গণভোটের রায় ইস্যুতে সংসদের উত্তাপ রাজপথে

জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায়কে কেন্দ্র করে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে আস্থার সঙ্কটের পাশাপাশি রাজপথে পাল্টাপাল্টি অবস্থানের আশঙ্কা তৈরি করেছে। সম্পর্কের সমীকরণ দ্বন্দ্ব ও মতবিরোধ আন্দোলনের দিকে মোড় নিচ্ছে।

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition

জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায়কে কেন্দ্র করে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে আস্থার সঙ্কটের পাশাপাশি রাজপথে পাল্টাপাল্টি অবস্থানের আশঙ্কা তৈরি করেছে। সম্পর্কের সমীকরণ দ্বন্দ্ব ও মতবিরোধ আন্দোলনের দিকে মোড় নিচ্ছে।

সংসদের বিরোধী দল বলছে, দায়িত্বশীল জায়গা থেকে বিরোধী দল চুপ থাকতে পারে না। গণভোটের রায় কার্যকর না হলে আবারো দেশে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন ঘটবে। গণভোটের রায় যেভাবে হোক কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে তারা।

অন্যদিকে সরকারি দল বিএনপি বলছে, অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশের ভিত্তিতে ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে গণভোট আয়োজন করেছে, তার কার্যকারিতা আর নেই। তাই এরই মধ্যে সেই অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। এ ছাড়া বিরোধীরা দাবি জানালেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ অস্তিত্বহীন। এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন জরুরি। এ জন্য সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হবে। একইসাথে আন্দোলনের নামে কেউ যদি মব সৃষ্টির পাঁয়তারা করতে চায়, তাহলে সেটি শক্ত হাতে দমনেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে সরকারি দল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল করলে পুরো গণভোট অবৈধ হয়ে যাবে। এ ছাড়া গণভোট এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। ফলে বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে একধরনের আইনি জটিলতাও তৈরি হয়েছে। এতে সবকিছু মিলে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ গণভোট প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় বড় ধরনের রাজনৈতিক সঙ্কট ঘনীভূত হবে। তারা বলছেন, গণভোট, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যুতে সংসদের উত্তাপ গড়াবে রাজপথে।

সূত্র মতে, এরই মধ্যে গণভোটের আলোকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে গেল শনিবার বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলীয় জোট। সমাবেশে তারা বলছে, সংবিধান সংস্কারে দেশের জনগণ জুলাই আদেশ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু সরকারি দল বিএনপি সংবিধান সংস্কার না করে তাদের পছন্দমতো কিছু বিষয় সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি জনরায়কে উপেক্ষা করা। এ কারণে ন্যায্য দাবি আদায়ে প্রয়োজনীয় কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা হবে বলে তারা জানান।

জানা গেছে, জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে চাপে রাখতে সংসদের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। সংসদে দাবি জানানো, মুলতবি প্রস্তাব দেয়া ও ওয়াকআউটের পাশাপাশি রাজপথে ধারাবাহিক এ কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে জোটটি। আন্দোলনের রূপরেখায় আছে সংসদে সরব থাকা, প্রয়োজনে ওয়াকআউট করে প্রতিবাদ জানানো, সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ। পাশাপাশি জনমত গঠনে সভা-সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, প্রচারপত্র বিলি ও গণসংযোগের মতো কর্মসূচিগুলোও হাতে নেয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের দাবিতে এরই মধ্যে সাত দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ১১ দলীয় ঐক্যজোট। ৯ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচি আগামী ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে পালিত হবে।

বিরোধী জোটের মুখপাত্র ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, সাবেক এমপি হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, দাবি আদায়ে বিরোধী জোট সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও সরব থাকবে। গণভোট বাস্তবায়িত না হলে দেশে আবারো ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে। দেশের জনগণ সেটি আর হতে দিবে না। জনমত গঠনে লিফলেট বিতরণ, সেমিনার, গণসংযোগ ও মিছিলের মতো কর্মসূচি থাকবে বলে তিনি জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ১১ দলের শীর্ষ এক নেতা বলেন, সরকার গণভোটের রায় মেনে সংস্কার বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে। কোনো অবস্থায় জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য করার সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া হবে না। পাশাপাশি বিএনপির বাইরে আরো কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে এ আন্দোলনে পাশে পাওয়ার চেষ্টা চলছে।

এদিকে ৬ এপ্রিল জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের রায় বাস্তবায়নের জন্য বিরোধী দল সংসদ থেকে জনগণের কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার ভাষায়, ৪ এপ্রিলের কর্মসূচির মধ্য দিয়েই রাজপথের আন্দোলন শুরু হয়েছে। তিনি বলেছেন, সরকার তাদের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এ কারণেই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকে যাচ্ছে ১১ দল। এ ছাড়া জাতীয় সংসদে গণভোট প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা একাধিকবার বলেছেন, যে গণভোটের পক্ষে আমরা সবাই একসাথে কাজ করেছি, আসুন কোনো বিতর্ক ছাড়াই সেই গণভোট মেনে নিই। গণভোটের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কার কাঠামো গড়ে তোলা হোক।

