োগের মাধ্যম নয়। বরং টিকে থাকা বা বেঁচে থাকার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নি¤œ আয়ের পরিবারগুলো খাদ্য বা ভোগ কমিয়ে দিচ্ছে। চিকিৎসাসেবা নেয়া পিছিয়ে দিচ্ছে, একসাথে একাধিক চাকরি বা কাজ করছে। ফলে তাদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার মতো নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় তিনটি বড় সঙ্কট দেখা যাচ্ছে। এক. কর্মসংস্থানের সঙ্কট। দুই. বিনিয়োগের সঙ্কট। তিন. শিক্ষার গুণগত মানের সঙ্কট।
এক শতাংশ মানুষের কাছে অর্ধেক সম্পদ- ড. রাজ্জাক
ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, র্যাপিড প্রাক্কলন করে দেখেছে যে দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ মানুষ বর্তমানে দেশের মোট সম্পদের প্রায় ৫০ শতাংশের ধারক। অর্থাৎ আমরা বৈষম্যমূলক সমাজ তৈরি করেছি। যার সংশোধন আবশ্যিক। সে জন্য যথাযথভাবে পরিকল্পিত ‘সম্পদ কর’ ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজন। তিনি বলেন, সম্পদ বণ্টন বিবেচনার জন্য বর্তমান যে সারচার্জ ব্যবস্থা রয়েছে, সম্পদ কর আরোপের ক্ষেত্রে তা সঠিক পদ্ধতি বলে মনে করেন না এম এ রাজ্জাক। এই ক্রমবর্ধমান অসমতা মোকাবেলায় উত্তরাধিকার কর চালু করা উচিত। অন্যথায়, এসব সমস্যার সমাধান হবে না।
জ্বালানিসঙ্কট, আইনশৃঙ্খলায় নিরাপদ মনে করি না- আনোয়ার
বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, জ্বালানিসঙ্কটের কারণে বিদ্যমান শিল্প টিকে থাকতে পারছে না। এটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকের সুদের হার চড়া, সেটিও আরেক মাথাব্যথা, এমন বাস্তবতায় প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং বিদ্যমান শিল্পগুলো টিকিয়ে রাখাই মূল বিষয়। সে জন্য জ্বালানি হলো সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা। কিন্তু এ নিয়ে বাস্তব কর্মপরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, এখনো মব সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে আমরা এখনো নিজেদের নিরাপদ মনে করছি না। অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খুবই আত্মতুষ্ট।
বাজেটে শ্রমিকদের জীবন পরিবর্তন হয়নি- শ্রমিক নেতা
এই বাজেটে শ্রমিকদের জীবনের পরিবর্তন হয়নি বলে মন্তব্য করেন গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের রেশন দেয়ার দাবি করা হচ্ছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তাদের যে বেতন, তাতে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে চলা সম্ভব নয়। কিন্তু বাজেটে এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
মন্ত্রিত্ব পেলে কি শ্রমিকের কথা ভুলে যাই- তাসলিমা
বাংলাদেশ পোশাক শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক তাসলিমা আখতার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের শ্রমিকনেতা মন্ত্রী হওয়ার আগে শ্রমিকের পরে অনেক কিছুই বলেন। কিন্তু আমার মনে হয়, কিছু মনে করবেন না, মন্ত্রিত্ব পেলে কি শ্রমিকের কথা ভুলে যাই? আমরা রাজপথে শ্রমিকের কথা বলি, কিন্তু সেই জায়গায় গেলে, সেই মন্ত্রিত্ব পেলে কেন শ্রমিকের কথা আমাদের মুখ দিয়ে আর আসে না? বক্তব্যের শুরুতেই তৈরী পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, অত্যন্ত দুঃখজনক যে বিজিএমইএ-এই সরকারকে স্বাগত জানাচ্ছে। কিন্তু আমরা শ্রমিক পক্ষ এই সরকারকে কোনোভাবেই স্বাগত জানাতে পারছি না। আমরা দুঃখিত। করোনাকালীন চরম সঙ্কটের সময়ে যে গার্মেন্টস শ্রমিকরা নিজের জীবন বাজি রেখে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছিলেন, বিগত বা বর্তমান কোনো সরকারই তাদের অবদানের প্রকৃত মূল্যায়ন করেনি।