সূত্র বলছে, জুলাই সনদ এখন সংসদের আলোচ্য সূচিতে থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি নেই। কারণ সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে বিরোধিতা উপেক্ষা করে একের পর এক অধ্যাদেশ বাতিল করছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিলও করা হয়েছে। প্রতিবাদে আপত্তি নোটিশের পাশাপাশি বিরোধীরা ওয়াকআউট করেছে। সে কারণেই সংসদের পাশাপাশি রাজপথে চাপ তৈরির কৌশল নেয়া হচ্ছে। সূত্র আরো বলছে, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নই এখন ১১ দলের মূল দাবি। জুলাই সনদের সংবিধান ও রাষ্ট্র সংস্কারসংক্রান্ত বিষয়গুলো আগে কার্যকর করতে হবে। জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে চারটি বাতিল এবং ১৬টি এখনই বিল আকারে না আনার সুপারিশ করেছে সংসদের বিশেষ কমিটি। ফলে এই ২০ অধ্যাদেশের কার্যকারিতা থাকছে না। এতে আপত্তি জানিয়েছে বিরোধী দল।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বহু প্রতীক্ষার পর গঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। নির্বাচনে ২০৯টি আসন পেয়ে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি, অপর দিকে ৭৭ আসন নিয়ে বিরোধী দলের ভূমিকায় রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এর আগে গত বছর অক্টোবর মাসের ১৭ তারিখ জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে দেশের ২৫টি রাজনৈতিক দল একটি দলিলে স্বাক্ষর করেছিল। ওই দলিলের নাম ‘জুলাই সনদ’। সেখানে সংবিধান সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, দুই কক্ষের সংসদব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক কাঠামোর সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল। এই অঙ্গীকারকে আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয় ১৩ নভেম্বর। ওই দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। এরপর ২৫ নভেম্বর গণভোট অধ্যাদেশ জারি হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন একই সাথে গণভোট হয়। এতে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হয়। এর মাধ্যমে জনগণের অনুমোদন পায় জুলাই সনদ। নতুন সরকার গঠন হলো কিন্তু জুলাই সনদ ঢেকে গেল কুয়াশায়। সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেল ক্ষমতাসীনদের মধ্যে। শুরু হলো বিতর্ক। এর একটা ব্যাখ্যাও দিয়েছেন বর্তমান স্পিকার ও তখনকার মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে বিএনপি এই গণভোটে রাজি ছিল না। কিন্তু দেখা গেছে যে, বিএনপি রাজি না হলে দেশে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হবে না অথবা নির্বাচনই হবে না। এই পরিস্থিতিতে অনেকটা বাধ্য হয়েই বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে।

জামায়াত ও এনসিপি মনে করছে, গণভোটে যে বিষয়গুলো অনুমোদিত হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার এক ধরনের গেম খেলার নীতি অনুসরণ করছে। অথচ গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা ক্ষমতাসীনদের কেবল রাজনৈতিক দায় নয়, নৈতিক দায়িত্বও। সেই দায়িত্ব পালন না করে সরকার জনগণের বিশ্বাসে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। কিন্তু জনগণের রায়কে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকার কর্তৃত্ববাদ, স্বৈরাচার তৈরির রাস্তা উন্মুক্ত করে গেছে। সেই রাস্তায় শেখ হাসিনা সাংবিধানিক স্বৈরাচার হয়েছিল। বর্তমান সরকারও সেই রাস্তায় হাঁটছে। এটা ভুল পথ। সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কারই করতে হবে। সংস্কার করতে হলে গণভোট মানতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার ব্যর্থ হলে রাজপথের আন্দোলন ছাড়া বিরোধী দলের আর কোনো বিকল্প নেই।

আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো: আসাদুজ্জামান বলেন, বিএনপি জুলাই সনদকে হৃদয়ে ধারণ করে, চেতনায় ধারণ করে। জুলাই সনদ এ দেশের ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার রক্তের অক্ষরে লিখিত। যারা বলছেন গণভোট বাতিল হলে জুলাই সনদ বাতিল হবে, এটা মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর তথ্য। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সাথে গণভোটের কোনো সম্পর্ক নেই। জুলাই সনদ কার্যকর করতে পারবে বর্তমান এই পার্লামেন্ট। সুতরাং, জুলাই সনদ হওয়া না হওয়া নিয়ে গণভোট বাতিল হওয়া নির্ভর করে না। এটা আমরা পার্লামেন্টে সুস্পষ্টভাবে বলেছি।

১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা মাওলানা মামুনুল হক বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে নানা রকম ছলচাতুরী করছে। তারা সুস্পষ্টত মানুষের ম্যান্ডেটকে অপমান করেছে। তিনি বলেন, দায়িত্বশীল জায়গা থেকে বিরোধী দল চুপ থাকতে পারে না। ফ্যাসিবাদের এই প্রত্যাবর্তনকে আমরা রুখে দেব। আমরা গণভোটের রায় যেভাবে হোক কার্যকর করবো।

জানা গেছে, সরকারি দল বিএনপি ইতোমধ্যে বলেছে, দেশে আন্দোলনের নামে মব সৃষ্টির পাঁয়তারা করলে সেটি কঠোর হস্তে দমন করা হবে। তবে বিরোধী জোটের চলমান আন্দোলনে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে দমনপীড়নের সেরকম কোনো খবর পাওয়া যায়নি। বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, জুলাই সনদ ইস্যুতে বিরোধীদের আন্দোলনে তেমন হার্ডলাইনে যাবে না সরকার। আপাতত সংসদকে কার্যকর রেখে তারা সার্বিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চায় দলটির হাইকমান্ড।